সুমন দত্ত
বাংলাদেশের ইতিহাসে যা হয়নি। তা হচ্ছে বর্তমানে। বিতর্ক শুরু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম নিয়ে। বাংলাদেশের মুসলিমদের একাংশ মনে করে এই শোভাযাত্রা হিন্দুয়ানী নামে হওয়া ঠিক হয়নি। মানে তারা “মঙ্গল” শব্দের মধ্যে হিন্দু, ইন্ডিয়ান এসব গন্ধ পাচ্ছে। বলতে পারেন কাঠমোল্লাদের চুলকানি।
সম্প্রতি জঙ্গিদের প্রতি সহানুভূতিশীল একটি মহল মঙ্গল শোভাযাত্রা স্থায়ীভাবে বন্ধ করার জন্য উচ্চ আদালতে রিট করেছে। জানি না সেই রিটের ভবিষ্যত কি? বাংলাদেশে ক্ষমতায় আছে বিএনপি সরকার।
বিএনপি মধ্যপন্থি দল হিসেবে পরিচিত। তবে তাদের বর্তমান বিরোধী দল জামাত এনসিপি উগ্র কট্টরপন্থী ইসলামিক ভাবাদর্শে বিশ্বাসী। এরা বাংলাদেশে সবকিছু নতুন করে চালু করতে চায়। বিএনপি তাই আগের মতো চলতে পারবে না। তাকে কট্টরপন্থীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। আর এই তাল মিলাতে যেয়েই বিএনপি মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন করে “বৈশাখী শোভাযাত্রা” করেছে। অথচ বিএনপি ২০০১ সালে ক্ষমতায় ছিল, তখন কিন্তু মঙ্গল শোভাযাত্রাই ছিল। খালেদা জিয়ার পুরো সময় মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে বিতর্ক হয়নি। আজ কেন হচ্ছে? এটা বিএনপিকে ভেবে দেখতে হবে।
খালেদা জিয়ার পুরো শাসন আমলেই চারুকলার শোভাযাত্রার নাম ছিল মঙ্গল শোভাযাত্রা। সেই হিসেবে এই শোভাযাত্রার নাম হতে পারত সেই আগেরটাই। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। কারণ বিএনপি এখন জঙ্গিদের নিয়ে রাজনীতি করছে। এজন্য ৫০১ নম্বর রুমের খাট কাঁপানো মামুনুলের হুমকিতে পয়লা বৈশাখের শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন করে বিএনপি।
প্রথমে খবর বেরিয়েছিল বিএনপির সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরি মত দিয়েছেন শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন হবে না।
বিশেষভাবে উল্লেখ্য, পয়লা বৈশাখের এই শোভাযাত্রাটি আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ। শোভাযাত্রায় কি আইটেম থাকবে সেটাও ঠিক করে চারুকলা কর্তৃপক্ষ। এটি সরকারি কোনো শোভাযাত্রা নয়। তাই সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরির কাছে এই বিষয়ে প্রশ্ন করাটাই ছিল আমাদের সাংবাদিকদের মূর্খতা। বরং প্রশ্নটা করা উচিত ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের ও এতে সহায়তা করা বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকদের। কারণ তারই এই শোভাযাত্রার আয়োজক।
ইতিহাস বলে সরকারি নির্দেশে এই শোভাযাত্রা চালু হয় নাই। এটি চালু হয়েছে চারুকলার তৎকালীন ছাত্র ছাত্রী ও শিক্ষকদের সিদ্ধান্তে। প্রেক্ষাপট ছিল ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন। চারুকলার ছাত্র ছাত্রীরাই এর প্রবর্তক। তারাই প্রথমে এটি আনন্দ শোভাযাত্রা নামকরণ করেন। পরে তারাই ১৯৯৬ সালে এটি পরিবর্তন করে মঙ্গল শোভাযাত্রা রাখেন। তাই কোনো কিছু পরিবর্তনের এখতিয়ার চারুকলার। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের না।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী মোস্তফা সারোয়ার ফারুকি নগ্ন ভাবে এই শোভাযাত্রায় ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে বিকট মূর্তিতে দেখানোর জন্য প্রভাব বিস্তার করেন। যা আগে কখনও হয়নি। তখন কারো কারো মনে হতে পারে এই শোভাযাত্রার সঙ্গে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের যোগ আছে। অথবা তাদের পয়সায় এই শোভাযাত্রা হচ্ছে। হয়ত এ কারণে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় শোভাযাত্রা নাম নিয়ে এত মাথা ঘামাচ্ছে।
সাংবাদিকরা যখন সংস্কৃতি মন্ত্রীকে শোভাযাত্রার নাম নিয়ে প্রশ্ন করছেন, তিনি সহজেই বিষয়টি চারুকলার ওপর ছেড়ে দিতে পারতেন। বরং তিনি সেটা না বলে নিজে থেকে মতামত দিলেন। আর এতে তিনি কারো কারো কাছে হয়ে গেলেন ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা “র” এর এজেন্ট। কয়েকদিন পর এই গোষ্ঠীর মহাপীর পিংকি বলবে পুরা তারেক রেজিম ভারতের।
বাংলাদেশে এখন এমন একটি পরিস্থিতি যেন সব দোষ নন্দ ঘোষের। আর এই নন্দ ঘোষ হচ্ছে ভারতের মোদি সরকার। শেখ হাসিনা চলে যাবার পরই ভারত চ্যাপ্টার শেষ হওয়ার কথা ছিল। এখন দেখছি সেই চ্যাপ্টার নতুন করে খোলা হয়েছে। ইল্লু পিংকি ভারত ছাড়া কনটেন্ট বানাতে পারে না।
বাংলাদেশের উগ্রবাদীদের উসকানি দাতা ইল্লু পিংকির ফাঁদে যাতে বিএনপি না পড়ে সেটা ভেবে রাজনীতি করতে হবে। চারুকলার শোভাযাত্রার নাম সেই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ঠিক করবে যারা এর আয়োজন করে। অন্য কেউ এটার ওপর মাতব্বরি করার অধিকার রাখে না। এটাই শেষ কথা।
লেখক সাংবাদিক, প্রধান প্রতিবেদক ঢাকানিউজ২৪ডটক তারিখ ৭ এপ্রিল ২০২৬




