সৈয়দা নার্গিস
উপহাস করা, দোষারোপ করা, মন্দ উপনামে ডাকা, কুধারণা পোষণ করা, গোপনীয়তা অনুসন্ধান করা এবং গিবত বা পরনিন্দা করা এই ছয়টি আচরণ জীবনের প্রতিটি স্তরে শান্তি ও শৃঙ্খলা বিনষ্ট করে।
বর্তমান ঘুণে ধরা সমাজে যেখানে নৈতিক অবক্ষয় চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে, সেখানে এই ছয়টি বর্জনীয় আচরণের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনুধাবন করা অপরিহার্য।
পবিত্র কোরআন কেবল একটি ধর্মগ্রন্থ নয় বরং এটি মানবজীবনের এক পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি স্তরে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য কোরআন যে নৈতিক নীতিমালা প্রদান করেছে, তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ সুরা হুজুরাত। বিশেষ করে এই সুরার ১১ ও ১২ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা মুমিনদের এমন ছয়টি চারিত্রিক ও সামাজিক ব্যাধি বর্জনের নির্দেশ দিয়েছেন, যা পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক সংহতি বিনষ্ট করে।
প্রথমত সুরার একাদশ আয়াতে যে বিষয়টি নিষিদ্ধ করা হয়েছে তা হলো একে অপরকে উপহাস করা। উপহাস বা ঠাট্টা-বিদ্রুপ মানুষের আত্মমর্যাদায় আঘাত হানে। কোরআনের অমোঘ ঘোষণা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যেন অন্য কাউকে তুচ্ছজ্ঞান না করে, কারণ যাকে উপহাস করা হচ্ছে, সে আল্লাহর কাছে উপহাসকারীর চেয়েও উত্তম হতে পারে।
মানুষের বাহ্যিক রূপ, আর্থিক অবস্থা বা বংশমর্যাদা আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি নয়; বরং শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হলো অন্তরের পবিত্রতা ও তাকওয়া। উপহাসের এই প্রবণতা সমাজ থেকে সহমর্মিতা দূর করে এবং মানুষের মধ্যে প্রতিহিংসার জন্ম দেয়।
দ্বিতীয়ত, কাউকে দোষারোপ করা বা অভিশম্পাত দেওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা নিজেদের ওপর দোষারোপ করো না।’ এখানে ‘নিজেদের’ শব্দটি ব্যবহারের মাধ্যমে আল্লাহ বুঝিয়েছেন যে, একজন মুমিন অপর মুমিনের দেহের অঙ্গস্বরূপ। সুতরাং অন্যকে দোষারোপ করা মানে প্রকারান্তরে নিজেকেই লজ্জিত করা। এটি সামাজিক ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য বাচনভঙ্গি, যা মানুষকে অন্যের প্রতি সংবেদনশীল হতে শেখায়।
তৃতীয়ত একই আয়াতে বর্জনীয় আচরণ হিসেবে মন্দ উপনামে ডাকার কথা বলা হয়েছে। অনেক সময় আমরা কাউকে তুচ্ছ করার জন্য বা তার শারীরিক ত্রুটি নিয়ে বিকৃত নামে ডাকি, যা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। বিশেষ করে কেউ যখন তওবা করে সৎ পথে ফিরে আসে, তখন তাকে আগের মন্দ কাজের নামে খোঁটা দেওয়া বা লজ্জা দেওয়া একটি ফাসেকি কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন মুমিনদের যেন তাদের প্রিয় ও পছন্দনীয় নামে ডাকা হয়। এটি মানুষের মধ্যে ভালোবাসা বৃদ্ধি করে এবং শত্রুতা কমিয়ে আনে।
দ্বাদশ আয়াতে পরবর্তী তিনটি সামাজিক অপরাধের কথা বলা হয়েছে, যার শুরুতেই রয়েছে ‘কুধারণা’ থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ। মানুষের আচার-আচরণ বা উদ্দেশ্য নিয়ে অহেতুক নেতিবাচক ধারণা পোষণ করা একটি মানসিক ব্যাধি। আল্লাহ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, কিছু ধারণা পাপের অন্তর্ভুক্ত। যখন আমরা কারও সম্পর্কে বিনা প্রমাণে খারাপ চিন্তা করি, তখন তা পারস্পরিক বিশ্বাসের ভিত্তি দুর্বল করে দেয়। এটি সমাজে সন্দেহ ও অস্থিরতা ছড়িয়ে দেয়। পঞ্চম বর্জনীয় আচরণ হলো অন্যের গোপনীয় বিষয় বা দোষ খুঁজে বেড়ানো।
প্রত্যেক মানুষের একটি ব্যক্তিগত জীবন ও গোপনীয়তা আছে। কারও অনুপস্থিতিতে তার ব্যক্তিগত দুর্বলতা তালাশ করা বা ঘরের ভেতরে আড়ি পাতা জঘন্য অপরাধ। এটি কেবল অনৈতিকই নয়, বরং একটি সুস্থ সামাজিক পরিবেশের অন্তরায়। নবি কারিম (সা.) সতর্ক করেছেন যে, যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের গোপনীয়তা প্রকাশ করে বেড়ায়, আল্লাহ তার গোপনীয়তা প্রকাশ করে তাকে অপদস্থ করেন।
সবশেষে যে আচরণটিকে সবচেয়ে ভয়াবহ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তা হলো গিবত বা পরনিন্দা। কারও অনুপস্থিতিতে তার এমন কোনো সত্য দোষ আলোচনা করা যা সে শুনলে কষ্ট পাবে, তাকেই গিবত বলা হয়। কোরআন এই জঘন্য কাজটিকে ‘মৃত ভাইয়ের মাংস খাওয়া’র সঙ্গে তুলনা করেছে।
এটি এতটাই বীভৎস যে, কোনো সুস্থ মানুষ তা কল্পনাও করতে পারে না। গিবত কেবল অন্যের সম্মান নষ্ট করে না, বরং এটি ব্যক্তির আমলনামার পুণ্যগুলোকে ভস্মীভূত করে দেয়। হাদিসে গিবতকে জিনা বা ব্যভিচারের চেয়েও মারাত্মক বলা হয়েছে, কারণ এটি ‘হক্কুল ইবাদ’ বা বান্দার হকের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যার গিবত করা হয়েছে, সে ক্ষমা না করা পর্যন্ত আল্লাহ তা ক্ষমা করেন না।
সুরা হুজুরাতের এই দুটি আয়াতে বর্ণিত নির্দেশনাবলি কেবল কতিপয় নিষেধাজ্ঞা নয় বরং এটি একটি আদর্শ সমাজ বিনির্মাণের রূপরেখা। যদি কোনো সমাজের মানুষ একে অপরকে উপহাস না করে, অন্যের দোষ না খুঁজে, কাউকে মন্দ নামে না ডাকে এবং অন্যের অগোচরে নিন্দা না করে, তবে সেই সমাজ হবে জান্নাতি প্রশান্তির প্রতীক। এই ছয়টি আচরণ বর্জন করার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক মমতা, বিশ্বাস ও শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হয়।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে এই অপরাধগুলো করার প্রবণতা বহুগুণ বেড়ে গেছে, তাই একজন মুমিন হিসেবে আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ ও প্রতিটি কথায় আল্লাহকে ভয় করা বা তাকওয়া অবলম্বন করা একান্ত প্রয়োজন। আল্লাহ আমাদের এই নৈতিক শিক্ষাগুলো নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করার এবং একটি পবিত্র সমাজ গড়ার তৌফিক দান করুন।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও বিদ্যালয় শিক্ষক




