আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ওয়াশিংটন ডিসির হিলটন হোটেলে হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস ডিনারে বন্দুক হামলার ঘটনায় সেখানে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। নজিরবিহীন এই নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনায় মূল অভিযুক্ত হিসেবে কোল টমাস অ্যালেনকে শনাক্ত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা। সিবিএস সিক্সটি মিনিটসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শনিবার রাতের ওই আতঙ্কজনক পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে বলেছেন, ‘গুলির সময় আমি ভয় পাইনি। আমি জীবন বুঝি। আমরা এক উন্মাদ জগতে বসবাস করছি।’
গ্রেপ্তার কোল টমাস অ্যালেনের বয়স ৩১ বছর। তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেস শহরের টরেন্স এলাকার বাসিন্দা। নিজেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, গেম ডেভেলপার ও শিক্ষক হিসেবে পরিচয় দেওয়া অ্যালেনকে গতকাল সোমবার ওয়াশিংটনের আদালতে হাজির করার কথা ছিল। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কাছে অ্যালেন স্বীকার করেছেন, তার মূল লক্ষ্য ছিল ট্রাম্প প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালানো।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন হিলটন হোটেলের যে তলায় ট্রাম্প তার মন্ত্রিসভার সদস্য ও সাংবাদিকদের সঙ্গে অবস্থান করছিলেন, তার ঠিক এক তলা ওপরে নিরাপত্তা কর্মীদের সঙ্গে অ্যালেনের গুলিবিনিময় হয়। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গতিবিধি পর্যালোচনা করে ট্রাম্পবিরোধী পোস্টের একটি দীর্ঘ ইতিহাস খুঁজে পেয়েছে। সেখানে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘খলনায়ক’ ও ‘হতাশ ব্যক্তি’ বলে মন্তব্য করেছিলেন।
তদন্ত কর্মকর্তারা অ্যালেনের লেখা একটি ইশতেহারসদৃশ নথি উদ্ধার করেছেন। সেখানে তিনি স্পষ্ট উল্লেখ করেন, ট্রাম্প প্রশাসনের ‘সর্বোচ্চ পদ থেকে সর্বনিম্ন পদ পর্যন্ত’ সদস্যদের তিনি লক্ষ্যবস্তু করতে চেয়েছিলেন। যদিও সাধারণ অতিথি বা হোটেলের কর্মীরা তার সরাসরি লক্ষ্য ছিল না, তবে কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালে তিনি তাদের ওপর হামলার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন।
ট্রাম্প ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, হামলাকারীর মনে দীর্ঘ সময় ধরে ঘৃণা জমা ছিল। তার পরিবারও জানে তিনি মানসিকভাবে ‘সমস্যায়’ ভুগছেন। ট্রাম্প আরও দাবি করেন, অ্যালেন একসময় খ্রিষ্টান ধর্মে বিশ্বাসী থাকলেও পরে ‘কট্টর খ্রিষ্টানবিরোধী’ হয়ে ওঠেন। তার স্বভাবে এই আকস্মিক পরিবর্তনগুলো বড় কোনো সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
শনিবার রাতে হোটেলের লবিতে অ্যালেন প্রবেশ করার পর গুলির শব্দ শোনা গেলে সিক্রেট সার্ভিস এজেন্টরা দ্রুত তৎপর হন। তারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন। গুলিবর্ষণের ঘটনায় সিক্রেট সার্ভিসের এক কর্মকর্তা আহত হয়েছেন। তবে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তিনি দ্রুতই সুস্থ হয়ে উঠছেন।
এ ঘটনার পর হোয়াইট হাউসের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, সর্বোচ্চ পর্যায়ের এমন একটি অনুষ্ঠানে নিরাপত্তাব্যবস্থা কেন আরও সুসংহত ছিল না। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সিক্রেট সার্ভিসের প্রতি পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করেছেন। তার মতে, কর্মকর্তারা তাকে ও অন্যদের রক্ষায় ‘চমৎকার কাজ’ করেছেন।
নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলস চলতি সপ্তাহে একটি জরুরি বৈঠক ডেকেছেন। সেখানে আগামী মাসগুলোতে আমেরিকার ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপনের বড় অনুষ্ঠানগুলোর প্রটোকল ও সুরক্ষামূলক কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনা হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলা রুখতে কী ধরনের অতিরিক্ত পদক্ষেপ নেওয়া যায়, সেই বিকল্পগুলো খতিয়ে দেখা হবে।
এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যেই ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লসের পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ওয়াশিংটনে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। বাকিংহাম প্যালেস নিশ্চিত করেছে, গুলির ঘটনার প্রেক্ষাপটে তার রাষ্ট্রীয় সফরে কোনো বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে না। সামান্য রদবদল ছাড়া তার সব কর্মসূচি পরিকল্পনামাফিক চলবে।
ওয়াশিংটন ডিসির বর্তমান পরিস্থিতিতে কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। কোল টমাস অ্যালেনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তার ইশতেহার ও ডিজিটাল কার্যক্রমের গভীর বিশ্লেষণ চালিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কোনো প্রকার আপস করা হবে না। ট্রাম্পের বক্তব্যে স্পষ্ট যে, এই হামলা তাকে মানসিকভাবে দমাতে পারেনি, তবে মার্কিন রাজনীতির মেরূকরণ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে আলোচনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। সূত্র: বিবিসি




