আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানজুড়ে বিক্ষোভ, মৃত্যু আর ১৯৭৯ সালে ইরানের ক্ষমতাচ্যুত শাহের (সম্রাট) পুত্র রেজা পাহলভির ফিরে আসার শ্লোগান যেমন জোরদার হচ্ছে তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের হুমকি ইরানের ভবিষ্যতকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
বেশ কয়েকদিন ধরে ইরানের রাস্তায় সরকারবিরোধী কিছু স্লোগান পরিচিত হয়ে উঠেছে। তবে সাম্প্রতিক এই বিক্ষোভে ‘পাহলভি ফিরে আসবে’ স্লোগানটি শোনা যাচ্ছে। ইরান জুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে এ পর্যন্ত ৬২ হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৪৮ জন বিক্ষোভকারী ও ১৪ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য রয়েছেন। অন্যদিকে ইরানকে আবারও হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফলে দেশটি নতুন মেরুকরণের চেষ্টা বেশ জোরদার হয়ে উঠছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত ২৮ ডিসেম্বর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও অর্থনৈতিক দুরবস্থা নিয়ে অসন্তোষ থেকে এই বিক্ষোভ শুরু হয়। ২০২২ সালে তেহরানে পুলিশ হেফাজতে কুর্দি নারী মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এটি।
ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রার ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন এবং দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির প্রতিবাদে ব্যবসায়ীদের ডাকা কর্মসূচি থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন ছড়িয়ে পড়েছে ইরানজুড়ে। জানা গেছে, দেশটির ৩১টি প্রদেশের ১০০টিরও বেশি শহরে অসংখ্য মানুষ বিক্ষোভ কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছেন।
দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই আন্দোলনে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষে অন্তত ৬২ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া হওয়া গেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৪৮ জন বিক্ষোভকারী এবং ১৪ জন নিরাপত্তা কর্মীর মৃত্যু হয়েছে।
বিক্ষোভের দ্বিতীয় সপ্তাহে এসে সংকটে পড়েছে ইরানের চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোও। একজন চিকিৎসক জানিয়েছেন যে, রোগীদের ভিড় সামলাতে তাদের পর্যাপ্ত সার্জন নেই। সংকটে পড়েছে চক্ষু হাসপাতালও।
দেশটিতে ইন্টারনেট সংযোগ প্রায় বন্ধ এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ না থাকায় প্রকৃত তথ্য সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে, চলমান আন্দোলনকে ‘বিদেশি-প্রণোদিত’ নাশকতা হিসেবে অভিহিত করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের চাপে সরকার পিছু হটবে না বলেও জানিয়েছেন তিনি। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খুশি করতেই আন্দোলনের নামে এই পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে।
এমনকি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটি চিঠিও পাঠিয়েছে ইরান। যেখানে বিক্ষোভকে ‘সহিংস নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড এবং ব্যাপক ভাঙচুর’-এ রূপান্তরিত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ইরান ‘বড় সমস্যায়’ পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে, ‘তোমরা গুলি শুরু না করাই ভালো। কারণ, আমরাও গুলি শুরু করব।’
এর আগে, ইরানে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর দেশটির সরকারকে সতর্ক করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর প্রতিশোধ নেবে বলেও উল্লেখ করেছিলেন তিনি।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং আগে থেকেই দেশটির বিভিন্ন খাতে দেওয়া আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে আরও দুর্বল হয়ে পড়ে দেশটির অর্থনীতি।
বছরজুড়েই ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের ব্যাপক অবমূল্যায়ন এবং অতিরিক্ত মুদ্রাস্ফীতির কারণে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষ। এ প্রেক্ষাপটে গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড বাজারে ব্যবসায়ীদের ধর্মঘট থেকেই চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনের সূচনা হয়।
ব্যবসায়ীদের আন্দোলন ক্রমেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছড়াতে শুরু করলে দ্রুত প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দেয় দেশটির সরকার। কিন্তু ততক্ষণে, দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে কয়েকটি ছোট শহরে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।
দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই আন্দোলন এখন পর্যন্ত দেশটির ৩১টি প্রদেশের ১০০টিরও বেশি শহরে ছড়িয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংবাদ সংস্থা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই বিক্ষোভ ৪৮ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। যার মধ্যে পাঁচজন শিশু এবং আটজন নিরাপত্তা কর্মী রয়েছেন। গ্রেপ্তার করা হয়েছে আরও দুই হাজার ২৭৭ জন বিক্ষোভকারীকে।
৯ শিশুসহ কমপক্ষে ৫১ জন বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার খবর জানিয়েছে নরওয়েভিত্তিক ইরান হিউম্যান রাইটস বা আইএইচআর। স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে অন্তত ২২ জন নিহতের পরিচয় নিশ্চিত করেছে। যাদের অনেকেই লোরেস্তান এবং কুর্দি-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল ইলাম ও কেরমানশাহ প্রদেশে নিহত হয়েছেন।
দেশটির কেন্দ্রীয় শহর ইসফাহান, উত্তরের শহর বাবোলে এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর তাবরিজেও বিক্ষোভ করেছেন বিপুল সংখ্যক মানুষ। পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর দেজফুলেও বিক্ষোভকারীদের বিশাল ভিড় দেখা গেছে।
দীর্ঘদিন ধরেই সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক স্বাধীনতা না থাকা, দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক মন্দাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে ইরানের নাগরিকদের।
এর আগে ২০২২ সালে পুলিশ হেফাজতে কুর্দি নারী মাহসা আমিনির মৃত্যুর পরও সহিংস বিক্ষোভ হয়েছিল দেশটিতে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুসারে, ওই বিক্ষোভে ৫০০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
তখন থেকেই দেশটির অনেক মানুষের মধ্যে এক ধরনের চাপা ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। এর সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে অর্থনৈতিক মন্দার বিষয়টিও।
ইরানের রাজধানী তেহরান এবং আরও বেশ কয়েকটি শহরের রাস্তায় নেমে আসা জনতার অনেকে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের অবসান চাইছেন। আবার অনেক জায়গায় রাজতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবিও তোলা হচ্ছে।
দেশজুড়ে সব স্তরের ইরানিরা এখন প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে তাদেরকে শাসন করা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
চলমান বিক্ষোভ নিয়ে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ‘সমস্যা সৃষ্টিকারীদের বিশৃঙ্খলার মুখে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র পিছু হটবে না,’ বলে ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত বক্তব্যে, তেহরানে ক্ষয়ক্ষতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিক্ষোভকারীরা ‘শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে খুশি করার জন্য’ তাদের নিজস্ব ভবন ধ্বংস করেছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যও ইরান সরকারের হিসাব-নিকাশে বড় প্রভাব ফেলেছে বলেও মনে করা হচ্ছে।
ইরানে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকেই, তেহরানকে বারবার সতর্ক করে আসছেন ট্রাম্প। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে আমেরিকা কঠোর প্রতিশোধ নেবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সম্প্রতি এক মার্কিন রেডিও সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, আগের বিদ্রোহের সময় যেভাবে গণহত্যা করা হয়েছিল তার পুনরাবৃত্তি ঘটলে ইরান ‘খুব কঠোরভাবে আঘাত পাবে’।
ইরান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে যুক্তরাজ্য, জার্মানি এবং ফ্রান্সের নেতারাও। এক যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেছেন, ‘ইরানি নিরাপত্তা বাহিনীর সহিংসতার খবরে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং বিক্ষোভকারীদের হত্যার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছেন।’
এই সতর্কবার্তা ইরানের শাসকগোষ্ঠীর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় কোনো প্রভাব ফেলছে কি না তা স্পষ্ট নয়। যদিও তেহরানে, ব্যাপক রক্তপাত এড়াতে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী সংযম প্রদর্শন করছে বলে মনে হচ্ছে।
বিশেষ করে যেসব এলাকায় জনসমাগম বেশি ছিল, সেখানে পুলিশ এবং নিরাপত্তা বাহিনীকে সরাসরি সংঘর্ষ এড়িয়ে চলতে দেখা গেছে।
তেহরান তুলনামূলকভাবে সংযত দেখা গেলেও, দেশের ছোট শহর এবং প্রদেশগুলো থেকে পাওয়া তথ্যে অনেক বেশি সহিংতার খবর রয়েছে।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ‘আটক’ এর পর, ইরানের নেতৃত্বের অনেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কবার্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।
এর আগে গত জুনে ইসরায়েলের সাথে ১২ দিনের যুদ্ধের পর, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে বোমা হামলা চালিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যা ওই অঞ্চলে ইরান-সমর্থিত জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে দুর্বল করে দিয়েছিল।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এর আগে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ পরিচালনার সময় ‘সর্বোচ্চ সংযম’ প্রদর্শনের জন্য নিরাপত্তা বাহিনীকে আহ্বান জানিয়েছিলেন। ‘যেকোনো সহিংস বা জবরদস্তিমূলক আচরণ এড়ানো উচিত,’ তার পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়।
কিন্তু তার কর্তৃত্ব সীমিত, কারণ ইরানে সর্বোচ্চ নেতার হাতেই নিরাপত্তা নীতির চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ, প্রেসিডেন্টের নয়। বর্তমান নানা পদক্ষেপে দেশটির শাসকগোষ্ঠী সময় নষ্ট করছে বলেই মনে হচ্ছে।
বিক্ষোভকারীদের দুর্বল করার চেষ্টা করছে, দৃশ্যমান হতাহতের সংখ্যা সীমিত করছে এবং এমন সীমা অতিক্রম করা এড়িয়ে চলেছে. যা সরাসরি বিদেশী প্রতিশোধের কারণ হতে পারে।
ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মাঝেই নতুন করে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন দেশটির শেষ শাহের (সম্রাট) নির্বাসিত ছেলে রেজা পাহলভি।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত শাহের জ্যেষ্ঠ পুত্র রেজা পাহলভি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় সাম্প্রতিক বিক্ষোভকে ‘অভূতপূর্ব’ বলে উল্লেখ করেছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘ইরানের জনগণকে সাহায্য করার জন্য হস্তক্ষেপ করতে প্রস্তুত থাকার’ আহ্বানও জানিয়েছিলে তিনি।
ওয়াশিংটন ডিসির কাছে বসবাসকারী পাহলভি বৃহস্পতিবার এবং শুক্রবার বিক্ষোভকারীদের রাস্তায় নেমে আসার আহ্বান জানান। তিনি দাবি করেন, বিভিন্ন সূত্র থেকে তিনি জানতে পেরেছেন, ইরানের শাসকগোষ্ঠী এখন ‘গভীরভাবে আতঙ্কিত’ এবং বিক্ষোভ ঠেকাতে তারা ‘ফের ইন্টারনেট বন্ধ করার চেষ্টা করছে’।
এদিকে, ইরানে চলমান বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অনেকে দেশটির শেষ শাহের নির্বাসিত ছেলে রেজা পাহলভির প্রত্যাবর্তনের দাবি জানিয়েছেন। নির্বাসনে থাকা অবস্থায়, রাজতন্ত্রবাদীদের কাছে পাহলভি এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে রয়ে গেছেন বলেই মনে করা হয়।
অনেকেই পাহলভি যুগকে দ্রুত আধুনিকীকরণ এবং পশ্চিমাদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের যুগ হিসেবেও মনে করেন।




