ঢাকা  বুধবার, ১০ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২৪শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeউৎসব/দিবসঈদ উৎসব ও বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি

ঈদ উৎসব ও বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি

আফসানা বেগম

ঈদুল ফিতরের প্রচলন ইসলামের প্রাথমিক যুগে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সময়ে। হজরত মুহাম্মদ (সা.) ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মদিনায় যাওয়ার আগে মদিনাবাসী নানান উৎসব পালন করত। তিনি মদিনায় গিয়ে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা উৎসব দুটোর প্রচলন করেছিলেন। দ্বিতীয় হিজরিতে মুসলমানরা সর্বপ্রথম ঈদ পালন করে। অন্যদিকে অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের ১১ দিন পর মক্কায় সর্বপ্রথম ঈদ পালিত হয়।

মূলত গভীর আধ্যাত্মিক উপলব্ধি থেকেই এ উৎসবের প্রচলন। ধৈর্য, আত্মশৃঙ্খলা ও সংযমের প্রতীক রমজান মাসের সমাপ্তি অনুভব করা, রোজাদারের এক মাসের ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে স্রষ্টার কাছে কৃতজ্ঞতা জানানোর সুযোগ, গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে দানের প্রচলন, যা কালক্রমে জাকাত বা ফিতরা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এ তিনটি বিষয় ঈদুল ফিতরের মূল প্রেরণা।

ঈদ উদযাপনের সংস্কৃতি বাংলায় প্রসার লাভ করে ইসলাম প্রচারের সঙ্গে সঙ্গেই। মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়া থেকে আসা সুফি দরবেশরা ইসলাম প্রচারের পাশাপাশি এই ধর্মের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠার কাজ করেন। ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গদেশ ইসলাম শাসনের অধীনে এলেও তার আগে থেকেই এ অঞ্চলে রোজা ও নামাজের প্রচলন ছিল। সুলতানি শাসনামলে (ত্রয়োদশ-ষোড়শ শতক) ঈদের উদযাপন ব্যাপকতা পায়। সুলতানরা ঈদকে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পাশাপাশি বড় সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত করতে পেরেছিলেন। তখন ঈদ উপলক্ষে মেলার প্রচলন হয়, যেখানে হস্তশিল্প, খাবার বিক্রিসহ নানা রকম বিনোদনের ব্যবস্থা থাকে। মোগল আমলে এ উৎসব চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে মোগল বাদশাহ বা উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ ঈদের দিন সুনির্দিষ্ট স্থানে খাদ্য, অর্থ, পোশাক বিতরণ করতেন। এ উপলক্ষে ঈদের দিন সকালে বাদ্যযন্ত্রের উত্তাল বাজনা ছিল সেই সময়ের সংস্কৃতি।

বলতে গেলে এসব ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের ওপরে ভিত্তি করেই আমাদের বর্তমান ঈদ উৎসব পালিত হয়। এই উৎসব যেমন একাধারে ধর্মীয়, আবার সামাজিক ও পরিবারকেন্দ্রিকও। তবে সমাজ ও সামাজিক আচার এক জায়গায় স্থির থাকে না। দেশ-কাল হিসেবেও তা ভিন্ন হয়। ঈদে তেমনি আনন্দের কারণ-প্রকরণ অভিন্ন হলেও দেশ-কাল-পাত্রের ভিত্তিতে তা উদযাপিত হয় ভিন্নভাবে। একেক স্থানে ইফতার, ঈদের খাবার একেক রকম; তেমনি সাজসজ্জাও ভিন্ন। সুতরাং ধর্মীয় দিকনির্দেশনা কেন্দ্রীয়ভাবে এলেও ইবাদতকারী মানুষ এই সংযম বা উৎসবকে নিজেদের সংস্কৃতির সঙ্গে মিশিয়েই আবিষ্কার করেন। খোদ এশিয়াতেই প্রতিটি দেশের ইফতারে ভিন্ন ভিন্ন খাবার এবং বিচিত্র নতুন পোশাকে ঈদের দিনে দেখা যায়। এ কারণেই ঈদ মূলত ধর্মের গাম্ভীর্যসহ হলেও আরেক রকম সহজ সামাজিক অনুষ্ঠানের রেওয়াজও।

রোজার মাস একদিকে যেমন সাধনা, অন্যদিকে ঈদের আনন্দের জন্য প্রস্তুত হওয়ার সময়। রোজার নীরবতা ও গাম্ভীর্য যে ঈদ এসে একেবারে বিপরীত দিকে ধাবিত করবে, সেই প্রস্তুতি প্রত্যেক রোজদারেরই থাকে। বস্তুত একটি আরেকটির পরিপূরক হলেও রমজান আর ঈদুল ফিতরের সামাজিক আবেদন সম্পূর্ণ বিপরীত। অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশগুলোতে দেখা যায়, ঈদ বা বড়দিন জাতীয় উৎসবে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির মূল্যের ওপরে ছাড় দেওয়া হয়। প্রথমত বেশি বিক্রি, দ্বিতীয়ত উৎসব উপলক্ষে সুনির্দিষ্ট দ্রব্যাদি ক্রয়ের জন্য ভোক্তাকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এ ব্যবস্থা। কিন্তু বাংলাদেশের মতো অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে রমজান ও ঈদ উৎসব বহু ব্যবসায়ীর কাছে সারাবছর চলার মতো মুনাফার সুবর্ণ সুযোগ। তাই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য সংযম থেকে সরে গিয়ে আকাশ ছোঁয়। অন্যদিকে ঈদের প্রস্তুতি হিসেবে ভোক্তাকে পরিবার-বন্ধুবান্ধবদের জন্য উপহার ও আপ্যায়নের সামগ্রী কিনতে হয়। রোজার একেকটি দিন ইফতারের আয়োজনও এক মহাযজ্ঞ। সারা শহরের রাস্তা, ফুটপাতে ইফতার সামগ্রী বিক্রির হিড়িক পড়ে। রমজান মাসে তাই কাজ শেষে ইফতারের পসরা অতিক্রম করে ঘিঞ্জি হওয়া সড়ক ধরে ফেরা আরেক যুদ্ধ।

একইভাবে রোজা শেষে ঈদে ঘরমুখো মানুষের ঢলে মহাসড়কে কোথাও কোথাও ১৪-১৫ ঘণ্টার যানজট, রেল টিকিটের অপ্রতুলতা, নৌপথে ছোট লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা শুরু হয় প্রতিবার। তবুও সব উপেক্ষা করে মানুষ নিজ গ্রামে আপনজনের কাছে ফিরতে চায়। ঈদের নামাজের পর কোলাকুলি, মিষ্টিমুখ আর দীর্ঘদিন পর দূরে থাকা পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের সঙ্গে দেখা না হলে ঈদ অপূর্ণ।

এসব মিলনের মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে অনেকেই পৃথিবীর তাবৎ মুসলমানের সঙ্গে এক সংযম বা একই উচ্ছ্বাসের মাধ্যমে একাত্মতা বোধ করবেন। তখন ভগ্ন মসজিদের আংশিক ধ্বংসপ্রাপ্ত গম্বুজের পাশে ম্যাজিক কার্পেটের মতো ভেসে থাকা হেলানো পাটাতনে সামান্য পানি আর নামমাত্র খাবার সহযোগে এক দল দুর্ভাগা গাজাবাসীর ইফতারের দৃশ্যটিও সত্যি। বাড়িঘর গুঁড়িয়ে যাওয়া শুধু টিমটিম করে প্রাণ নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষদেরও কি ঈদ হবে? ঈদ মানেই যে আনন্দ! ইরান বা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের লাখ লাখ নিরীহ মানুষ, যারা জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে কোথাও না কোথাও কোনোভাবে সিয়াম সাধনা করে যাচ্ছে।

ঈদ উৎসবের জন্য তাদের নেই কোনো প্রস্তুতি, নেই অপেক্ষা। ঈদ উপলক্ষে দানশীল মানুষ নিজেরাই হয়তো কারও দানের প্রত্যাশায় দিন গুনছে এখন সেসব দেশে। সত্যিকারের প্রতীক্ষা বলতে তাদের জন্য কিছু থাকে, তা হচ্ছে যুদ্ধ থামার। রমজানের যে সংযম মানুষকে খাদ্য, অভ্যাস-বদভ্যাস আর জৈবিক নানা প্রয়োজন থেকে বিরত রাখে, তা স্পর্শ করছে না মিসাইল ছুড়ে নিরীহ শিশুদের হত্যা করা দুর্বিনীত মানুষদের। এত কিছুর পরও চাঁদের ঘূর্ণনে যথানিয়মে রমজান আসে, ঈদ আসে। পবিত্র এই উৎসব ঘিরে সকলের মনে প্রত্যয় হোক– নৃশংসতা নয়, মানবজাতির কল্যাণ হয় শান্তিতে।

আফসানা বেগম: কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular