সেকেন্দার হায়াত
স্বপ্ন আর সংগ্রাম সঙ্গী করেই ঢাকা শহরে আকাশচুম্বী অট্টালিকার ভিড়ে, রাজপথ, অলিগলির ফুটপাথ, রাস্তাঘাট, রাস্তার মোড়, বাজারের প্রবেশপথ- সর্বত্র হাজারো প্রান্তিক মানুষের জীবিকার শেষ আশ্রয়স্থল। এই শহরের সবখানেই ছড়িয়ে আছে দৃশ্যমান অর্থনীতির প্রাণচাঞ্চল্য, মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্ত মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে নারী, শিশু, কিশোর সহ পরিবারের সকল সদস্যের কেনাকাটা আর চাহিদা পূরণ করে আসছে একদল মানুষ যাদের আমরা হকার বলেই চিনি, যাদের পেশার নাম হকারি।
বাংলাদেশে বারবার সেই হকারদের ওপর নেমে আসে বুলডোজারের নিস্পেষণ। কপাল ভাঙে এইসব সমাজসেবী মানুষের। এই পেশার মানুষেরা লক্ষকোটি মানুষের যে সেবা করে আসছে সে সম্পর্কে ক্ষমতাসীনদের কোনো ধারণাই নেই, কোনো গবেষণা নেই। হকাররাই এই শহরের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির
অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। প্র্রহসন এই যে, প্রশাসনের কাছে হকাররা প্রায়ই ‘অবৈধ দখলদার’।
এবারও এসেছে উচ্ছেদের নির্মম বুলডোজার। “পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ নয়”-এই শ্লোগান তাই এখন শুধু সময়ের দাবি নয়, এটি হয়ে উঠেছে বেঁচে থাকার আর্তনাদ।
হকার রহিম
রহিম বয়স প্রায় ৪৮। গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জে। বহু বছর আগে কাজের সন্ধানে ঢাকায় এসেছিলেন। প্রথমে রিকশা চালাতেন, পরে কিছু পুঁজি জোগাড় করে ফুটপাতে ছোট একটি দোকান বসান-মোজা, টিস্যু, ছোটখাটো প্রসাধনী বিক্রি করতেন। দিনে যা আয় হতো, তা দিয়েই স্ত্রী ও দুই সন্তানের সংসার চলতো। ছেলে পড়ে নবম শ্রেণিতে, মেয়েটা পঞ্চম শ্রেণিতে।
একদিন হঠাৎ করে উচ্ছেদ অভিযান। কোনো পূর্ব ঘোষণা নেই। সকালবেলা দোকান সাজানোর আগেই পুলিশ ও সিটি কর্পোরেশনের লোকজন এসে সব ভেঙে ফেলে। তার চোখের সামনে তার জীবনের একমাত্র সম্বলটুকু ট্রাকে তুলে নিয়ে চলে যায়। সে কাঁদছিল, অনুরোধ করছিল—“স্যার, এগুলো নিয়ে গেলে আমি বাঁচুম ক্যামনে?”
কিন্তু তার কান্না কারো হৃদয় ছুঁতে পারেনি। সেদিন বাড়ি ফিরে তার ছেলে বলেছিল, “বাবা, আমি কি আর স্কুলে যাবো না?” রহিম কোনো উত্তর দিতে পারেনি। তার চোখে শুধু জল ছিল, আর বুকভরা এক অসহায় নীরবতা।
রহিম একা নয়। তার মতো হাজার হাজার হকার আজ একই বাস্তবতার মুখোমুখি।
হকার শাহানা
শাহানা, একজন নারী হকার। স্বামী অসুস্থ, সংসারের পুরো দায়িত্ব তার কাঁধে। ফুটপাতে বসে চুড়ি, ক্লিপ, ছোটখাটো প্রসাধনী বিক্রি করতেন। প্রতিদিন ৪০০-৫০০ টাকা আয় হতো, যা দিয়ে সংসার কোনোভাবে চলতো।
উচ্ছেদের দিন তার সব মালামাল নিয়ে যাওয়া হয়। কয়েকদিন সে কিছুই করতে পারেনি। পরে বাধ্য হয়ে বাসাবাড়িতে কাজ নেওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু সেখানে আয় কম, কাজ বেশি, আর সম্মানও কম।
একদিন সে বলেছিল, “ফুটপাতে বসে বিক্রি করলেও আমি নিজের মতো ছিলাম। এখন মনে হয় আমি বেঁচে আছি, কিন্তু নিজের মতো না।”
এই একটি বাক্যই বুঝিয়ে দেয়-হকারি শুধু পেশা নয়, এটি অনেকের আত্মসম্মানের সঙ্গে জড়িত।
আইনহীনতা-সমস্যার মূল
বাংলাদেশে এখনো হকারদের জন্য কোনো সুস্পষ্ট আইন বা নীতিমালা নেই। ফলে প্রশাসন যখন ইচ্ছা উচ্ছেদ করে, আবার কখনো তাদের থাকতে দেয়। এই অনিশ্চয়তা হকারদের জীবনে স্থায়ী নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে।
চক্র
এই আইনহীনতার সুযোগে তৈরি হয়েছে চাঁদাবাজির এক ভয়াবহ চক্র। অনেক হকার অভিযোগ করেন, প্রতিদিন বা সাপ্তাহিক ভিত্তিতে তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হয়। না দিলে দোকান বসাতে দেওয়া হয় না, কিংবা উচ্ছেদের হুমকি দেওয়া হয়।
হকার্স ইউনিয়নের ধারাবাহিক আন্দোলন
এই অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রাম করে আসছে। হকাররা বারবার বলে আসছে- “আমাদের উচ্ছেদ করবেন না, আমাদের বাঁচার অধিকার দিন।”
হকার্স ইউনিয়নের ১০ দফা দাবিগুলো খুবই স্পষ্ট :
১/ পুনর্বাসন ছাড়া কোনো উচ্ছেদ নয়।
২/ হকারদের জন্য নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করা।
৩/ একটি পূর্ণাঙ্গ হকার আইন প্রণয়ন করা।
৪/ সব ধরনের চাঁদাবাজি ও হয়রানি বন্ধ।
৫/ সিটি কর্পোরেশন থেকে হকারদের আইডি কার্ড প্রদান ও সঠিক তালিকা প্রণয়ন।
৬/ জাতীয় বাজেটে হকারদের জন্য বরাদ্দ রাখা।
৭/ হকারদের ট্যাক্সের অন্তর্ভূক্ত করা।
৮/ হকারদের উপর দমন-পীড়ন-মামলা-হামলা বন্ধ করা।
৯/ দীর্ঘ মেয়াদি ও স্বল্প মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ।
১০/ অবৈধ দখলে থাকা সরকারি জায়গা দখলমুক্ত করে হকারদের পুনর্বাসন করা।
এই ১০ দফা দাবিতে হকার্স ইউনিয়ন অসংখ্যবার রাস্তায় নেমেছে। কখনো মানববন্ধন,সভা, সমাবেশ,ধর্না, অবস্থান,অনশন কখনো বিক্ষোভ মিছিল, ঘেরাও স্মারকলিপি প্রদান-সব ধরনের গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগঠন করেছে। হকার ও নেতৃবৃন্দ হামলা, গ্রেপ্তার, মামলা মোকাবিলা করেছে (চলমান মামলা ৬ টি)। তবুও তারা পিছিয়ে যায়নি।
কারণ হকাররা জানে-এই লড়াই শুধু তাদের নয়, এটি তাদের সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য।
আন্তর্জাতিক উদাহরণ-সমাধান আছে
বিশ্বের অনেক দেশেই হকারদের জন্য কার্যকর নীতিমালা রয়েছে। ২০১৪ সালের স্ট্রিট ভেন্ডরস (লাইভলিহুড সুরক্ষা এবং হকারদের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ) আইন অনুযায়ী, ভারতে হকারদের জীবিকার অধিকার সংরক্ষিত এবং এটি কেন্দ্রীয়ভাবে স্বীকৃত। এই আইন অনুযায়ী, টাউন ভেন্ডিং কমিটির মাধ্যমে হকারদের নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র প্রদান করা হয়। নিয়মানুযায়ী ফুটপাতের নির্দিষ্ট অংশে, সাধারণত এক-তৃতীয়াংশ জায়গা ব্যবহার করে হকাররা ব্যবসা করতে পারেন।
ভারতের হকার আইনের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ
নিবন্ধকরণ ও লাইসেন্স : প্রতিটি হকারকে টাউন ভেন্ডিং কমিটির মাধ্যমে নিবন্ধিত হয়ে পরিচয়পত্র পেতে হবে।
পুর্নবাসন নীতি : হকারদের উচ্ছেদ করার আগে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে এবং উচ্ছেদের প্রয়োজন হলে ৩০ দিন আগে নোটিশ দিতে হবে।
নিয়ন্ত্রণ : আইন অনুযায়ী, শহরের নির্দিষ্ট স্থানে হকারদের স্থান দেওয়া এবং ফুটপাত চলাচলযোগ্য রাখার দায়িত্ব
স্থানীয় প্রশাসনের।
হকারদের অধিকার : বৈধ হকারদের জোর করে উচ্ছেদ করা যাবে না, এবং তাদের ব্যবসা করার সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে।
থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়া: থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ায় নির্দিষ্ট হকার জোন তৈরি করা হয়েছে, যেখানে শৃঙ্খলার সঙ্গে ব্যবসা করা যায়।
বাংলাদেশেও এই ধরনের একটি বাস্তবসম্মত মডেল গ্রহণ করা সম্ভব।
পুনর্বাসন-সমস্যার টেকসই সমাধান
পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ কখনোই সমাধান হতে পারে না। বরং এটি সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে। তাই কিছু বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে: নির্দিষ্ট হকার জোন তৈরি, বহুতল হকার মার্কেট নির্মাণ, সময়ভিত্তিক ব্যবসার অনুমতি, হকারদের নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র প্রদান।
এতে করে শহরের শৃঙ্খলা যেমন বজায় থাকবে, তেমনি হকারদের জীবিকাও সুরক্ষিত থাকবে।
হকার আইন-সময়ের দাবি
একটি পূর্ণাঙ্গ হকার আইন এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন। এই আইনে থাকতে হবে- হকারদের বৈধ স্বীকৃতি, লাইসেন্স ও নিবন্ধন ব্যবস্থা, নির্দিষ্ট ব্যবসা এলাকা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা মান, সামাজিক সুরক্ষা (বীমা, চিকিৎসা সুবিধা), চাঁদাবাজি প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা, এই আইন শুধু হকারদের জন্য নয়, বরং পুরো শহরের জন্য একটি সুশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করবে।
শহর উন্নয়ন—মানবিক উন্নয়ন
ঢাকা শহর উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে—মেট্রোরেল, ফ্লাইওভার, আধুনিক অবকাঠামো। কিন্তু এই উন্নয়ন যদি প্রান্তিক মানুষের জীবিকা ধ্বংসের বিনিময়ে হয়, তাহলে তা কোনোভাবেই টেকসই হবার নয়।
একটি শহরের সৌন্দর্য শুধু তার স্থাপত্যে নয়, বরং তার মানুষের জীবনযাত্রায়। যে শহরে একজন শ্রমজীবী মানুষ নিরাপদে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে না, সেই শহর কখনোই সত্যিকার অর্থে উন্নত হতে পারে না।
রহিম, শাহানা-এরা কোনো গল্পের চরিত্র নয়, এরা আমাদের সমাজের বাস্তব মানুষ। তাদের চোখের জল, তাদের কষ্ট, তাদের সংগ্রাম-সবই আমাদেরই অংশ। এখনই সময়-
‘উচ্ছেদ নয়, পুনর্বাসন’, ‘বঞ্চনা নয়, অধিকার’, ‘অবহেলা নয়, স্বীকৃতি’।
লেখক- সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়ন




