জাহাঙ্গীর আলম :
ঔষধ বাজারে অস্বচ্ছতা ও মূল্য নৈরাজ্য, নীরবে শোষণের শিকার সাধারণ মানুষ, প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি
দেশে ভোক্তা অধিকার ও বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়মিত আলোচনা হলেও, সবচেয়ে স্পর্শকাতর খাত “ঔষধ বাজার” ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে চলমান এক ধরনের নীরব অরাজকতা নিয়ে এখন প্রশ্ন তুলছেন সচেতন নাগরিকরা।
অভিযোগ উঠেছে, বাজারে প্রচলিত বহু ঔষধের স্ট্রিপ, পাতা কিংবা প্যাকেটে মূল্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকায় প্রতিনিয়ত প্রতারণা ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল অনিয়ম নয়; বরং জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি গুরুতর নৈতিক ও প্রশাসনিক সংকট।
দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একই কোম্পানির একই ঔষধ একেক ফার্মেসিতে একেক দামে বিক্রি হচ্ছে।
কোথাও ১০ টাকা, কোথাও ২০ টাকা, আবার কোথাও তারও বেশি পার্থক্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো — অধিকাংশ ক্রেতাই প্রকৃত মূল্য যাচাই করার কোনো সুযোগ পান না।
কারণ, অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের মতো অধিকাংশ ঔষধের প্রতিটি পাতায় সুস্পষ্টভাবে খুচরা মূল্য উল্লেখ থাকে না।
ফলে ক্রেতারা সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন বিক্রেতার কথার ওপর।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই অস্বচ্ছতার সুযোগে গড়ে উঠেছে এক ধরনের “নিয়ন্ত্রণহীন মূল্য ব্যবস্থা”, যেখানে অসাধু চক্র রোগীর অসহায়ত্বকে পুঁজি করে অতিরিক্ত মুনাফা আদায় করছে।
একজন ভুক্তভোগী জানান,
“রোগী নিয়ে ফার্মেসিতে গেলে তখন দরদাম করার পরিস্থিতি থাকে না। দোকানদার যে দাম বলেন, সেটাই দিতে হয়। পরে অন্য দোকানে গিয়ে দেখি একই ঔষধ অনেক কম দামে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু তখন আর কিছু করার থাকে না।”
বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি শুধুমাত্র আর্থিক প্রতারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি সামাজিক বৈষম্য ও মানবিক সংকটকেও আরও তীব্র করছে।
কারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য চিকিৎসা ব্যয় এখন ইতোমধ্যেই এক বড় চাপ।
তার ওপর ঔষধের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলছে।
স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টদের দাবি, দেশের ঔষধ শিল্প আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হলেও খুচরা পর্যায়ে মূল্য স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হওয়ায় পুরো ব্যবস্থার ওপরই প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
তাদের মতে, প্রতিটি ঔষধের পাতা, স্ট্রিপ ও বোতলে বড় অক্ষরে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (MRP) বাধ্যতামূলকভাবে উল্লেখ করতে হবে এবং সেটি বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি চালাতে হবে।
এছাড়া বাজার তদারকিতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত অভিযান পরিচালনার দাবিও উঠেছে।
সচেতন মহলের ভাষ্য,
“যে দেশে একটি বিস্কুটের প্যাকেটেও মূল্য লেখা বাধ্যতামূলক, সেখানে মানুষের জীবন রক্ষাকারী ঔষধের ক্ষেত্রে মূল্য অস্বচ্ছতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।”
অনেকেই বলছেন, “রোগীর অসহায়ত্বকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্য বন্ধে এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।”
জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট এই স্পর্শকাতর ইস্যুতে এখন প্রশাসনের দ্রুত ও দৃশ্যমান হস্তক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন সাধারণ মানুষ।




