ঢাকা  বুধবার, ১০ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২৪শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeখোলা কলামকর্মমুখী শিক্ষা ও দক্ষ জনশক্তি উন্নয়ন: অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বীজ রোপণ

কর্মমুখী শিক্ষা ও দক্ষ জনশক্তি উন্নয়ন: অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বীজ রোপণ

প্রফেসর ড. মুহাম্মদ আনিসুর রহমান ফরাজী
 
বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে শিল্প ও সেবাভিত্তিক অর্থনীতির দিকে দেশের এই উত্তরণ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশংসিত হয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্প, কৃষি উৎপাদন, ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি এবং প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে একটি শক্তিশালী ভিত্তি দিয়েছে। তবে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, শিক্ষিত বেকারত্ব, দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতার বাস্তবতায় দেশের অর্থনৈতিক চাকা আরও গতিশীল করতে কর্মমুখী শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।
 
 
কর্মমুখী শিক্ষা
শুধু বেকারত্ব হ্রাস করবে না; এটি আত্মনির্ভরশীল নাগরিক তৈরি করবে, উদ্যোক্তা সৃষ্টি করবে এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করবে। ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হবে দক্ষতা, উদ্ভাবন ও মানবসম্পদনির্ভর অর্থনীতির বাংলাদেশ—যেখানে বিদেশে শুধু শ্রমিক নয়, যাবে দক্ষ প্রকৌশলী, নার্স, প্রযুক্তিবিদ, গবেষক এবং উদ্যোক্তারা।
 
শিক্ষিত বেকারত্ব: বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ
প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী স্নাতক ও ডিপ্লোমা সম্পন্ন করে কর্মবাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু তাদের বড় একটি অংশ উপযুক্ত কর্মসংস্থান পাচ্ছেন না। এর অন্যতম কারণ হলো শিক্ষা ও কর্মবাজারের চাহিদার মধ্যে সুস্পষ্ট অসামঞ্জস্য।
প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় তাত্ত্বিক জ্ঞানের ওপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া হলেও বাস্তবভিত্তিক দক্ষতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, যোগাযোগ দক্ষতা, ভাষাজ্ঞান এবং উদ্যোক্তা মনোভাব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়ে গেছে। ফলে অনেক শিক্ষিত তরুণ-তরুণী চাকরির জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেন, অন্যদিকে বিভিন্ন শিল্পখাতে দক্ষ জনবলের অভাব প্রকট হয়ে ওঠে।
 
কর্মমুখী শিক্ষার গুরুত্ব
কর্মমুখী শিক্ষা এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যা শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট পেশা বা কর্মক্ষেত্রের জন্য ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করে। এর মাধ্যমে একজন ব্যক্তি কেবল চাকরিপ্রার্থী নন, বরং একজন দক্ষ কর্মী, উদ্যোক্তা কিংবা উদ্ভাবক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারেন।
বর্তমান বিশ্বে যেসব দক্ষতার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
তথ্যপ্রযুক্তি ও সফটওয়্যার উন্নয়ন
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা অ্যানালিটিক্স
রোবোটিক্স ও অটোমেশন
স্বাস্থ্যসেবা ও নার্সিং
ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল প্রযুক্তি
নির্মাণ ও অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা
কৃষি প্রযুক্তি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ
হসপিটালিটি ও পর্যটন
নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি
লজিস্টিকস ও সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনা
এসব খাতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবল দেশে ও বিদেশে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতে পারে।
 
বৈদেশিক কর্মসংস্থান: শ্রমিক নয়, দক্ষ মানবসম্পদ রপ্তানির সময়
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জনশক্তি রপ্তানিকারক দেশ। প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষ বিদেশে কাজের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তাদের বড় একটি অংশ অদক্ষ বা স্বল্পদক্ষ শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। ফলে তারা তুলনামূলক কম বেতন পান এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রতারণার শিকার হন।
অনেক পরিবার জমি-জমা বা ঘরবাড়ি বিক্রি করে বিদেশে যাওয়ার খরচ জোগাড় করলেও প্রত্যাশিত আয় করতে ব্যর্থ হন। এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো পর্যাপ্ত দক্ষতা ও ভাষাগত অদক্ষতা।
শুধু শ্রমিক পাঠিয়ে একটি দেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। বরং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ, ভাষাশিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে উচ্চ আয়ের পেশায় কর্মী পাঠানো গেলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
 
সম্ভাবনাময় দেশ ও চাহিদাসম্পন্ন খাত
বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে জনসংখ্যার বার্ধক্য, দক্ষ কর্মীর সংকট এবং শিল্প সম্প্রসারণের কারণে বিপুলসংখ্যক দক্ষ জনবলের চাহিদা তৈরি হয়েছে।
 
জাপান
জাপানে জনসংখ্যার বার্ধক্যের কারণে নার্সিং, কেয়ারগিভিং, নির্মাণ, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং উৎপাদন খাতে দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়ছে। জাপানি ভাষায় দক্ষতা অর্জন এবং নির্দিষ্ট কারিগরি প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশি তরুণরা উচ্চ বেতনে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতে পারেন।
 
দক্ষিণ কোরিয়া
দক্ষিণ কোরিয়া ইপিএস কর্মসূচির আওতায় উৎপাদন, কৃষি, মৎস্য ও নির্মাণ খাতে দক্ষ জনবলের চাহিদা রয়েছে। কোরিয়ান ভাষা শিক্ষা এবং প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ এই বাজারে প্রবেশের প্রধান শর্ত।
 
চীন
চীন প্রযুক্তি, প্রকৌশল, স্বাস্থ্যসেবা এবং উৎপাদন শিল্পে দক্ষ কর্মীদের চাহিদা বাড়ছে। চীনা ভাষাজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
 
ইউরোপ
ইউরোপ এবং বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশে স্বাস্থ্যসেবা, আইটি, প্রকৌশল, হসপিটালিটি এবং নির্মাণ খাতে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা রয়েছে।
 
যুক্তরাজ্য ও উত্তর আমেরিকা
যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর আমেরিকাতে স্বাস্থ্যসেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, উচ্চ প্রযুক্তি, শিক্ষা ও গবেষণা খাতে দক্ষ কর্মীর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
 
মধ্যপ্রাচ্য
মধ্যপ্রাচ্যে অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন, জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতে দক্ষ জনবলের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।
 
ভাষা শিক্ষা: বৈশ্বিক কর্মবাজারে প্রবেশের চাবিকাঠি
 
দক্ষতার পাশাপাশি ভাষাজ্ঞান আন্তর্জাতিক কর্মবাজারে সফলতার অন্যতম পূর্বশর্ত। তাই প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় নিম্নোক্ত ভাষাগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে—
                                             ইংরেজি
                                             জাপানি
                                             কোরিয়ান
                                             জার্মান
                                             ফরাসি
                                             আরবি
                                             চীনা (ম্যান্ডারিন)
 
ভাষা দক্ষতা কর্মীদের বেতন বৃদ্ধি, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সাংস্কৃতিক অভিযোজন সহজ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
 
করণীয়: সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ
 
বাংলাদেশকে দক্ষ মানবসম্পদ রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করতে হলে কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি—
১. মাধ্যমিক স্তর থেকেই কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা।
২. প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন।
৩. বিদেশি শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী নিয়মিত পাঠ্যক্রম হালনাগাদ করা।
৪. সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্বে ভাষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা।
৫. বিদেশগামী কর্মীদের জন্য স্বল্পসুদে ঋণ ও আর্থিক সহায়তা প্রদান।
৬. জনশক্তি রপ্তানিতে মধ্যস্বত্বভোগী ও প্রতারণামূলক চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ।
৭. দক্ষতা সনদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করা।
৮. নারীদের জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ ও নিরাপদ কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করা।
৯. তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে স্টার্টআপ ও ক্ষুদ্র উদ্যোগে সহায়তা প্রদান।
১০. বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের অভিজ্ঞতা ও নেটওয়ার্ককে দক্ষতা উন্নয়নে কাজে লাগানো।
 
উপসংহার
 
বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। এই জনসংখ্যাকে সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রশিক্ষণ, ভাষাজ্ঞান এবং নৈতিক মূল্যবোধের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা গেলে দেশের অর্থনীতিতে এক নতুন বিপ্লব ঘটানো সম্ভব।
অতএব, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল ও গতিশীল রাখতে কর্মমুখী শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রে স্থান দেওয়া এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি। 
RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular