নিউজ ডেস্ক: পারস্য উপসাগরের উত্তরে অবস্থিত ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপ নিয়ন্ত্রণে নিতে সেখানে সেনা পাঠাতে পারেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
দীর্ঘদিন ধরেই খারগ দ্বীপ ইরানের তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই দ্বীপটি উপকূল থেকে কিছুটা দূরে এমন এক গভীর জলসীমায় অবস্থিত, যেখানে ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার (ভিএলসিসি) নামক বিশাল তেলের ট্যাঙ্কারগুলো সহজেই ভিড়তে পারে।
এই ট্যাঙ্কারগুলোর প্রতিটিতে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা যায়। ইরানের তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই খারগ দ্বীপের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
চলতি বছরের ১৩ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রও এই খারগ দ্বীপে তাদের ভাষায় প্রায় ৯০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র এই দ্বীপের তেলের অবকাঠামোগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা থেকে ছাড় দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র যদি শেষ পর্যন্ত খারগ দ্বীপে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় তবে সেটি সম্ভবত একটি সাময়িক পদক্ষেপ হবে।
এর মূল উদ্দেশ্য হবে, ইরানের জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ করে দিয়ে দেশটিকে চাপে ফেলা যাতে তারা বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালির ওপর থেকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে এবং ওয়াশিংটনের দাবিগুলো মেনে নেয়।
তবে ইরানি সরকারের কঠোর মনোভাব এবং নতি স্বীকার না করার ইতিহাস বিবেচনায় নিলে, এই পরিকল্পনা আদৌ সফল হবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সতর্ক করে বলেছেন, কোনো মার্কিন বাহিনী সেখানে প্রবেশের চেষ্টা করলে তার দেশের সেনারা তাদের ওপর আগুনের বৃষ্টি চালাবে।
ইরান ওই খারগ দ্বীপে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরো জোরদার করেছে, এর মধ্যে ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য মিসাইল ব্যাটারিও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দ্বিমুখী আচরণের অভিযোগ এনে ইরান দাবি করেছে, একদিকে দেশটি শান্তির প্রস্তাব দিচ্ছে অন্যদিকে, এই অঞ্চলে বিপুল সংখ্যক সেনা পাঠাচ্ছে।
প্রায় পাঁচ হাজার মার্কিন নৌ-সেনা এবং ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের প্রায় দুই হাজার প্যারাস্যুটধারী সৈন্য রয়েছে এই সেনাবহরে। এই ঘটনা ব্যাপক জল্পনার জন্ম দিয়েছে যে, খারগ দ্বীপ দখল এবং নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য এই দুই বাহিনীর একটি অথবা দুইটিকেই ব্যবহার করা হতে পারে।
তাত্ত্বিকভাবে বলা যেতে পারে, প্যারাট্রুপাররা সম্ভবত রাতে আকাশপথে অতর্কিতে হামলা চালিয়ে মাত্র ২০ বর্গ কিলোমিটারের (৭.৭ বর্গমাইল) এই ছোট দ্বীপটির গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানগুলো নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে।
কিন্তু তার আগে মার্কিন জাহাজগুলোকে ইরান নিয়ন্ত্রিত হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। এরপরে পারস্য উপসাগরের ভেতর দিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সময় ইরানের অসংখ্য লুক্কায়িত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রের নজরদারি এড়িয়েই যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজগুলোকে এগিয়ে যেতে হবে।
জল বা আকাশপথ- যে পথেই অবতরণ করুক না কেন তাদের অ্যান্টি-পারসোনেল মাইন (সৈন্য বিধ্বংসী মাইন) এবং ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোনের মুখে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
মার্কিন মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটগুলোর (এমইইউ) যুদ্ধের সক্ষমতা এতোটাই শক্তিশালী যে তারা প্রায় নিশ্চিতভাবেই জয়ী হবে, তবে এর বিনিময়ে তাদের বিশাল সংখ্যক ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়তে হতে পারে।
এরপরে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে দখল করা এই খারগ দ্বীপ নিয়ন্ত্রণে রাখা। কারণ অনির্দিষ্টকাল ধরে তাদের ইরানি মূল ভূখণ্ড থেকে ধেয়ে আসা তীব্র গোলাবর্ষণ মোকাবেলা করতে হবে।
কৃষ্ণ সাগরে অবস্থিত ইউক্রেনের স্নেক আইল্যান্ড বা দ্বীপের সাথে এই পরিস্থিতির তুলনা করা যেতে পারে। ২০২২ সালে ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পরপরই রাশিয়া দ্বীপটি দখল করে নিয়েছিল।
কিন্তু ইউক্রেনীয় মূল ভূখণ্ড থেকে অবিরাম কামানের গোলা ও হামলার মুখে শেষ পর্যন্ত দ্বীপটি ছেড়ে যেত বাধ্য হয় রাশিয়া। ইরানের ভূখণ্ডে দীর্ঘমেয়াদী যেকোনো মার্কিন দখলদারি খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও জনসমর্থন পাবে না।
পরিশেষে, এটি লক্ষ্য করা গুরুত্বপূর্ণ যে, খারগ দ্বীপে সম্ভাব্য মার্কিন স্থল অভিযান নিয়ে বর্তমানে এত বেশি আলোচনা হচ্ছে যে, এটি কোনো সুদূরপ্রসারী ধোঁকাবাজি বা বিভ্রান্তি ছড়ানোর কৌশল হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আর তা করতে হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থানের মধ্যে বর্তমানে যে বিশাল দূরত্ব রয়েছে সেটির অবসান ঘটানো প্রয়োজন। তথ্যসূত্র- বিবিসি




