নিউজ ডেস্ক : ৪ জানুয়ারি ২০২৬ সালে যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফিরে গত ২৫ ডিসেম্বরের গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন তারেক রহমান। দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার ৩০ ডিসেম্বর রাত ৬টায় মৃত্যুর পর বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চেয়ারপার্সনের পদ শূন্য হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী স্থায়ী কমিটির জরুরি বৈঠকে (৯ জানুয়ারি রাত) এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে খালেদা জিয়ার শূন্য পদে আনুষ্ঠানিকভাবে তারেক রহমানকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করা হয়। এই ঘোষণা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, যেখানে তিনি বলেন, দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ইতিমধ্যে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বভার নেওয়া তারেক রহমানকে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বগ্রহণ করায় স্থায়ী কমিটি সন্তোষ প্রকাশ করেছে। বিএনপির গঠনতন্ত্রের ৭(গ)(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘যেকোনো কারণে চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হলে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন’।
গতকাল (৯ জানুয়ারি) রাতের বৈঠকে এই বিধির ভিত্তিতে তারেক রহমানের চেয়ারম্যান হওয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ‘খালেদা জিয়ার মৃত্যুজনিত কারণে চেয়ারম্যান পদ শূন্য হওয়ায় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জাতীয় স্থায়ী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং সর্বসম্মতিক্রমে তারেক রহমানকে দায়িত্ব দেওয়া হলো’। এর ফলে তারেক রহমান দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে দল পরিচালনায় আরও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছেন।
গতকাল (৯ জানুয়ারি) রাতের বৈঠকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়াও অনেক শীর্ষ নেতাগণ অংশ নেন। প্রস্থানমুখী পরিকল্পনা ও খালেদা জিয়ার শেষকৃত্য সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার বিষয়ে আলোচনা করা হয়। উপস্থিত ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, জনাব নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, বেগম সেলিনা রহমান, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ প্রমুখ।
এ বৈঠকটি আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্বনির্ধারিত ছিল না, তবে বৈঠকের পরে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয় যে দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তারেক রহমানকে চেয়ারম্যান নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই পরিবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ইস্যু হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আরো পড়ুন : বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঢাকায় প্রত্যাবর্তন
তারেক রহমানের দায়িত্বভার গ্রহণের পর, কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও কার্যকর সংগঠনের জন্য বেশ কিছু নতুন নিয়োগ ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে সাবেক সরকারি সচিব জনাব এ বি এম আব্দুস সাত্তারকে, প্রেস সচিব হিসেবে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সম্পাদক এ এ এম সালেহ (সালেহ শিবলী)কে নিয়োগ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি তারেক রহমানের নিরাপত্তা ও প্রটোকল টিমেও যোগ দেওয়া হয়েছে। তার নিরাপত্তা টিমের নিরাপত্তা পরিচালক হিসেবে মেজর (অব.) মোহাম্মদ শাফাওয়াত উল্লাহ, প্রটোকল পরিচালক হিসেবে মেজর (অব.) মইনুল হোসেন, এবং সমন্বয় পরিচালক হিসেবে ক্যাপ্টেন (অব.) মো: গণী উল আজমকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এই নিয়োগগুলো দলীয় সূত্রে প্রেরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে নিশ্চিত করা হয়েছে।

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের জন্য নিযুক্ত এ বি এম আব্দুস সাত্তার ও এ এ এম সালেহ। দায়িত্ব বণ্টনের মাধ্যমে সভাপতির নিকটস্থ পরামর্শদাতা এবং সুরক্ষা খাত আরও শক্তিশালী হয়েছে। এছাড়া দলের বিভিন্ন স্তরে দায়িত্ব বণ্টন ও সংগঠনের সার্বিক কাঠামো পুনর্গঠন নিয়ে কাজ চলছে। কিংবদন্তি নেতা তারেক রহমানের চেয়ারম্যানশিপের প্রেক্ষিতে স্থায়ী কমিটির কার্যাবলী গতিশীল হওয়া আর তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে সময় উপযোগী পর্যায়েও কার্যক্রম বিস্তারের পরিকল্পনা রয়েছে।
আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতিতে বিএনপি বিশেষ মনোযোগ দিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে নতুন কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন নজরুল ইসলাম খান এবং সদস্য সচিব হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। কমিটিতে আরও ৩৫ জনের বেশি সিনিয়র নেতা-নেত্রী রয়েছে যারা ধাপে ধাপে নির্বাচনী প্রস্তুতি পরিচালনা করবেন।
একই সময় নির্বাচনকালীন পরিবেশ নিয়ে দল সতর্ক। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল জানিয়েছেন, নির্বাচন কমিশনের অনুরোধে তারেক রহমানের উত্তরাঞ্চল সফর স্থগিত করা হয়েছে। আগে নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী ১১ জানুয়ারি থেকে তিনি মাওলানা ভাসানীর সমাধি ও ২০২৪ সালের ছাত্র–জনতা আন্দোলনের শহীদদের মাজারে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য কয়েকটি জেলা সফর করতে যাচ্ছিলেন। তবে কমিশনের অনুরোধে এই সফর আপাতত বাতিল করা হয়েছে।
মহাসচিব মির্জা ফখরুল অভিযোগ করেছেন, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক সহিংসতা ও ষড়যন্ত্রের ছলচাতুরী হচ্ছে।
তিনি জানান, ‘ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, অন্যান্য এলাকায় বিপুলসংখ্যক বিএনপি নেতাকর্মীকে লক্ষ্য করে হামলা করা হচ্ছে’।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এ রকম সহিংসতা অব্যাহত থাকলে নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব হবে না। বিএনপি নেতৃত্ব এসব বিষয়ে সরকারের প্রতি দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি, নির্বাচনী পরিবেশ সুরক্ষাসহ দলীয় কর্মসূচি ও সাংগঠনিক প্রস্তুতির বিষয়গুলো বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
বিএনপির শীর্ষ নেতারা মনে করছেন, নির্বাচনের আগে সহিংসতা, চক্রান্ত এবং অস্থিতিশীলতা বেড়ে গেলে গণতান্ত্রিক ভোট প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে।
তারেক রহমানের চেয়ারম্যান পদের দায়িত্ব গ্রহণের পর বিএনপির নেতৃত্বে একটি পূর্ণাঙ্গ শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জাতীয় স্থায়ী কমিটি ছাড়াও দলটির একটি নির্বাহী কমিটি ও উপদেষ্টা পরিষদ রয়েছে।
এর পাশাপাশি শিক্ষা, যুব, মহিলা, মুক্তিযোদ্ধা, স্বেচ্ছাসেবক, কৃষক-জাসাস সহ বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের মাধ্যমে সংগঠন বৃদ্ধি ও মতবিনিময়ের কাজ চলছে। দলের সাধারণ সম্পাদক মির্জা ফখরুলসহ সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যানরা দল পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
২০২৫ গত বছর তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের পর থেকেই বিএনপি গোটা দেশে গণসংবর্ধনা, কর্মসূচি চালিয়েছে। এখন তাঁর চেয়ারম্যান হওয়ার পর দলের কার্যক্রম আরও কেন্দ্রীয়করণ হয়েছে।
পারিবারিক কারণে দলীয় সভায় যোগদান থেকে শুরু করে দলের মিডিয়া রিলিজ, সেবা কার্যক্রম পর্যন্ত বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নতুন ভুমিকা দৃশ্যমান। তারেক রহমানের নেতৃত্বে জাতীয় বিএনপি শৃঙ্খলা ও ঐক্যের চিত্র পাচ্ছে, যা আসন্ন নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে দলকে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাবে।
তারেক রহমান এখন পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের স্থায়ী কমিটি থেকে শুরু করে নির্বাচনী কমিটি ও নিরাপত্তা টিমে গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের মধ্য দিয়ে বিএনপি নেতারা সংগঠনকে সুসংগঠিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
নির্বাচন মুল্যায়নে সংলগ্ন পরিস্থিতি মোকাবিলায় দল দৃঢ়সংকল্প, এবং তাদের উদ্যোগ ও পরিকল্পনা বাংলাদেশি রাজনীতিতে লক্ষণীয় পরিবর্তন বয়ে আনছে।
ঢাকানিউজ২৪/মহফ




