আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির সময় বাড়ালেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে আলোচনা শুরুর কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দেননি। তবে নিজ দেশেই তিনি এখন এক ‘গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমার মুখে’, সেটি ১ মে।
যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া প্রেসিডেন্ট সর্বোচ্চ ৬০ দিন সামরিক অভিযান চালাতে পারেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলায় ট্রাম্পের পক্ষ থেকে কংগ্রেসকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর পর, এই ৬০ দিনের সময়সীমা শেষ হচ্ছে ১ মে।
এই তারিখটিকে ইরান যুদ্ধ সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ ‘ডেডলাইন’ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ এই ‘ডেডলাইনের’ মধ্যে ট্রাম্পকে হয় কংগ্রেসের কাছ থেকে নতুন সামরিক অভিযানের অনুমোদন নিতে হবে, অথবা আইনত মার্কিন বাহিনীকে ওই অঞ্চল থেকে প্রত্যাহার বা অভিযান বন্ধ করতে হবে।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, ১ মের পর ট্রাম্প থামবেন? নাকি আইন লঙ্ঘন করেই যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন?
শুক্রবার আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজ্যুলিউশন বা ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট’ অনুযায়ী, চলমান কোনো সংঘাতে ৬০ দিনের বেশি সেনা মোতায়েন রাখতে হলে ট্রাম্পকে ১ মের মধ্যে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হবে। নির্দিষ্ট অনুমোদন ছাড়া তখন ট্রাম্প নতুন কোনো সেনা মোতায়েন করতে পারবেন না।
এই অনুমোদন পেতে হলে ৬০ দিনের মধ্যে মার্কিন পার্লামেন্টের প্রতিনিধি পরিষদ বা হাউজ অব রিপ্রেজেন্টিটিভে এবং সেনেট, উভয় কক্ষেই সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় যৌথ প্রস্তাব পাস হতে হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত তেমন কিছু হয়নি।
অবশ্য অতীতে ট্রাম্পের পূর্বসূরী অনেক প্রেসিডেন্ট তাদের অন্যান্য আইনি কর্তৃত্ব ব্যবহার করে এ আইনকে পাশ কাটিয়ে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছেন।
‘ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট’ কী?
যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭৩ সালে এই ‘ফেডারেল’ আইনটি প্রণয়ন হয়েছিল দেশের বাইরে যে কোনো সশস্ত্র সংঘাতে প্রেসিডেন্টের একক ক্ষমতা ‘সীমিত’ করার লক্ষ্যে। এই আইন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টকে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কংগ্রেসকে জানাতে হয়।
এরপর প্রেসিডেন্ট ৬০ দিন পর্যন্ত বিদেশের কোনো স্থানে সেনা মোতায়েন রাখতে পারেন। তবে কংগ্রেস চাইলে আরও ৩০ দিন মেয়াদ বাড়াতে পারে অথবা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের অনুমোদন দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো ল স্কুলের সহযোগী অধ্যাপক মরিয়ম জামশিদি বলেন, “৬০ দিনের সময়সীমা আরও ত্রিশ দিন বাড়াতে হলে প্রেসিডেন্টকে কংগ্রেসে লিখিতভাবে প্রমাণ দিতে হবে যে, ইরানে সশস্ত্র বাহিনীর ব্যবহার ‘অবশ্যম্ভাবী সামরিক প্রয়োজনীয়তা’। এর বাইরে যদি কংগ্রেস যুদ্ধ ঘোষণা না করে বা অনুমোদন না দেয়, তাহলে প্রেসিডেন্ট সেনা প্রত্যাহার করতে বাধ্য।”
তবে মরিয়ম জামশিদি এও বলেন, প্রেসিডেন্টকে এই শর্ত মানতে ‘বাধ্য’ করার কোনো স্পষ্ট আইনি পথ কংগ্রেসের কাছে নেই। অতীতে অনেক প্রেসিডেন্ট এই আইনকে ‘অসাংবিধানিক’ দাবি করে তা মানতে অস্বীকার করেছেন।
কংগ্রেস কি যুদ্ধের অনুমোদন দেবে?
মার্কিন কংগ্রেসে বর্তমানে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টি এবং বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টির সদস্যদের মধ্যে গভীর মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে কংগ্রেসে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের অনুমোদন পাওয়া বেশ অনিশ্চিত।
১৫ এপ্রিল সেনেটে ট্রাম্পের ‘সামরিক ক্ষমতা’ খর্ব করার একটি প্রচেষ্টা ৫২-৪৭ ভোটে ব্যর্থ হয়ে যায়, যেখানে দুই দলের সদস্যরা মূলত তাদের নিজ নিজ দলীয় অবস্থানের ভিত্তিতে ভোট দিয়েছেন।
রিপাবলিকানদের বড় একটি অংশ এখন পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের কাজে ‘হস্তক্ষেপ’ না করলেও অনেকে জোর দিয়ে বলছেন, ৬০ দিন পার হওয়ার পর ইরানে ফের সামরিক অভিযান চালাতে ট্রাম্পকে অবশ্যই কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হবে।
রিপাবলিকান সেনেটর জন কার্টিস এবং কংগ্রেস সদস্য ডন বেকন স্পষ্ট বলেছেন, আইনিভাবে ৬০ দিনের বাইরে অনুমোদন ছাড়া সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
১ মের পর কি ট্রাম্প যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন?
যুক্তরাষ্ট্রের বস্টনের বোডুইন কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপক সালার মোহেনদেসি বলেন, “ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পের জন্য ভয়াবহ প্রমাণিত হয়েছে; কারণ জনমত এর বিপক্ষে। তবে ট্রাম্প কোনো না কোনোভাবে এটি চালিয়ে যেতে পারেন। কারণ ট্রাম্পের ‘ব্র্যান্ড ইমেজ’ অনেকটাই নির্ভর করছে এই যুদ্ধে জয়-পরাজয়ের ওপর।”
তিনি আল জাজিরাকে বলেন, “ট্রাম্প তার দেশবাসীকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি ইরানের কাছ থেকে আরও ভালো চুক্তি আদায় করবেন এবং যুদ্ধে জড়াবেন না। এখন যদি তিনি সরে আসেন, তাহলে তাকে পরাজয় স্বীকার করে নিতে হবে। আর ট্রাম্প একজন জুয়াড়ি; তাই জয়ের আশায় তিনি সংঘাত আরও বাড়াতে পারেন।”
কংগ্রেসকে পাশ কাটানোর উপায় কী?
মার্কিন কংগ্রেসের আইন ‘অথরাইজেশন ফর ইউজ অব মিলিটারি ফোর্স’ বা এউএমএফ প্রেসিডেন্টকে নির্দিষ্ট কারণে কোথাও ‘শক্তি প্রয়োগের’ ক্ষমতা দেয়।
২০০১ সালে ৯/১১ হামলার পর এবং ২০০২ সালে ইরাক আক্রমণের জন্য এ আইনটি পাস হয়েছিল। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং খোদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ২০২০ সালে কাশেম সোলেইমানিকে হত্যার সময় এই আইনি ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
১৯৭৩ সালের পর থেকে অনেক প্রেসিডেন্টই কংগ্রেসের সরাসরি অনুমোদন ছাড়া যুদ্ধ চালিয়েছেন। ১৯৯৯ সালে বিল ক্লিনটন যুগোস্লাভিয়ায় ৭৯ দিন ধরে সামরিক অভিযান চালিয়েছিলেন।
২০১১ সালে লিবিয়া অভিযানের সময় ওবামা প্রশাসন যুক্তি দিয়েছিল, সেখানে কোনো ‘সম্মুখ যুদ্ধ’ হচ্ছে না বলে এটিকে ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজ্যুলিউশন’-এর সংজ্ঞায় ফেলা যায় না। তাই লিবিয়ায় অভিযানের জন্য কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। ট্রাম্পও হয়ত এমন কোনো আইনি ফাঁকফোকর খোঁজার চেষ্টা করবেন।




