জাহিদ খান
সর্বশেষ গিয়েছিলাম ১৯৮৪ সালে! ৪২ বছরের ব্যবধান! একেকটা কোলাহলপূর্ণ আনন্দমুখর জমজমাট বাড়ি আজ জনশুন্য পরিত্যক্ত প্রায়!

টাংগাইল শহরে প্রবেশের ১০কিলোমিটার আগে করোটিয়া থেকে ৭কিলোমিটার পূর্বে বাসাইল উপজেলা সদরে অবস্থিত বাসাইল বড়বাড়ি, মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রায় ৯মাসই কেটেছে এই বাড়িতে, আমার হাতেখড়ি হয়েছিল এই বাড়ির সন্নিকটেই বাসাইল স্কুলে।

কত স্মৃতি, সরাসরি গুলাগুলি দেখা, কাদেরিয়া বাহিনীর বাসাইল বিজয়, মিছিল নিয়ে নদখোলা যেয়ে রহিমা সিদ্দিকীকে স্বাগত জানানো, রাত্রে বাসাইল ডেভেলপমেন্ট সেন্টারে বীর মুক্তিযোদ্ধা লেবু মামার সাথে বিজয় উৎসব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ, বাহিনী প্রধান কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তমকে প্রথম দর্শন, ভারতীয় ছত্রীসেনার টাংগাইলের মাটিতে অবতরণ।

মুক্তিযুদ্ধের সময় গুলাগুলি শুরু হলেই আমরা এই দোতলা বাড়ীতে আশ্রয় নিতাম। মুক্তিবাহিনী এই বিল্ডিং গুলোকে সামনে রেখে পাক বাহিনীর ক্যাম্পে আক্রমণ সানাতো। নানী যতদিন বাসাইল ছিলেন তখন মাঝেমধ্যে যাওয়া হত।

১৯৮৪ সালে বেঁচেছিলেন দোতলা বাড়ির অধিকর্তা এলাকার চেয়ারম্যান মোশাররফ আলী খানসুর (মন্টু নানাভাই), একতলা বাড়ির অধিকর্তা ভোলা খানসুর, আর মাঝখানে আমার নানির ভিটেবাড়ির টিনের ঘরের পাশে সৌখিন ছনের ঘরে বাস করতেন পাকিস্তান মিলিটারির জাদরেল অফিসার মেজর সালামত আলী খানসূর।

সেসময় প্রতিটি বাড়ি ছিল বউ, ছেলে-মেয়ে, আত্মীয়-স্বজন, চাকর-চাকরানীতে ভরপুর ও কোলাহলপূর্ণ । এখন বিল্ডিংগুলো প্রায় পরিত্যক্ত, মালিকপক্ষের কেউ থাকেন না। ভিটেবাড়ীর জায়গা-জমি প্রায় বেচা হয়ে গেছে, তবে ব্যতিক্রম দেখলাম মেজর সালামত নানার ছনের ঘরের স্থলে একটা সুন্দর বিল্ডিং করেছেন উনার মেয়ে, আর কাঠের বাংলো ঘরের কাঠের মেঝেটি পাকা করে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং উনার বাড়ির ভিটের জমি পুরোটাই রয়ে গেছে।

ভালো লাগলো যা অবশ্যই প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে মন্টু নানা এবং ভোলা ফুপার ভিটেবাড়ির অধিকাংশই হাতবদল হয়ে গেছে, সেখানে নতুন অচেনা লোকের বসবাস। এইদুটো বাড়ির পরিণতি দেখে খুব খারাপই লাগলো।
এরপর কাউলজানীতে গিয়ে দেখলাম আমার মেঝখালার বাড়িটিও প্রায় পরিত্যক্ত, এখন ওই বাড়িতে কেউ থাকেন না, অথচ ছোটবেলায় যখন বেড়াতে যেতাম তখন কতই না আনন্দে কাটতো আমাদের সময়।
গতকাল হঠাৎ করেই বাসাইল চলে গিয়েছিলাম, সেখানে পরিচিত কাউকে না পেয়ে চলে যাই কাউলজানী, সেখানে অবশ্য আমার খালাতো বোনের দেবর বউ বেশ আন্তরিকতার সাথে আতিথেয়তা করলেন।
নিকটজনদের সাথে দেখা না হউক, ৪০বছর আগের স্মৃতিময় বাড়িগুলো দর্শনে একধরনের আনন্দ অনুভূতিই বা কম কীসের!




