নিউজ ডেস্ক: সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে সুপারিশ পেয়েও নিয়োগপত্র না পাওয়া চাকরি প্রার্থীদের পুনঃতদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ভেরিফিকেশনের নামে যোগ্যদের বাদ দেওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার মধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ-২০২৫ এর নিয়োগ বিষয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে নিয়োগপত্র প্রাপ্তি বিষয়ে বিভিন্ন মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভ্রান্তি না ছড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
বৈঠক সূত্র জানায়, চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পরও নিয়োগপত্র পাননি এমন চাকরিপ্রত্যাশীর সংখ্যা হাজারের বেশি। এরমধ্যে সব প্রার্থীকে রাজনৈতিক কারণে বাদ দেওয়া হয়েছে বিষয়টি এমন নয়। অনেকের ঠিকানা ভুল, অনেকের কাগজপত্রে জটিলতা রয়েছে। একারণে মন্ত্রণালয় পুণঃতদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী ১ অক্টোবর পর্যন্ত প্রার্থীদের তথ্য হালনাগাদ করবে মন্ত্রণালয়। এরপরই পুণঃতদন্ত শুরু হবে।
এদিকে গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, আগামী ১ অক্টোবরের মধ্যে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের কেউ নিয়োগপত্র না পেলে তা পরবর্তীতে যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পর্যায়ক্রমে নিয়োগপত্র প্রেরণ করা হবে। শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের মেধা ও সৃজনশীলতার বিকাশ এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল হয়ে কাজ করার আহবান জানানো হয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি। সভার সূত্র বলছে, প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র দেশের বিভিন্নস্থানে প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে জড়ো হচ্ছেন ভুক্তভোগীরা। অনেক প্রার্থী বাদ পড়ার কারণ জানতে আন্দোলনের পথে হাটছেন। যে কারণে মন্ত্রণালয় এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এদিকে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় মেধার ভিত্তিতে উত্তীর্ণ হয়েও গোয়েন্দা সংস্থা, এসবি ও ডিএসবির ভেরিফিকেশনের নামে বিভিন্ন জেলায় শত শত প্রার্থীকে নিয়োগ থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক (ইউটিএল)।
শনিবার এক যৌথ বিবৃতিতে ইউটিএল এর সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. আতিয়ার রহমান ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. যুবাঈর মুহাম্মদ এহসান বলেন, ভেরিফিকেশনের নামে কারও বাদ দেওয়া হয়ে থাকলে এর সুনির্দিষ্ট কারণ ও আইনগত ভিত্তি জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। কারণ ভেরিফিকেশন কখনোই রাজনৈতিক-মতাদর্শিক বৈষম্য, হয়রানি বা বাছাইয়ের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে না।
ইউটিএল নেতারা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে কারও রাজনৈতিক মতামত, ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা সরকারের সঙ্গে মতপার্থক্যের কারণে চাকরি বঞ্চিত করার অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। নির্দিষ্ট অপরাধ বা আইনগত অযোগ্যতার প্রমাণ ছাড়া নিছক অনুমান, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা মতপার্থক্যের ভিত্তিতে কাউকে সরকারি চাকরি থেকে বঞ্চিত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এর আগে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও ভেরিফিকেশনে বাদ পড়া প্রার্থীদের পুনর্বিবেচনা ও নিয়োগপত্র দেওয়ার দাবি জানিয়েছে ‘চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক-২০২৫’। তথ্যগত ভুল বা প্রশাসনিক ত্রুটির কারণে কোনো যোগ্য প্রার্থী বাদ পড়ে থাকলে তা সংশোধন, আপিল ও শুনানির সুযোগ নিশ্চিত এবং নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে কর্তৃপক্ষের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেছেন প্রার্থীরা। শুক্রবার রাতে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে থেকে এসব দাবি জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রায় ১ হাজার ৫০০ জনের নিয়োগপত্র উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দেওয়া হয়নি। আকস্মিকভাবে নিয়োগপত্র না দেওয়ার সিদ্ধান্তে অনেক পরিবার আর্থিক ও মানসিক সংকটে পড়েছে। কারও উপার্জনের পথ বন্ধ হয়েছে, কারও বাবা-মায়ের চিকিৎসা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে পাঁচ দফা দাবি জানানো হয়।
দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—ভেরিফিকেশনে বাদ পড়া প্রত্যেক প্রার্থীর নথি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও পুনঃযাচাইযোগ্য প্রক্রিয়ায় অবিলম্বে পুনরায় যাচাই করা; তথ্যগত ভুল বা অসঙ্গতির শিকার প্রার্থীদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ও প্রশাসনিক আপিলের ব্যবস্থা করা, কোনো দপ্তর বা কর্মকর্তার গাফিলতি, ভুল তথ্য কিংবা প্রশাসনিক ত্রুটির কারণে কেউ বাদ পড়ে থাকলে তা সংশোধন করে তার নিয়োগ নিশ্চিত করা।
গত ৯ জানুয়ারি দেশের ৬১ জেলায় (পার্বত্য তিন জেলা ছাড়া) একযোগে সহকারী শিক্ষক নিয়োগে লিখিত পরীক্ষা (এমসিকিউ টাইপ) অনুষ্ঠিত হয়। এত উত্তীর্ণ ৬৯ হাজার ২৬৫ জন প্রার্থীকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত করা হয়। গত ৮ ফেব্রুয়ারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়। এতে ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থীকে নিয়োগের জন্য প্রাথমিকভাবে নির্বাচন করা হয়।




