সাতক্ষীরা : বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে উপকারী ফল নারকেল গাছ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট জেলায় নারকেল গাছের সংখ্যা ও ফলন আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
একসময় যে বাগেরহাট জেলা “নারকেলের রাজধানী” হিসেবে পরিচিত ছিল, সেখানে এখন অনেক এলাকায় নারকেল গাছ প্রায় বিলুপ্তির পথে। একই চিত্র দেখা যাচ্ছে সাতক্ষীরার কলারোয়া, সদর, তালা, দেবহাটা, আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলা এবং খুলনার কয়রা, পাইকগাছা, ডুমুরিয়া, রামপাল, বটিয়াঘাটা, ফুলতলাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে।
স্থানীয় বাজারগুলোতে নারকেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। যেখানে আগে সহজলভ্য ছিল, সেখানে এখন একটি নারকেল ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ডাবের দামও ৫০ থেকে ৬০ টাকায় পৌঁছেছে।
ক্রেতারা বলছেন, নারকেলের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে, যা দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলছে।
দক্ষিণাঞ্চলের গ্রামাঞ্চলে সারি সারি নারকেল গাছ থাকলেও অধিকাংশ গাছে আর ফল দেখা যাচ্ছে না। গত কয়েক বছরে ফলনে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ধস নেমেছে বলে কৃষকরা জানিয়েছেন।
একসময় এই অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন আয় ও বাজার অর্থনীতি নারকেলের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু এখন সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির পাশাপাশি হোয়াইট ফ্লাই পোকা ও শূতিমূল ছত্রাকের আক্রমণ নারকেল গাছের প্রধান ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কৃষকরা বলছেন, রোগবালাই সম্পর্কে সচেতনতার অভাব এবং যথাযথ চিকিৎসা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে।
নারকেলভিত্তিক অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাগেরহাটে গড়ে ওঠা প্রায় ৪০টি অটো নারকেল তেল মিলের অধিকাংশই বর্তমানে বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন।
নারকেলের ছোবড়া দিয়ে তৈরি কুটিরশিল্প, তেল উৎপাদন ও মাছ চাষের খাদ্য শিল্পও সংকটে পড়েছে। একসময় বিদেশে রপ্তানি হওয়া এসব পণ্যের উৎপাদন এখন প্রায় বন্ধ।
গ্রামীণ নারীরা নারকেলের পাতা ও উপকরণ সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু ফলন কমে যাওয়ায় এই আয়ের পথও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। নারকেল ও ডাব এখন অনেক পরিবারের খাদ্য তালিকা থেকেও হারিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, নারকেল গাছের রোগবালাই নিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের কার্যকর প্রচার-প্রচারণা নেই। ফলে কৃষকেরা সমস্যার সঠিক সমাধান পাচ্ছেন না।
বিশেষজ্ঞ ও কৃষকরা মনে করেন, বিদেশি জাতের চারা রোপণের উদ্যোগে আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়নি। বরং দেশীয় জাত সংরক্ষণ ও সঠিক পরিচর্যার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তারা বাগেরহাটে একটি হর্টিকালচার সেন্টার ও নারকেল গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন, যাতে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান পাওয়া যায়।
কৃষি মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিয়ে নজর দিয়েছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলে দক্ষিণাঞ্চলের নারকেল অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে।



