বিশেষ প্রতিনিধি : জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ক্ষমতার অপব্যবহার, শত কোটি টাকার ঘুষ ও টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগে জড়িত হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা (চ:দা:) মো. সুলতান নাসির উদ্দিনকে বদলি করা হয়েছে। শনিবার (১৭ মে) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. এ. বি. এম. আবু হানিফ স্বাক্ষরিত এক আদেশে তাঁকে জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে শূন্য পদে বদলি করা হয়।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, মো. সুলতান নাসির উদ্দিন জাতীয় বার্ণ ইনস্টিটিউটে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িত ছিলেন। এসব অভিযোগ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও সচিব বরাবর এম এ মান্নান খান নামের একজন ব্যক্তি লিখিতভাবে দাখিল করেন।
অভিযোগে বলা হয়, একসময় ১২০০ টাকা স্কেলে ক্যাশিয়ার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা সুলতান বর্তমানে ঢাকার অভিজাত এলাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, পাঁচতলা বাড়ি, গাড়ি এবং জামালপুরে ৫০-৬০ বিঘা জমির মালিক। তাঁর প্রকৃত আয়ের সঙ্গে এই বিপুল সম্পদের কোনো সামঞ্জস্য নেই।
জানা যায়, ১৯৯৮ সালে ডিজি অফিসের একটি প্রকল্পে অফিস সহকারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন সুলতান। ২০১৬ সালে জাতীয় ইএনটি ইনস্টিটিউট থেকে জাতীয় বার্ণ ইনস্টিটিউটে হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন পান। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নিয়োগ ও পদোন্নতির বিধিমালা লঙ্ঘন করে নিজের পদকে ‘অ্যাকাউন্ট অফিসার’ হিসেবে রেগুলার করেন এবং পরে বিভিন্ন টেন্ডার সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন।
বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, বার্ণ ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন টেন্ডারে অংশ নেওয়া ঠিকাদারদের কাছ থেকে তিনি ১০-২০ শতাংশ পর্যন্ত ঘুষ নিয়ে কাজ বরাদ্দ করতেন। ঘুষের বিনিময়ে বিড সিকিউরিটি ও পারফরম্যান্স সিকিউরিটির জাল কাগজপত্র সরবরাহের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
আরও একটি গুরুতর অভিযোগ হলো—জাতীয় ইএনটি ইনস্টিটিউটে নিজের স্ত্রীর নামে রিসেপশনিস্ট পদে অবৈধ নিয়োগ। নিয়োগ ফাইলে স্বাক্ষরকারী হিসেবে নিজের প্রভাব খাটিয়ে এই নিয়োগ সম্পন্ন করেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
সূত্র জানায়, সদ্য বদলি হওয়া ইনস্টিটিউটের সাবেক সহকারী পরিচালক ডা. হোসাইন ইমামের সঙ্গে সুলতানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তারা মিলে একটি ‘অফলাইন টেন্ডার সিন্ডিকেট’ পরিচালনা করতেন, যা সরকারি ই-জিপি প্রক্রিয়া এড়িয়ে চলত। এমনকি বদলির পরও এই সিন্ডিকেট সক্রিয় রাখার চেষ্টা করছেন সুলতান নাসির।
এদিকে তাঁর বিরুদ্ধে সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগ আরও স্পষ্ট হয়েছে। রাজধানীর পূর্ব বাড্ডায় পাঁচতলা বাড়ি, প্রগতি সরণিতে ৪ কোটি টাকার ফ্ল্যাট, দামি গাড়ি, এবং পৈত্রিক ভিটায় সুরম্য বাড়ি—এসবই তাঁর ঘোষিত আয়ের তুলনায় সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক।
তাঁর HRIS বায়োডাটায় চাকরিজীবনের ACR সংক্রান্ত কোনো তথ্য নেই এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে শুধু এসএসসি পাস উল্লেখ করা হয়েছে, যা আরও সন্দেহ সৃষ্টি করেছে।
এইসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন মহল থেকে তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। পাশাপাশি, জাতীয় বার্ণ ইনস্টিটিউটে ই-জিপি পদ্ধতি চালু ও দুর্নীতিবাজ চক্রের বিরুদ্ধে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
অবশেষে গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তাকে বার্ণ ইনস্টিটিউট থেকে সরিয়ে জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউটে বদলি করেছে। তবে, তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত এখনো শুরু হয়নি।



