ঢাকা  বুধবার, ১০ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২৪শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeরাজনীতিজামায়াতের 'ছায়া বাজেট' শিক্ষা-স্বাস্থ্য পেল সর্বোচ্চ জাতীয় অগ্রাধিকার

জামায়াতের ‘ছায়া বাজেট’ শিক্ষা-স্বাস্থ্য পেল সর্বোচ্চ জাতীয় অগ্রাধিকার

নিজস্ব প্রতিবেদক : ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার বিকল্প বা ‘ছায়া বাজেট’ প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

মঙ্গলবার (৯ জুন) রাজধানীর মগবাজারের আল ফালাহ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘জনমুখী বাজেট ২০২৬-২০২৭ প্রস্তাবনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে দলটির পক্ষে এই প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা সাইফুল আলম খান মিলন। প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, ইমাম-মুয়াজ্জিন ভাতা, করছাড় এবং নতুন পে-স্কেলকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

দলটির উপস্থাপনায় বলা হয়, এই ছায়া বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতি দেখানো হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা, যা জিডিপির ২.৪৩ শতাংশ। জামায়াতের ভাষ্য, এই প্রস্তাবিত কাঠামো প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক নয়; বরং সুশাসন, জবাবদিহিতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন এবং উৎপাদনশীলতার ওপর নির্ভরশীল।

সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, বিগত শাসনামলে ব্যাংক খাতকে দুর্বল করা হয়েছে এবং ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশ থেকে বিপুল অর্থ পাচার হয়েছে বলে দলটি মনে করে। তাঁর দাবি, পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনাই বাজেট ঘাটতি মেটানোর একটি বড় উপায় হতে পারে। জামায়াতের অবস্থান, অর্থনীতিতে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও অদক্ষতা কমিয়ে স্বচ্ছতা ও ন্যায়ভিত্তিক সম্পদ বণ্টনের মাধ্যমে একটি প্রতিযোগিতামূলক কাঠামো গড়ে তোলা দরকার।

প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষক ও সাধারণ করদাতাদের জন্য কর ব্যবস্থায় পরিবর্তনের কথাও বলা হয়েছে। এতে ব্যক্তিখাতে করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে ৪ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে করদাতাদের সন্তানের শিক্ষাখরচ বাবদ বছরে ৫০ হাজার টাকা এবং পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জন্য মাথাপিছু আরও ৫০ হাজার টাকা কর রেয়াতের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। দলটির মতে, এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর চাপ কিছুটা কমবে।

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে জামায়াতের প্রস্তাবও ছিল বড় পরিসরের। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা এবং মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির ভাতা ৬৫০-৯০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রাথমিকভাবে ১ হাজার টাকা এবং পরে ধাপে ধাপে ৩ হাজার টাকা করার কথা বলা হয়েছে। দলটি বলছে, ন্যূনতম মানবিক সহায়তা ছাড়া নিম্নআয়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন সম্ভব নয়।

ধর্মীয় ও সামাজিক খাতে দলটির প্রস্তাবে ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের জন্য নিয়মিত সম্মানী ভাতা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। দেশের সব মসজিদের ইমামদের জন্য মাসিক ৭ হাজার ৫০০ টাকা, মুয়াজ্জিনদের ৫ হাজার টাকা এবং খাদেমদের ৩ হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। জামায়াতের মতে, মসজিদকেন্দ্রিক সেবামূলক কাঠামোকে টেকসই করতে হলে এই পেশাজীবীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও ছায়া বাজেটে স্পষ্টভাবে বলা হয়। দলটির প্রস্তাবে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়ানো, শিক্ষায় করছাড়ের সুযোগ রাখা এবং প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি আলিয়া মাদ্রাসা সরকারিকরণ করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বিনামূল্যে মাতৃত্বকালীন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং সন্তান সম্ভাবনার শুরু থেকে দুই বছর পর্যন্ত মায়েদের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বিনা মূল্যে দেওয়ার প্রস্তাবও এসেছে।

নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সুপারিশও বাজেটে উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করেছে। প্রস্তাবে বলা হয়, ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য ১০০ শতাংশ এবং ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের জন্য ৮০ শতাংশ হারে নতুন পে-স্কেল কার্যকর করা উচিত। দলটির যুক্তি, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় সামাল দিতে না পারলে সরকারি প্রশাসনে কর্মপ্রেরণা ও দক্ষতা দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এছাড়া কর প্রশাসন আধুনিকায়নে এনআইডিকে টিন হিসেবে ব্যবহার, ‘স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বর’ চালু, এবং জাতীয় পরিচয়পত্রকে ব্যবসায়িক পরিচিতি নম্বর বা ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাবও দিয়েছে দলটি। জামায়াতের ভাষ্যে, এতে করজাল সম্প্রসারণ সহজ হবে এবং সেবার ডিজিটাল সমন্বয় আরও কার্যকর হবে।

অনুষ্ঠানে সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, এই ছায়া বাজেটকে দলটি জাতীয় সংসদে আনুষ্ঠানিক বাজেট পাসের আগে জনগণের সামনে তাদের অর্থনৈতিক ভাবনা উপস্থাপনের একটি সুযোগ হিসেবে দেখছে। তিনি দাবি করেন, জনগণের জীবনমান, ন্যায্য বণ্টন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নই তাদের প্রস্তাবনার মূল চালিকাশক্তি।-

সব মিলিয়ে জামায়াতের এই ছায়া বাজেট রাজনৈতিক বার্তা ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের একটি বিকল্প রূপরেখা তুলে ধরেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্তের করস্বস্তিকে কেন্দ্র করে সাজানো এই প্রস্তাবনা এখন রাজনৈতিক অঙ্গন ও অর্থনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular