ঢাকা  বৃহস্পতিবার, ১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ; ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeআন্তর্জাতিকজেলেনস্কির ন্যাটো স্বপ্ন পরিত্যাগ, বার্লিনে শান্তি আলোচনায়

জেলেনস্কির ন্যাটো স্বপ্ন পরিত্যাগ, বার্লিনে শান্তি আলোচনায়

নিউজ ডেস্ক : মার্কিন গণমাধ্যম জানিয়েছে, শান্তিচুক্তির আলোচনায় অংশ নেওয়ার আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ঘোষণা দিয়েছেন যে তিনি ন্যাটো-ভূক্তির দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা পরিত্যাগ করতে রাজি। বিনিময়ে তিনি পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে আইনগত বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা গ্যারান্টি দাবি করছেন।

জেলেনস্কি এটিকে ইউক্রেনের পক্ষের একটি ‘সমঝোতা’ বলে অভিহিত করেছেন এবং বলেছেন, ন্যাটোতে যোগদানের আকাঙ্ক্ষা শুরুর দিক থেকেই ছিল কারণ সেগুলো ছিল “বাস্তব নিরাপত্তার গ্যারান্টি”। তবে মার্কিন ও ইউরোপীয় কিছু মিত্র এই পথ সমর্থন করেনি। তিনি আর্টিকেল-৫–সদৃশ নিরাপত্তা গ্যারান্টি চেয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের পাশাপাশি কানাডা, জাপান ইত্যাদি দেশ থেকে বাধ্যতামূলক আশ্বাস পেলে “ফের কোনো রুশ আক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব”।

পশ্চিমা নিরাপত্তা নিশ্চয়তার প্রস্তাব রাশিয়ার অন্যতম প্রধান যুদ্ধ-দাবি পূরণ করছে – ন্যাটোর দিকে আর পা বাড়ানোর সুযোগ না থাকা – যদিও ইউক্রেন এ পর্যন্ত দখল হওয়া কোনো ভূখণ্ড ছাড়ে নি। রাশিয়া বারবার চায় ইউক্রেন ন্যাটো-অসহমত ঘোষণা করে এবং দোনবাসের প্রায় ১০% এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহার করে দিতে। মস্কো আরও বলেছে ইউক্রেনকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে এবং সেখানে কোনো ন্যাটো-সেনা ঢুকতে পারবে না। পুতিনের শর্ত পূরণের লক্ষ্যে পশ্চিমা ক্ষমতাগুলোর কাছে ‘লিখিত অঙ্গীকার’ও চাওয়া হচ্ছে যাতে পূর্ব দিকে ন্যাটোর সম্প্রসারণ বন্ধ থাকে।

জার্মান প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বার্নহার্ড পিস্টোরিয়াস সতর্ক করে দিয়েছেন যে কেবল নিরাপত্তা গ্যারান্টির ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়, কারণ ১৯৯৪ সালে পরমাণু অস্ত্র বিসর্জনের বিনিময়ে পাওয়া বুধাপেস্ট চুক্তির গ্যারান্টিগুলো শেষে কাজ করেনি। তিনি বলেছিলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ অংশগ্রহণ ছাড়া এ ধরনের গ্যারান্টি “তেমন কার্যকর হবে না”।

আলোচনা এখনও চলমান; অংশগ্রহণকারীরা ২০ ধাপের শান্তি পরিকল্পনা খসড়া প্রণয়ন করছে এবং জেলেনস্কি জানিয়েছেন যে এ পরিকল্পনার শেষে যুদ্ধবিরতি থাকবে।

২০১৯ সালে ইউক্রেনের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল ন্যাটো সদস্যপদ লাভের আকাঙ্ক্ষা। পরবর্তীতে ২০২২ সালের রুশ আগ্রাসনের পর থেকে বার্লিন হয়ে মস্কো-ভূক্তি পর্যন্ত পশ্চিমা সুরক্ষা ব্যবস্থা ইউক্রেনের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। তবে চলতি সপ্তাহের আলোচনায় জেলেনস্কি ঘোষণা দিয়েছেন শান্তিচুক্তি অর্জনের জন্য ‘মর্যাদাপূর্ণ শান্তি’ দরকার এবং নিশ্চিত হতে চান রাশিয়া আর আক্রমণ করবে না। এই মেজর প্রেসিডেন্ট বার্লিনে মার্কিন দূতদের সঙ্গে পাঁচ ঘণ্টার আলাপের পর যে সিদ্ধান্ত নিলেন তা ইউক্রেনের নিরাপত্তা নীতিতে একটি বড় মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, জেলেনস্কি বার্লিনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে ইউক্রেনের ন্যাটো-ভূক্তি আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করার প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি নিজেকে ইউক্রেনের পক্ষে ‘কম্প্রোমাইজ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং বলছেন, “শুরুর দিক থেকেই ইউক্রেনের ন্যাটো-যোগদানের ইচ্ছা ছিল; এগুলো ছিল বাস্তব নিরাপত্তার গ্যারান্টি”। অনেক মার্কিন ও ইউরোপীয় মিত্র এখন ন্যাটো-উত্তরণে সহমত না থাকায় তিনি ঐ ইচ্ছা থেকে সরে আসার প্রস্তাব রেখেছেন। বিনিময়ে তিনি পশ্চিমাদের কাছে আইনি বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা গ্যারান্টি চেয়েছেন। এতে মূলত আর্টিকেল-৫–সদৃশ নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, অর্থাৎ পশ্চিমা প্রতিশ্রুতি হিসেবে আগ্রাসণ হলে প্রতিরোধের নিশ্চয়তা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। জেলেনস্কি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ ছাড়াও কানাডা, জাপানসহ অন্যান্য মিত্র দেশের গ্যারান্টি পেলে “ফের রুশ আক্রমণ ঠেকানো যাবে”। তিনি আবার জোর দিয়ে বলেছেন যে এই গ্যারান্টিগুলো অবশ্যই আইনগত বাধ্যতামূলক হতে হবে।

ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই আলোচনায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও উপদেষ্টা জের্ড কুশনার যুক্ত ছিলেন। আলোচনা শেষে উইটকফ জানিয়েছিলেন যে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। এছাড়া জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মের্জ এই বৈঠকের আয়োজক ছিলেন।

রাশিয়া গত চার বছর ধরেই জোর দিয়ে দাবি করে আসছে যে ইউক্রেনকে ন্যাটো-সদস্যপদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে আসতে হবে এবং দোনবাসের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রায় ১০ শতাংশ এলাকা থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করতে হবে। মস্কো আরও চায় ইউক্রেন ‘নিরপেক্ষ’ রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা হোক এবং সেখানে কোনো ন্যাটো-সেনা মোতায়েন থাকবে না। এই নতুন প্রস্তাবে ইউক্রেনের ন্যাটো-স্বপ্ন ত্যাগ করার কথা বলার ফলে রাশিয়ার অন্যতম প্রধান দাবি পূরণ হচ্ছে। একইসঙ্গে, রাশিয়া পশ্চিমাদের কাছে লিখিত প্রতিশ্রুতি চায় যাতে ভবিষ্যতে ন্যাটো পূর্ব দিকে সম্প্রসারিত না হয়। ইউক্রেন অবশ্য স্পষ্ট করে দিয়েছে যে যুদ্ধবিধ্বস্ত ভূখণ্ড ত্যাগ করবে না। রাশিয়া-আক্রান্ত বিভাজন কাটিয়ে তামাম ইউরোপের মধ্যে বেসামরিকায়ন এবং স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতেই এই শান্তি উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

জেলেনস্কির দাবি করা নিরাপত্তা গ্যারান্টি বলতে মূলত একটি বহুপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তির মতো ব্যবস্থা বুঝায়। পশ্চিমারা সহমত হলে এই গ্যারান্টিতে আক্রমণ হলে প্রত্যুত্তর দেওয়ার অঙ্গীকার থাকবে (যেমন ন্যাটোর আর্টিকেল ৫)। তবে জার্মান প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বার্নহার্ড পিস্টোরিয়াস সতর্ক করে দিয়েছেন যে কেবল অঙ্গীকারের ওপর নির্ভর করা ঠিক হবে না; ১৯৯৪ সালের বুধাপেস্ট চুক্তিতে ইউক্রেন পরমাণু অস্ত্র বিসর্জনের বিনিময়ে যে গ্যারান্টি পেয়েছিল তা শেষ পর্যন্ত রক্ষা করতে পারেনি। তাই পিস্টোরিয়াস বলছেন, যদি মার্কিন অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম থাকে তবে এই গ্যারান্টি “অত্যন্ত কার্যকর” হবে না। পশ্চিমাদের কীভাবে এই নিরাপত্তা বিধান আইনগতভাবে প্রণয়ন হবে ও বাস্তবায়িত হবে, সেটি এখন প্রধান প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা একটি “গুরুত্বপূর্ণ মোড়” হিসেবে দেখছেন। ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি উল্লেখ করেছেন, এটি ইউক্রেনের ভবিষ্যত নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। একইসঙ্গে কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, ন্যাটো-উদ্দেশ্য ছেড়ে দিয়ে শান্তিচুক্তির পথ প্রশস্ত হলেও ইউক্রেনের পরবর্তী নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত হবে তা দৃঢ় নয়। তবুও ইউক্রেন এ পর্যন্ত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে কোনো ভূখণ্ড ছাড়ছে না। ট্রাম্প প্রশাসন বুঝতে পেরেছে আলোচনায় এখন অগ্রাধিকার হল পুনরায় যুদ্ধবিরতি আনা; উইটকফের নেতৃত্বে এমন অগ্রগতি চেষ্টা এসেছে যা চার বছর আগের পূর্ণাঙ্গ মস্কো আগ্রাসনের পর বহুবার ব্যর্থ হয়েছে।

পরবর্তী সোমবার জার্মান চ্যান্সেলর মের্জের সভাপতিত্বে ইউরোপীয় নেতাদের সাথে এক উচ্চ পর্যায়ের শান্তি সম্মেলন হবে। আলোচনায় একটি খসড়া ২০ ধাপের পরিকল্পনার খসড়া তৈরি হচ্ছে, যার সমাপ্তি যুদ্ধবিরতির ওপর নির্দেশিত। জেলেনস্কি আশা করছেন এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আগামী দিনে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে আর কোনো ধাক্কা আসবে না এবং দেশটি একটি “মর্যাদাপূর্ণ শান্তি” অর্জন করবে। এখন দেখার, ইউক্রেনের নিরাপত্তা গ্যারান্টি দেওয়া ও রাশিয়ার পূর্ণ নিপীড়ন বন্ধ করা নিয়ে কৌশলগত এবং কূটনৈতিক ব্যবস্থাপনায় আসল স্থায়িত্ব কতখানি আসে। সূত্র : এবিসি

ঢাকানিউজ২৪/মহফ

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular