জাতিসংঘে আরব বিশ্ব ও ইউরোপীয় দেশগুলো প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেয়। কারণ, ভাষায় অন্তত ভবিষ্যৎ সার্বভৌম ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের কথা উল্লেখ ছিল—যদিও তা ছিল মূলত প্রতীকী। কূটনীতিকদের যুক্তি ছিল, ট্রাম্পকে গাজা প্রশ্নে যুক্ত রাখার এটিই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত উপায়। কিন্তু ‘বোর্ড অব পিস’-এর চার্টার বা সনদ দুই মাসের মধ্যেই সেই আশার ভিত্তি ভেঙে দিয়েছে।
ট্রাম্পের এই সনদের পুরো নথির বড় অংশজুড়ে আছে ক্লাবের নিয়মকানুন। সেখানে চেয়ারম্যান ডোনাল্ড ট্রাম্প সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। তিনিই সদস্য নির্বাচন করবেন, তিনিই বরখাস্ত করবেন, তিনিই ঠিক করবেন বোর্ড কখন বসবে ও কী নিয়ে আলোচনা হবে। এমনকি এককভাবে সিদ্ধান্ত বা প্রস্তাব জারি করার ক্ষমতাও তাঁর। নথিতে ‘চেয়ারম্যান’ শব্দটি এসেছে ৩৫ বার। এটাই ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রকৃত চিত্র। অর্থাৎ, `আধুনিক সম্রাট’ হিসেবে ‘চেয়ারম্যান’এর মূল ভাবের প্রকাশ দেখতে পাচ্ছি।
অন্য যে সদস্যবৃন্দ এক বিলিয়ন ডলার নগদ দিয়ে আজীবন সদস্যপদ কিনে নিবেন তার অবস্থানও অনিশ্চিত থাকবে কিনা তা নিশ্চিত নয়। অর্থাৎ, তাতেও ট্রাম্প চাইলে কাউকে বাদ দিতে পারবেন না—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
‘বোর্ড অব পিস’-এর চার্টার বা সনদে গাজার নাম পর্যন্ত নেই। সেখানে বোর্ডকে একটি স্থায়ী বৈশ্বিক কাঠামো হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যার কাজ হবে ‘বিশ্বজুড়ে শান্তি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা’। বলা হয়েছে, এটি হবে ‘বাস্তববাদী’, ‘ফলাফলমুখী’ এবং এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যা ‘ব্যর্থ হয়ে যাওয়া পদ্ধতি ও প্রতিষ্ঠান’ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। সনদে কোথাও বলা হয়নি এই ‘ব্যর্থ প্রতিষ্ঠান’ আসলে কোনগুলো। প্রকৃত বিচারে, ‘বোর্ড অব পিস’ এই বৈষম্য দূর তো করবেইই না, বরং আরও জঘন্য এক ব্যবস্থা দাঁড় করাবে—যেখানে সদস্যপদের স্থায়িত্ব কিনতে হয় অর্থ দিয়ে, আর ট্রাম্পের মতো সম্রাট’এর দম্ভ ও ইচ্ছার অধীন করে দেয়।
‘বোর্ড অব পিস’-এর চার্টারে গাজার উল্লেখ না থাকলেও বোর্ডের অধীনে থাকবে একটি সাধারণ নির্বাহী বোর্ড, একটি গাজা নির্বাহী বোর্ড এবং ‘গাজার প্রশাসনের জন্য জাতীয় কমিটি’। এই কাঠামোর সর্বনিম্ন স্তরেই কেবল ফিলিস্তিনিদের অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি থাকবে একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী (আইএসএফ), যার তত্ত্বাবধানে থাকবেন একজন মার্কিন মেজর জেনারেল।
তাত্ত্বিকভাবে এই কাঠামো যুদ্ধবিরতি কার্যকর ও পুনর্গঠনের সুযোগ দিতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এর লক্ষ্য জাতিসংঘের ঐতিহ্যগত সংস্থাগুলোকে সরিয়ে দিয়ে যুদ্ধ-পরবর্তী অঞ্চলগুলোতে লাভজনক বেসরকারি উদ্যোগ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য সম্পর্কেই সম্যক ধারণা দেয়।
গাজায় বোর্ডের প্রস্তাবিত ‘হাই রিপ্রেজেনটেটিভ’ নিকোলাই ম্লাদেনভ একজন অভিজ্ঞ জাতিসংঘ কূটনীতিক। কিন্তু স্টিভ উইটকফ, জ্যারেড কুশনারসহ বিভিন্ন বিলিয়নিয়ার ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর চাপে তাঁর পক্ষে জাতিসংঘের কেন্দ্রীয় ভূমিকা ধরে রাখা কঠিন হবে।
এই ঝুলে থাকা অবস্থা ইসরায়েলের জন্য সুবিধাজনক। তারা জিম্মিদের ফিরিয়ে এনেছে, জাতিসংঘের সংস্থাগুলো গাজা থেকে সরানো হচ্ছে, অথচ পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের খরচ ছাড়াই তারা যেকোনো সময় হামলার সুযোগ রাখছে।
কিন্তু ২০ লাখের বেশি ফিলিস্তিনির জন্য এটি এক অসহনীয় নরকযন্ত্রণা। তাঁদের সামনে এখনো অবিরাম বোমাবর্ষণের আশঙ্কা এবং খোলা আকাশের নিচে বা অস্থায়ী তাঁবুতে জীবন।
এমতাবস্থায় জাতিসংঘের স্থায়ী কমিটির সদস্যবৃন্দ শান্তি পর্ষদে যোগ দিয়ে আধুনিক সম্রাট ট্রাম্পকে স্বীকৃতি দিবেন, নাকি তাকে নিয়ন্ত্রণ করবেন বিশ্ব সেদিকে তাকিয়ে আছে।




