নিউজ ডেস্ক: পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে ঢাকার ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টার, বেঙ্গল শিল্পালয়সহ বিভিন্ন স্থানে জমে উঠেছে ঈদ মেলা ও কেনাকাটা। দেশীয় পোশাকে জামদানি, টাঙ্গাইল শাড়ি, খাদি, রাজশাহীর সিল্ক এবং গহনা ও হস্তশিল্পের পসরা সাজিয়েছেন উদ্যোক্তারা। মেলা ও মার্কেটগুলোতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ক্রেতাদের ভিড় থাকলেও বিক্রেতারা বলছেন, এবার বেচাকেনা সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে।
ঢাকায় ঈদ মেলার মূল আকর্ষণ ও কেনাকাটা:
-
- পোশাক ও ফ্যাশন: জামদানি, কাতান, টাঙ্গাইল শাড়ি, সিরাজগঞ্জের লুঙ্গি, গামছা, কুমিল্লার খাদি এবং রাজশাহীর সিল্ক।
- মেলা স্থান: ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টার, বেঙ্গল শিল্পালয়, এবং বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজ।
- সময়: প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা বা ১০টা পর্যন্ত।
- পণ্য: দেশীয় পোশাক, গহনা, সুগন্ধি, হস্তশিল্প, ঘর সাজানোর উপকরণ ও খাবারের স্টল।
- পরামর্শ: ভিড় এড়াতে বিক্রেতারা দ্রুত কেনাকাটা করার পরামর্শ দিচ্ছেন, এবং অনেকেই ব্র্যান্ড শোরুমের পরিবর্তে সাধারণ দোকান বা মেলায় দরদাম করে কিনছেন।
-
এছাড়াও নিউমার্কেট, গাউছিয়া, চাঁদনী চক, হকার্স ও নূরজাহান মার্কেটে ঈদের কেনাকাটা জমে উঠেছে
- রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে জমে উঠেছে ঈদ মেলা। এসব মেলায় দেশীয় পোশাক, গহনা, সুগন্ধি, হস্তশিল্প ও পরিবেশবান্ধব নানা পণ্যের পসরা সাজিয়েছেন উদ্যোক্তারা। বিশেষ করে ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টার এবং বেঙ্গল শিল্পালয়ে আয়োজিত মেলা ঘিরে ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। এসব মেলায় এক ছাদের নিচে নানা ধরনের দেশীয় পণ্য পাওয়া যাওয়ায় ক্রেতাদের আগ্রহও চোখে পড়ছে। তবে বিক্রেতারা বলছেন, দর্শনার্থী থাকলেও প্রত্যাশা অনুযায়ী বিক্রি হচ্ছে না।
ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত তিন দিনের ঈদমেলায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ৫৬ জন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা অংশ নিয়েছেন। তাদের বেশির ভাগই নারী উদ্যোক্তা। গতকাল মেলার শেষ দিনে দেশি নকশার শাড়ি, থ্রি-পিস, পাঞ্জাবি-ফতুয়া, মেয়েদের পোশাকসহ নানা ধরনের পণ্যের পাশাপাশি পাট ও চামড়াজাত সামগ্রী, হাতে তৈরি গহনা এবং সুগন্ধিও বিক্রি হতে দেখা যায়। এক ছাদের নিচে বৈচিত্র্যময় এত পণ্য পাওয়া যাওয়ায় অনেকেই পরিবার নিয়ে মেলায় আসেন।
কলাবাগান এলাকা থেকে মেলায় আসা গৃহিণী মৌসুমি জামান বলেন, অস্থায়ী এসব মেলায় মাঝে মাঝেই কেনাকাটা করতে তিনি আসেন। তিনি বলেন, ‘এক ছাদের নিচে বিভিন্ন ধরনের দেশীয় পণ্য পাওয়া যায় বলে মেলায় আসতে ভালো লাগে। অনেক সময় এখানে কম দামে বা অফারে জিনিস পাওয়া যায়। তাই সুযোগ পেলেই ঘুরে দেখি, পছন্দ হলে কিছু কিনি।’
মেলায় ঘুরে দেখা যায়, নারী উদ্যোক্তাদের স্টলে রয়েছে নকশা করা শাড়ি, হাতে তৈরি পোশাক, গহনা ও ঘর সাজানোর নানা সামগ্রী। অনেক উদ্যোক্তা অনলাইন ব্যবসার পাশাপাশি এসব মেলায় সরাসরি ক্রেতাদের সামনে পণ্য প্রদর্শনের সুযোগ নেন। তবে বিক্রেতাদের অভিযোগ, দর্শনার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হলেও ক্রেতা কম।
মাইডাস সেন্টারের মেলায় অংশ নেওয়া আরবি কালেকশনের উদ্যোক্তা রোকসানা আহমেদ বলেন, ‘এবারের ঈদকে ঘিরে মেলায় ক্রেতার উপস্থিতি প্রত্যাশার তুলনায় কম। এখানে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো মেলা হচ্ছে। কিন্তু এই মেলায় কাস্টমারের অবস্থা খুব একটা ভালো না।’
তিনি জানান, গত মাসে অনুষ্ঠিত দুটি ইভেন্টে বিক্রি ভালো হলেও এবার সেই সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন আরেক বিক্রেতা রুবা আহমেদ। তিনি বলেন, ‘প্রথম দিনে দুটি সেল হয়েছে, দ্বিতীয় দিনে পাঁচটি। কিন্তু আজকে কোনো বিক্রি হয়নি।’ এ বছর তিনটি মেলায় অংশ নিয়ে প্রায় একই পরিস্থিতি দেখেছেন বলেও জানান এই উদ্যোক্তা।
অন্যদিকে রাজধানীর বেঙ্গল শিল্পালয়ে ৮ মার্চ শুরু হয়েছে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প প্রদর্শনী ও মেলা। বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড এবং বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ৯ দিনব্যাপী এই মেলায় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়া ও যশোরসহ বিভিন্ন জেলার অন্তত ১৮টি উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। মেলার দোকানগুলো খোলা থাকছে প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত।
এই মেলায় জামদানি, টাঙ্গাইল শাড়ি, কাতান, মণিপুরী পোশাক, সিরাজগঞ্জের লুঙ্গি ও গামছা, কুমিল্লার খাদি, কুমারখালীর বেডশিট, তোয়ালে এবং রাজশাহীর সিল্কসহ নানা ধরনের তাঁতপণ্য পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি ঢাকাই মসলিন শাড়ি তৈরির বিভিন্ন ধাপ, সুতা তৈরি, তাঁতযন্ত্র ও ঐতিহাসিক নথিপত্রও প্রদর্শন করা হচ্ছে, যা দর্শনার্থীদের মধ্যে আলাদা আগ্রহ তৈরি করেছে।
তাঁতপণ্যের স্টলে কথা হয় ফিস্টডিলসের প্রধান নির্বাহী রুমানা নাসরিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রায় আড়াই বছর ধরে ইকো-ফ্রেন্ডলি পণ্য নিয়ে কাজ করছেন। তার প্রতিষ্ঠানে জামদানি শাড়ি, বাঁশের তৈরি পণ্য ও মসলিন পাওয়া যায়। তিনি জানান, তাদের ব্যবসার বড় অংশ আসে কর্পোরেট গিফট সরবরাহ থেকে। বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানি চিকিৎসকদের জন্য যে উপহার দেয়, সেসব পণ্যের বড় অর্ডার তারা সরবরাহ করেন। একবারে দেড় শ থেকে আড়াই হাজার পিস পর্যন্ত শাড়ি সরবরাহ করা হয় বলে জানান তিনি। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থাকলেও অফলাইন বিক্রিই বেশি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তাঁতশিল্প মেলায় ক্রেতাদের পাশাপাশি ঢাকার ব্যবসায়ীরাও আসছেন পাইকারি দামে পণ্যের খোঁজে। নিউ মার্কেটের ব্যবসায়ী মামুন শহরিয়ার জানান, ব্যক্তিগত কেনাকাটার জন্য নয়, বরং ব্যবসার জন্য পণ্যের উৎস খুঁজতেই তিনি মেলায় এসেছেন। তিনি বলেন, ‘এখানে অনেক বিক্রেতা পাইকারি দামে পণ্য দেন। তাই ব্যবসার জন্য সোর্সিং করতে মেলায় আসি। এখান থেকে পণ্য নিয়ে পরে শোরুমে বিক্রি করা যায়।’ বর্তমানে তাদের ব্যবসা মূলত অফলাইনে হলেও ভবিষ্যতে অনলাইন বিক্রিও শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আরিফুর রহমান বলেন, এখনো মেলায় ক্রেতা কম দেখা গেলেও সময়ের সঙ্গে ভিড় বাড়তে পারে। তিনি বলেন, ‘দেশে তাঁতশিল্পের চাহিদা এখনো অনেক। কারণ তাঁতের কাপড় খুবই আরামদায়ক। আবার অনেক জায়গায় প্রাকৃতিক রং ব্যবহার করা হচ্ছে, যা ক্রেতাদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।’
আয়োজকদের মতে, এসব মেলার প্রধান লক্ষ্য শুধু বিক্রি নয়; বরং তাঁতিদের তৈরি পণ্য সরাসরি ক্রেতাদের সামনে তুলে দেওয়া। বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের লিয়াজোঁ অফিসার মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে তাঁতিদের পণ্য ক্রেতাদের সামনে তুলে ধরা এবং তাদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক তৈরি করা। এখন মানুষ বিদেশি পণ্যের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। তাই দেশীয় তাঁতপণ্যকে আরও বেশি প্রচার করতেই এই আয়োজন।’ তিনি জানান, মেলায় প্রায় ১৮টি দোকান রয়েছে এবং একটি ডিসপ্লে সেন্টারও রাখা হয়েছে। অংশগ্রহণকারী উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে নিয়ম অনুযায়ী নামমাত্র ফি নেওয়া হয়েছে।
আয়োজকদের মতে, এসব আয়োজন দেশীয় শিল্প ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করে। একই সঙ্গে ক্রেতারাও এক জায়গায় নানা ধরনের দেশীয় পণ্য দেখার ও কেনার সুযোগ পাচ্ছেন।



