ঢাকা  বুধবার, ৩০শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ১৩ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeসাহিত্য ও সংস্কৃতিঢাকার কোথায় চলছে মেলা

ঢাকার কোথায় চলছে মেলা

সংস্কৃতি ডেস্ক: পহেলা বৈশাখ এলেই দাদা দাদি মা বাবার শৈশব স্মৃতির কথা মনে পড়ে। তাদের হাজারো স্মৃতির ভিড়ে বারে বারে ঘুরে ঘুরে আসে ‘পহেলা বৈশাখ মানেই নারীর পরনে লাল শাড়ি, পুরুষের পরনে সাদা পাঞ্জাবি, মেলায় ঘুরাঘুরি, মুড়ি-মুড়কি, বাতাসা খাওয়া, পুতুল নাচ দেখা’। দাদুর শৈশবের স্মৃতিতে পহেলা বৈশাখের আয়োজন ছিল এমনই। বাবা-মায়ের সঙ্গে মেলায় গিয়ে প্লাস্টিক বা মাটির হাড়ি-পাতিল, পুতুল-ঘোড়া খেলনা কেনা। মজার মজার বাতাসা, হাওয়াই মিঠাই, খাওয়া। সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল হাতি-ঘোড়া মডেলের বাতাসা কেনা।

তবে আমার শহরের কোলাহলে এসব গল্প একটু আলাদা। দাদুর স্মৃতির মতো এখনকার শিশুরা সেসব উপভোগ করতে পারে না বিগত দশকের শিশুদের মতো। নতুন শিশুরা, নতুন প্রজন্ম অন্যভাবে আানন্দ খুঁজে নেয়। তাই বলে তো পহেলা বৈশাখের দিন তো ঘরে বসে থাকা যায় না।

ভোরের সূর্য ধীরে থীরে টকটকে লাল রং নিয়ে গাছের পাতার আড়াল থেকে বেরুচ্ছে আর রমনার বটমূলে ছায়ানটের গান শুরু হচ্ছে এমন দৃশ্য উপভোগ করার জন্য দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসে মানুষ। চারুকলার ছাত্ররা বিভিন্ন মোটিফ নিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করে সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এ্ই আয়োজনের সাথে একাত্মতা অনুভব করে এবং বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষের জন্য মঙ্গল কামনা করে।

মঙ্গল শোভাযাত্রার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর অসাম্প্রদায়িকতা। এখানে কোনো ধর্ম, বর্ণ বা জাতিগত বিভাজন নেই। সকল ধর্মের, সকল শ্রেণির মানুষ একত্রে অংশগ্রহণ করে। এটি আমাদের সমাজে ঐক্য, সম্প্রীতি ও সহনশীলতার বার্তা ছড়িয়ে দেয়। শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারী মানুষ মুখে মুখে গান গায়, হাতে রঙিন প্ল্যাকার্ড বহন করে, আর হৃদয়ে ধারণ করে শান্তির প্রত্যাশা।

এই শোভাযাত্রার মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন অসংগতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটি নীরব প্রতিবাদও প্রকাশ পায়। অনেক সময় রাজনৈতিক বার্তা, সামাজিক সচেতনতা এবং মানবিক আবেদনও এই শোভাযাত্রার অংশ হয়ে ওঠে। তাই মঙ্গল শোভাযাত্রা কেবল একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়, এটি একটি সামাজিক আন্দোলনের প্রতীকও বটে।

বাংলা নববর্ষ ও মঙ্গল শোভাযাত্রার মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। নববর্ষ যেখানে নতুন সূচনা, মঙ্গল শোভাযাত্রা সেখানে সেই সূচনাকে ইতিবাচক ও মানবিক করে তোলে। নববর্ষের আনন্দকে অর্থবহ করে তুলতে মঙ্গল শোভাযাত্রার ভূমিকা অপরিসীম। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নতুন বছর মানেই কেবল আনন্দ নয়, বরং দায়িত্বশীলতা, সচেতনতা ও মানবিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ।

তবে সময়ের সাথে সাথে বাংলা নববর্ষের উদযাপনেও পরিবর্তন এসেছে। একদিকে যেমন শহরে নববর্ষের উদযাপন আধুনিক ও বাণিজ্যিক রূপ নিচ্ছে, অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রে এর গভীর সাংস্কৃতিক তাৎপর্য কিছুটা ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। অতিরিক্ত কনসার্ট, বাণিজ্যিক আয়োজন এবং আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠান কখনো কখনো মূল চেতনা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এই প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন, নববর্ষের প্রকৃত চেতনা—সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মানবিকতা—রক্ষা করা।

গ্রামবাংলায় এখনো নববর্ষের উৎসব তার ঐতিহ্য বজায় রেখে উদযাপিত হয়। সেখানে প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্ক আরও গভীরভাবে প্রকাশ পায়। কৃষকের জীবনে নববর্ষ মানে নতুন ফসলের আশাবাদ, নতুন স্বপ্নের সূচনা। শহর ও গ্রামের এই ভিন্নতা আমাদের সংস্কৃতিকে আরও বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধ করে।

বাংলা নববর্ষ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা আমাদের শেখায়—সংস্কৃতি কেবল বিনোদনের বিষয় নয়, এটি আমাদের পরিচয়ের অংশ। একটি জাতির সংস্কৃতি তার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধকে ধারণ করে রাখে। তাই এই উৎসবগুলো সংরক্ষণ করা আমাদের দায়িত্ব।

 

পহেলা বৈশাখ ঘিরে ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তে বসছে নানা আয়োজন মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খাবার আর গ্রামীণ খেলাধুলার সমারোহ। পরিবার, বন্ধু কিংবা প্রিয়জনদের সঙ্গে দিনটি উপভোগ করতে পারেন। উদ্দেশ্য বিহীন ঘোরাঘুরি না করে জেনে নিন রাজধানীর কোথায় কোথায় জমছে বৈশাখী মেলা। 

এসএমই বৈশাখী মেলা

বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র, আগারগাঁও

এসএমই ফাউন্ডেশন আয়োজিত এই মেলা বসেছে বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে। ১২ থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত চলা এই মেলায় রয়েছে ৩০০টিরও বেশি স্টল। দেশীয় উদ্যোক্তাদের পণ্য, বৈচিত্র্যময় খাবার এবং প্রতিদিনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান মেলাটিকে করেছে আরও প্রাণবন্ত। পাশাপাশি নাগরদোলা, বায়োস্কোপ, টিয়া পাখির খেলা ও বানর খেলার মতো বিনোদনও রয়েছে। প্রবেশমূল্য মাত্র ৩০ টাকা

বিসিক মেলা
বাংলা একাডেমি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা

বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ১৪ থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত সপ্তাহব্যাপী ‘বৈশাখী মেলা ১৪৩৩’ আয়োজন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)-এর সহযোগিতায় এই মেলায় থাকছে দেশের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পের বিশাল সমাহার। নকশিকাঁথা, মাটির পণ্য, বাঁশ-বেতের কাজ, গৃহসজ্জার সামগ্রী-সবকিছুই পাওয়া যাবে এক জায়গায়। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে মেলাটি।

লাল বৈশাখী
কামাল আতাতুর্ক পার্ক, বনানী

বনানীর কামাল আতাতুর্ক পার্ক-এ ১৩ ও ১৪ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘লাল বৈশাখী’। আয়োজনে থাকছে নাগরদোলা, বায়োস্কোপ, ফটোবুথ, বালিশ খেলা ও মিউজিক্যাল চেয়ারের মতো মজার আয়োজন। কনসার্টে পারফর্ম করবেন হাবিব ওয়াহিদ ও রেনেসাঁ, লেভেল ফাইভ, নেমেসিস ব্যান্ড। এছাড়া থাকছে স্ট্যান্ডআপ কমেডিও। প্রতিদিন ৩০০ টাকা টিকিটে প্রবেশ করা যাবে।

বৈশাখী আয়োজন
হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল

ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকার উইন্টার গার্ডেন ও রূপসী বাংলা গ্র্যান্ড বলরুমে ১৪ এপ্রিল আয়োজন করা হয়েছে বিশেষ বৈশাখী মেলা। এখানে থাকছে নাচ, গান, নাগরদোলা এবং বৈশাখী খাবারের সমাহার। কিছুটা প্রিমিয়াম এই আয়োজনে প্রবেশমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫০০ টাকা।

বৈশাখী মেলা
দ্য রিভার এজ রেস্তোরাঁ, মিরপুর

মিরপুরের দ্যা রিভার এজ রেস্তোরাঁ-এ ১২ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত চার দিনব্যাপী বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়েছে। পরিবার নিয়ে আরামদায়ক পরিবেশে খাওয়া-দাওয়া ও ছোটখাটো উৎসব উপভোগ করতে চাইলে এটি হতে পারে ভালো একটি অপশন।

বৈশাখী মেলা
এয়ার ফোর্স বেইজক্যাম্প, আগারগাঁও

বাংলাদেশ এয়ার ফোর্স-এর উদ্যোগে ১৪ এপ্রিল দিনব্যাপী বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়েছে। সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চলা এই আয়োজনে থাকছে বায়োস্কোপ, মেহেদি উৎসব, ফেস পেইন্টিং, ক্যারিকেচার, বাউল গান ও পটারি হুইল। পাশাপাশি লাটিম, মার্বেল, দাঁড়িয়াবান্ধা, রণপা, লুডু ও ক্যারামের মতো ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলাও থাকবে। খাবারের তালিকায় থাকবে নানা বাঙালি পদ।

উৎসবে বৈশাখ
শেফস টেবিল কোর্টসাইড, মাদানী অ্যাভিনিউ, ভাটারা

ভাটারার শেফস টেবিল কোর্টসাইড-এ ১৪ এপ্রিল আয়োজন করা হচ্ছে ‘উৎসবে বৈশাখ’। আলপনা, পাপেট শো, বাউল গান, নাগরদোলা ও বিভিন্ন খেলাধুলার পাশাপাশি বিকেল ৩টা থেকে শুরু হবে কনসার্ট। সাধারণ প্রবেশ টিকিট ২০০ টাকা, আর কনসার্ট উপভোগ করতে খরচ হবে ৮০০ টাকা।

আর্কা বৈশাখ ১৪৩৩
আলোকি, গুলশান

গুলশানের আলোকিতে ১৩ ও ১৪ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হবে ‘অর্ক বৈশাখ ১৪৩৩’। এখানে থাকছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খাবার ও বিনোদনের নানা আয়োজন, যা নগর জীবনের মাঝে বৈশাখের আমেজ এনে দেবে।

পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী মেলা

পহেলা বৈশাখ মানেই চক বাজারসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বসে ঐতিহ্যবাহী মেলা। এখানে পাওয়া যায় দেশি খাবার, খেলনা, মাটির সামগ্রী এবং পুরান ঢাকার নিজস্ব বৈশাখ আয়োজন একটু আলাদা।

 

 

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular