চট্টগ্রাম প্রতিবেদক: তিন লাখ টন জ্বালানি নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে বহির্নোঙরে এসেছে তিন জাহাজ। এরমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি জাহাজ “সেলসিয়াম গ্যালাপাগোস” ও গ্যাস জার্নি নামের জাহাজ চীন থেকে এলপিজি নিয়ে চট্টগ্রামের ভিড়েছে। “প্রাইমা ধরমা” নামের ইন্দুনেশিয়ার জাহাজ ইথিলিন নিয়ে ভিড়েছে ।
রবিবার (৫ এপ্রিল) চট্টগ্রাম বন্দরের বহিনোঙরে অবস্থান করছে জাহাজ গুলো। এ তিন জাহাজে তিনলাখ টন তলরীকৃত পণ্য রয়েছে। এছাড়া চলতি সপ্তাহে মোট ৬টি জাহাজকে জ্বালানী খালাসের কার্যাদেশ দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
জানা গেছে, দেশে জ্বালানির ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সরকার স্পট মার্কেট থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও জ্বালানি তেল ক্রয় জোরদার করেছে। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে সরকার বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানী সংগ্রহ করছে দেশের চাহিদা মেটানোর জন্য। এর অংশ হিসেবে জ্বালানী নিয়ে একের পর এক জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়ছে।
মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ভারত, কাজাখস্তান থেকেও সরকার ডিজেল এবং ক্রুড অয়েল সংগ্রহ করছে। চলতি সপ্তাহে ৬টি জাহাজকে তেল খালাসের কার্যাদেশ দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। জরুরী পণ্য হিসেবে বিশেষ নিরাপত্তা দিয়ে ভেড়ানো হচ্ছে জ্বালানী সরবরাহকারী জাহাজকে।
চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ক্রুড অয়েল আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। এরমধ্যে মার্চের ৩১ তারিখ পর্যন্ত ৩৮ টি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে বিভিন্ন জ্বালানী নিয়ে। এপ্রিল মাসের চলতি সপ্তাহে ৬টি জাহাজ ভিড়েছে জ্বালানী নিয়ে। সর্বশেষ মালয়েশিয়া থেকে ৩৪ হাজার টন ডিজেল নিয়ে তেল ট্যাঙ্কার “এমটি শান গ্যাং ফা জিয়ান” চট্টগ্রাম বন্দরের কর্ণফুলীর ডলফিন জেটিতে খালাসের কার্যক্রম চলছে। এর আগে চলতি সপ্তাহে মালয়েশিয়া থেকে প্রায় ৩০ হাজার টন পরিশোধিত ডিজেল নিয়ে ‘পিভিটি সোলানা’ নামের একটি ট্যাঙ্কার জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর-এ ভিড়েছিল। সিঙ্গাপুর থেকে ২৭ হাজার ৩০০ মেট্রিক টন ডিজেল নিয়ে ইউয়ান জিং হি নামের অয়েল ট্যাঙ্কার জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়েছিল গত শুক্রবার দুপুর ২টায়। অপর একটি জাহাজ “সেন্ট্রাল স্টার” নামের অয়েল ট্যাঙ্কার জাহাজে ২৫ হাজার মেট্রিক টন অকটেন আমদানি করা হয়েছে। যা আগামি কয়েকদিনের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছাবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম খবরের কাগজকে বলেন, জ্বালানি সরবরাহ জরুরি নিরাপত্তায় দ্রুত বার্থিং দেওয়া হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরে। বহির্নোঙরে আসা মাত্র জেটিতে নিয়ে আসা হচ্ছে। দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও সরবরাহ চেইন সচল রাখার জন্য চট্টগ্রাম বন্দরও জরুরি ভুমিকা রাখছে।
জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহের কাজটি করে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা বলেন, দেশের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। বিপিসি বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান থেকে জি-টু-জি মেয়াদী চুক্তি ও আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির মাধ্যমে দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও এ কাজটি বড় চ্যালেঞ্জিং হলেও বিপিসি পরিশোধিত জ্বালানী আমদানি অব্যাহত রেখেছে। দেশের জ্বালানী চাহিদা মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরণের পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। এর অংশ হিসেবে বিকল্প উৎস কাজাখস্তান থেকেও ৫ লাখ টন ডিজেল আমদানির অনুমোদন দিয়েছে সরকার। যা ধারাবাহিক ভাবে আসবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়। এতে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের জ্বালানি আমদানিতে প্রভাব পড়ে। ফলে বিপিসি বিকল্প উৎস থেকেও জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়। এর অংশ হিসেবে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ভারত, কাজাকিস্তান থেকে জ্বালানী তেল আমদানি করছে সরকার।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বহুমুখী সরবরাহ উৎস গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া উচিত। অন্যথায় আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকা সম্ভব হবে না। নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমদানি বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই।




