ঢাকা  শনিবার, ৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ১৮ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeলিডপরিত্যক্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিক: কোটি টাকার অবকাঠামো, কিন্তু গ্রামবাসীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা...

পরিত্যক্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিক: কোটি টাকার অবকাঠামো, কিন্তু গ্রামবাসীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা কোথায়?

প্রফেসর ডঃ মোহাম্মদ আনিসুর রহমান ফরাজী : বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্পে স্বাস্থ্যখাতকে প্রায়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যের ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়। মাতৃমৃত্যু হ্রাস, শিশুমৃত্যু কমানো, টিকাদান কর্মসূচির বিস্তার এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ—এসব ক্ষেত্রে দেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসা অর্জন করেছে। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে তৃণমূল পর্যায়ে এমন এক বাস্তবতা রয়েছে, যা গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়। দেশের বহু ইউনিয়নে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কমিউনিটি ক্লিনিক, পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র আজ পরিত্যক্ত, অযত্নে ধ্বংসপ্রায় এবং কার্যত জনসেবার বাইরে।

গ্রামের মানুষ প্রতিদিন এই দৃশ্য দেখে। সরকারি অর্থে নির্মিত সুন্দর ভবনগুলো তালাবদ্ধ, জানালার কপাট ভাঙা, দেয়ালে শ্যাওলা জমেছে, আর চারপাশে আগাছা গজিয়েছে। কোথাও দরজায় তালা ঝুলছে বছরের পর বছর, কোথাও আবার ভবনটি একেবারেই পরিত্যক্ত। যে স্থাপনাগুলো একসময় গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার প্রাণকেন্দ্র হওয়ার কথা ছিল, সেগুলো এখন নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক গভীর প্রশাসনিক ব্যর্থতার।

বাংলাদেশে কমিউনিটি ক্লিনিক ধারণাটি ছিল অত্যন্ত যুগান্তকারী। মূল উদ্দেশ্য ছিল—গ্রামের সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া। প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিককে প্রায় ছয় হাজার মানুষের জন্য প্রাথমিক চিকিৎসা, মাতৃস্বাস্থ্যসেবা, শিশুসেবা, টিকাদান, পরিবার পরিকল্পনা এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রদানের কেন্দ্র হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এই উদ্যোগকে আন্তর্জাতিক মহলও প্রশংসা করেছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীরা মনে করেছিলেন, এই উদ্যোগ বাংলাদেশে প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে।

কিন্তু বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন। বহু কমিউনিটি ক্লিনিক এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র কার্যত অচল। অনেক জায়গায় চিকিৎসক নেই, স্বাস্থ্যকর্মী নেই, ওষুধ নেই, এমনকি নিয়মিত তালা খোলার মানুষও নেই। ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষ এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো থেকে কোনো সেবা পাচ্ছে না।

এটি কেবল একটি প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি একটি মানবিক সংকট। কারণ স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। যখন গ্রামীণ জনগোষ্ঠী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকেও বঞ্চিত হয়, তখন সেই সমাজে অসুস্থতা, অপুষ্টি এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়।

বাংলাদেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ এখনও গ্রামে বসবাস করে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য যদি কার্যকর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা কখনোই শক্তিশালী হতে পারে না।

গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। প্রথমত, মানবসম্পদের সংকট এবং অনিয়মিত উপস্থিতি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীরা নিয়মিত কর্মস্থলে থাকেন না। কেউ শহরে বসবাস করেন, কেউ ব্যক্তিগত চেম্বার নিয়ে ব্যস্ত, আবার কেউ সপ্তাহে একদিন বা মাসে কয়েকদিনের বেশি কর্মস্থলে যান না। ফলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ে।

দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক তদারকির অভাব। স্বাস্থ্যখাতে বহু প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ অনেক সময় দুর্বল হয়ে পড়ে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত মনিটরিং না থাকলে অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্র বছরের পর বছর অকার্যকর অবস্থায় পড়ে থাকে।

তৃতীয়ত, অবকাঠামো নির্মাণে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও সেগুলো পরিচালনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব থাকে। উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে ভবন নির্মাণ করা হয়, কিন্তু পরে সেগুলো পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত বাজেট, জনবল এবং ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হয় না।

এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দরিদ্র গ্রামীণ জনগোষ্ঠী। তারা যখন প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যায় এবং সেটি বন্ধ দেখতে পায়, তখন তাদের সামনে দুটি পথ খোলা থাকে—দূরের উপজেলা বা জেলা হাসপাতালে যাওয়া, অথবা স্থানীয় অপ্রশিক্ষিত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া।

দূরের হাসপাতালে যেতে অনেক সময় লাগে, যাতায়াত খরচও বেশি। ফলে অনেক মানুষ বাধ্য হয়ে স্থানীয় ভুঁইফোঁড় চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নেয়, যা অনেক ক্ষেত্রে বিপজ্জনক হতে পারে।

জরুরি পরিস্থিতিতে এই সমস্যা আরও মারাত্মক হয়ে ওঠে। সড়ক দুর্ঘটনা, প্রসবকালীন জটিলতা, হৃদরোগ বা স্ট্রোকের মতো ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা না পেলে রোগীর জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। কিন্তু স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র যদি বন্ধ থাকে, তাহলে রোগীকে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগও নষ্ট হয়ে যায়।

এখানে আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় হলো—অনেক ক্ষেত্রে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র কার্যকর না থাকলেও কিছু স্বাস্থ্যকর্মী রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিকে পাঠিয়ে দেন। এতে রোগীর পরিবারকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়, আর স্বাস্থ্যসেবার একটি বাণিজ্যিক প্রবণতা তৈরি হয়।

এছাড়া পরিত্যক্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো অনেক জায়গায় অসামাজিক কর্মকাণ্ডের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু উশৃঙ্খল যুবক এসব স্থাপনা ব্যবহার করে অনৈতিক কার্যকলাপের জন্য। ফলে গ্রামবাসী এসব স্থানের আশেপাশে যেতে ভয় পায়।

একটি সরকারি স্থাপনা যদি সমাজের জন্য নিরাপত্তাহীনতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সেটি রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের বাজেট প্রতি বছর বাড়ছে। সরকার স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়নে বড় ধরনের বিনিয়োগ করছে। কিন্তু যদি সেই অবকাঠামো জনগণের কাজে না লাগে, তাহলে সেই বিনিয়োগের প্রকৃত সুফল পাওয়া যাবে না।

তাই এখন প্রয়োজন স্বাস্থ্যব্যবস্থার তৃণমূল পর্যায়ে একটি শক্তিশালী সংস্কার। প্রথমত, প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিক এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে সক্রিয় করতে হবে। সেখানে নিয়মিত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। বায়োমেট্রিক উপস্থিতি ব্যবস্থা চালু করলে কর্মীদের অনুপস্থিতি কমানো সম্ভব।

তৃতীয়ত, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। কমিউনিটি ক্লিনিক পরিচালনায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, সমাজকর্মী এবং গ্রামবাসীদের অন্তর্ভুক্ত করা হলে তারা এই কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম তদারকি করতে পারবেন।

চতুর্থত, পরিত্যক্ত ভবনগুলো দ্রুত সংস্কার করে পুনরায় চালু করতে হবে। যেসব স্থানে পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালু করা সম্ভব নয়, সেখানে টেলিমেডিসিন সেন্টার বা মাতৃস্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র চালু করা যেতে পারে।
পঞ্চমত, স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ একটি দুর্নীতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থা কখনোই জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে না।

বিশ্বের অনেক দেশ প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করে জনস্বাস্থ্যে বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করেছে। শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড এবং কিউবার মতো দেশগুলো গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করে জনস্বাস্থ্যের মান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশও সেই পথ অনুসরণ করতে পারে।

বাংলাদেশের উন্নয়নের লক্ষ্য হলো একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক এবং কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠন করা। সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি।

আজ সময় এসেছে পরিত্যক্ত কমিউনিটি ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর দিকে নতুন করে দৃষ্টি দেওয়ার। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই অবকাঠামো যেন ধ্বংসস্তূপে পরিণত না হয়—সেটি নিশ্চিত করা এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব।

উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ শুধু নতুন ভবন নির্মাণ নয়; উন্নয়নের অর্থ হলো মানুষের জীবনমান উন্নত করা। আর সেই উন্নয়ন তখনই সফল হবে, যখন গ্রামের সাধারণ মানুষও সহজে, দ্রুত এবং সম্মানের সাথে স্বাস্থ্যসেবা পাবে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে কতটা শক্তিশালী করা যায় তার উপর। তাই এখনই সময়—পরিত্যক্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার, এবং কোটি টাকার অবকাঠামোকে সত্যিকার অর্থে জনগণের সেবায় কাজে লাগানোর।

যদি এই অবকাঠামো আবার কার্যকর হয়, তাহলে শুধু গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবাই উন্নত হবে না; বরং দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন প্রক্রিয়াও আরও শক্তিশালী হবে।

গ্রামের মানুষের জীবন বাঁচাতে, তাদের স্বাস্থ্যসেবার অধিকার নিশ্চিত করতে, এবং রাষ্ট্রের বিনিয়োগকে সার্থক করতে—এই পরিত্যক্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে আবার জীবন্ত করে তুলতেই হবে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular