মাহফুজুর রহমান মানিক
মঙ্গলবার শুরু হচ্ছে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। একে কেন্দ্র করে বেশ আগ থেকেই নকল বা অসদুপায় অবলম্বন নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর তোড়জোড় আমরা দেখছি। তিনি ফেব্রুয়ারির মধ্যভাগে মন্ত্রিত্ব গ্রহণের পর থেকেই নকল বিষয়ে বেশ সরব। এমনকি ‘পরীক্ষা কেন্দ্রের টয়লেটে নকল পাওয়া গেলেও সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের কর্তৃপক্ষকে দায়ী করা হবে’ বলে হুশিয়ারি দিয়েছেন। (সমকাল, ৪ মার্চ ২০২৬)। ইতোমধ্যে মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষার জন্য কেন্দ্রসচিবদের কাছে যে ৩১ দফা নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে, তাতে যেমন সব কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা বসানোর কথা বলা আছে, তেমনি নকল ঠেকাতে টয়লেটে তল্লাশি করার নির্দেশনাও এসেছে। তবে শিক্ষামন্ত্রী কথায় কথায় যেভাবে নকলের কথা বলছেন, তাতে মনে হতে পারে এটাই বুঝি শিক্ষার প্রধান সমস্যা।
অস্বীকার করা যাবে না, একটা সময় নকল পাবলিক পরীক্ষায় অন্যতম প্রধান সমস্যা ছিল। কাগজে প্রশ্নের উত্তর লিখে শরীরের যে কোনো অংশে বহন করা হতো, পরীক্ষা কেন্দ্রের টয়লেটেও এ-সংক্রান্ত বই বা কাগজ পাওয়া যেত। এমন সময়েই নকল প্রতিরোধে দেশব্যাপী আলোড়ন তুলেছিলেন বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সেই সময়কার অগ্রাধিকার আর আজকের প্রয়োজন যেমন এক নয়, তেমনি নকলের কৌশলও পাল্টে গেছে।
ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে অসদুপায় অবলম্বনের চেষ্টা প্রায়ই দেখা যায়। অবশ্য ৩১ দফা নির্দেশনায় বিষয়টি এসেছে, যেখানে বলা আছে কেন্দ্রসচিব ছাড়া অন্য কেউ মোবাইল ফোন, ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস নিয়ে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন না। পাশাপাশি সরকার সম্প্রতি পাবলিক পরীক্ষায় অনিয়ম, বিশেষ করে ডিজিটাল মাধ্যমে নকল ও প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে ‘পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন, ১৯৮০’ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে, যা মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পেয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে অসদুপায় অবলম্বনের বিষয়গুলো এখানে যুক্ত করা হয়েছে।
নকলের বিরুদ্ধে আইনের সংশোধন নিঃসন্দেহে ভালো পদক্ষেপ। তবে আগে থেকে সতর্কতাও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যেভাবে কক্ষপরিদর্শক ও সংশ্লিষ্টদের ওপর অতিরিক্ত দায় চাপানোর আলামত দেখা যাচ্ছে, তাতে শিক্ষকদের মধ্যে অযথা ভয় তৈরি হতে পারে। অনেক নিরীহ শিক্ষার্থীর মধ্যেও তা কাজ করতে পারে। অতিরিক্ত তল্লাশি শুধু পরীক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত করে না, ভালো শিক্ষার্থীদেরও ভড়কে দিতে পারে। বরং শিক্ষার্থীদের এ আশ্বাস দেওয়া উচিত যে, তোমরা ঠিকভাবে পড়াশোনা করে কেন্দ্রে আসো। স্বাভাবিক পরিবেশে পরীক্ষা দাও।
এখনকার এসএসসি ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা নিশ্চয়ই সচেতন এই অর্থে যে, তারা বাস্তবতা সম্পর্কে জানে। নকল, অসদুপায় কিংবা অন্য কারও ওপর ভরসা করে পরীক্ষায় পাস করা যায় না; নিজের যোগ্যতা ও পড়াশোনায়ই ভালো ফল আসতে পারে। সব শিক্ষার্থীর মধ্যে নৈতিকতার বোধও জাগ্রত করা দরকার। নকল অবলম্বন করা অসদুপায় ও অনৈতিক। একে তো নকল করে ধরা পড়লে কঠোর শাস্তি আছে, অন্যদিকে সামাজিকভাবে ব্যক্তি ও পরিবারের জন্য তা অপমানজনক।
পরীক্ষায় অযথা নকলের ভয় দেখানো জরুরি নয়, বরং নিশ্চিত করতে হবে শ্রেণিকক্ষে যাতে পড়াশোনা হয়। শিক্ষকরা যেন তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেন। মনে রাখতে হবে, পরীক্ষা হলো শিক্ষার্থীদের মেধা মূল্যায়নের একটা মাধ্যম। মেধা যাচাইয়ের জন্য আরও অনেক ধরনের মূল্যায়ন পদ্ধতি আছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা অত্যধিক পরীক্ষাকেন্দ্রিক। যে কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরীক্ষাভীতি দেখা দেয়। দিনশেষে এ পরীক্ষাভীতির কারণে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।
সেজন্য মূল্যায়ন পদ্ধতি হওয়া উচিত শিক্ষার্থীবান্ধব। বিদ্যমান পরীক্ষাব্যবস্থার মান উন্নয়ন সেজন্যই জরুরি। প্রশ্নের ধরন এমন হওয়া উচিত, যার মাধ্যমে সত্যিকার অর্থেই শিক্ষার্থীকে যাচাই করা যায়। এর জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণসহ শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এ সরকার যেন পরীক্ষার দিকেই বেশি ঝুঁকছে। প্রাথমিকে যেখানে শিশুর বয়স ও মনস্তত্ত্ব বিবেচনায় লটারি পদ্ধতি যৌক্তিক ছিল, সেখানে আগামী বছর থেকে পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ বছর পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষাও চালু করা হয়েছে ১৬ বছর পর।
পরীক্ষায় নকল প্রতিরোধ করতে হবে, এতে কারও দ্বিমত নেই। এ নিয়ে অতিরিক্ত হৈচৈ কাম্য নয়। মশা মারতে কামান দাগানোর দরকার কী? ভাবখানা এ রকম–তোমরা নকল করবে, আর আমরা ধরব। অপরাধী ধরার চেয়ে বরং অপরাধ প্রবণতা কমানোর প্রতি নজর দেওয়া দরকার। নকলের কথা যাতে কেউ চিন্তাও করতে না পারে, তেমন ব্যবস্থার কথা আমাদের ভাবতে হবে।
প্রসঙ্গত এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার নির্দেশনায় একটি ইতিবাচক বিষয় উল্লেখ করতে চাই। এর আগে আমি বিকল্প পরীক্ষা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন বিষয়ে লিখেছি (পাবলিক পরীক্ষার কেন্দ্র ঘিরে শিক্ষাঘণ্টার অপচয়, সমকাল, ২ মার্চ, ২০২৪)। নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে, পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরে এবং সময়সূচিতে যেদিন পরীক্ষা নেই সেদিন শ্রেণি কার্যক্রম চালু রাখতে হবে। আগে একটা প্রবণতা ছিল যে, পাবলিক পরীক্ষার পুরো সময়ে কেন্দ্র হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রাখা হতো। এই নির্দেশনার মাধ্যমে অন্তত সে প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্য শিক্ষার্থীদের ক্ষতি কিছুটা হলেও কমবে।
নকলপ্রবণতা রোধে শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষকদের নির্দেশনাই কার্যকর বলে মনে করি। শিক্ষামন্ত্রীরও উচিত শিক্ষকদের ওপর ভরসা করা। ১৮ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রী হিসেবে প্রথম কর্মদিবসেই আ ন ম এহছানুল হক নকলের বিষয়ে কথা শুরু করেছেন। এখনও দুই মাস ধরে তা বলে যাচ্ছেন। একই বিষয় নিয়ে তাঁর এত কথা শুনে অনেকে ইতোমধ্যে বিরক্তিও প্রকাশ করেছেন। শিক্ষামন্ত্রী নকল বিষয়ে ভীতি না জাগিয়ে শিক্ষার মান নিয়ে কথা বলতে পারেন। অন্য বিষয়ের ভিড়ে গুণগত শিক্ষা যেন সরকারের অগ্রাধিকার থেকে না সরে।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল




