ঢাকা  বৃহস্পতিবার, ২রা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ১৭ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeখোলা কলামনার্সিং শিক্ষার্থীদের অস্বাভাবিক মৃত্যু

নার্সিং শিক্ষার্থীদের অস্বাভাবিক মৃত্যু

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনিসুর রহমান ফরাজী

বাংলাদেশে নার্সিং শিক্ষা দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি নার্সিং কলেজ ও ইনস্টিটিউটে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী ভবিষ্যতের নার্স ও মিডওয়াইফ হিসেবে নিজেদের প্রস্তুত করছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন নার্সিং প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অস্বাভাবিক ও রহস্যজনক মৃত্যুর খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় উদ্বেগ বাড়ছে।

সম্প্রতি রাজধানীর আনোয়ার খান মডার্ন নার্সিং কলেজের এক শিক্ষার্থীর মরদেহ ছাত্রীনিবাস থেকে উদ্ধারের খবর প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি দেশের অন্যান্য নার্সিং কলেজ ও ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর দাবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে। তবে এসব ঘটনার সবকটি এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই বা সরকারি তদন্তে নিশ্চিত হয়েছে—এমন দাবি করা সমীচীন নয়। তাই কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে প্রমাণ ছাড়া অভিযুক্ত না করে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত জরুরি।

এন আর এস এর নার্সের মৃত্যু

একজন তরুণ শিক্ষার্থী কেন অস্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করছেন, মৃত্যুর আগে তাঁর মানসিক অবস্থা কেমন ছিল, কোনো একাডেমিক চাপ, পারিবারিক সংকট, সম্পর্কজনিত সমস্যা, বুলিং, হয়রানি বা সাইবার হয়রানি ছিল কিনা, হোস্টেলে নিরাপত্তা ও তত্ত্বাবধান যথাযথ ছিল কিনা, শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর কাউন্সেলিং ব্যবস্থা ছিল কিনা এসব এখন সময়ের দাবি।

একজন নার্সিং শিক্ষার্থীর জন্য হোস্টেল শুধু থাকার জায়গা নয়; এটি তার দ্বিতীয় পরিবার। সেখানে নিরাপদ আবাসন, প্রশিক্ষিত ওয়ার্ডেন, ২৪ ঘণ্টার জরুরি যোগাযোগ, গোপন অভিযোগ ব্যবস্থা, মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং এবং বুলিং ও হয়রানি প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকা আবশ্যক।

ঢাকায় নার্সিং হোস্টেলের কক্ষে ঝুলছিল শিক্ষার্থীর মরদেহ

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তথ্যের স্বচ্ছতা। কোনো মৃত্যুর ঘটনা দন্তাধীন থাকলে সব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়—এটি স্বাভাবিক। কিন্তু সম্পূর্ণ নীরবতা গুজব ও বিভ্রান্তি বাড়ায়। তাই তদন্তের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে কর্তৃপক্ষের উচিত যাচাইকৃত তথ্য যথাসময়ে প্রকাশ করা।

এখন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর, বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিল এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের উচিত গত কয়েক বছরের নার্সিং শিক্ষার্থীদের অস্বাভাবিক মৃত্যু, আত্মহত্যার ঘটনা বা চেষ্টার তথ্য সংগ্রহ করে জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত অনুসন্ধান পরিচালনা করা।

প্রতিটি নার্সিং প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক Student Safety & Welfare System, মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং, গোপন অভিযোগ ব্যবস্থা এবং জরুরি সহায়তা চালু করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে প্রতিটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানের আবাসিক ও শিক্ষাব্যবস্থার নিরাপত্তা পর্যালোচনা করা উচিত।

আমরা হাসপাতালের নার্সদের কাছে মানবিকতা, সহমর্মিতা ও পেশাদারিত্ব প্রত্যাশা করি। কিন্তু সেই নার্সকে যখন শিক্ষার্থী হিসেবে তৈরি করছি, তখন তাঁর নিজের জীবন ও মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

কোনো শিক্ষার্থীর মৃত্যু গুজবের বিষয় নয়, আবার নীরবতার আড়ালে চাপা দেওয়ার বিষয়ও নয়। সত্য জানতে হবে, প্রকৃত কারণ উদঘাটন করতে হবে, দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে এবং ভবিষ্যতের মৃত্যু প্রতিরোধ করতে হবে।

কারণ একজন নার্সিং শিক্ষার্থীর অস্বাভাবিক মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের সন্তান হারানোর ঘটনা নয়—এটি বাংলাদেশের নার্সিং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য একটি গুরুতর সতর্ক সংকেত।

আর একটি জীবন হারানোর আগে এখনই জবাবদিহি, তদন্ত ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

RN, NLPN, PhD (Clinical Nursing)

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular