প্রফেসর ডঃ মোহাম্মদ আনিসুর রহমান ফরাজী:
পর্দার আড়াল থেকে সংসদে: সমালোচনার রাজনীতি, সামাজিক মনস্তত্ত্ব ও গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার সংকট
বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় ব্যক্তি, পরিবার এবং ক্ষমতার সম্পর্ক একটি জটিল ও বহুস্তরবিশিষ্ট বিষয়। সাম্প্রতিক ঘটনায় বিশিষ্ট সাংবাদিক ও জনপ্রিয় টকশো উপস্থাপক জনাব জিল্লুর রহমান এবং তার সহধর্মিণী ফাহমিদা রহমানকে ঘিরে যে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা নিছক একটি নিয়োগ বা মনোনয়নের প্রশ্ন নয়—এটি আমাদের রাষ্ট্রচিন্তা, সামাজিক মনস্তত্ত্ব এবং গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার গভীর সংকটকে উন্মোচন করেছে।
প্রথমত, ফাহমিদা রহমানের সংসদ সদস্য হিসেবে মনোনয়নকে কেন্দ্র করে যে সমালোচনা তৈরি হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়—আমরা এখনো ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যকে স্বীকৃতি দিতে শিখিনি। একজন নারী, যিনি নিজেই একজন প্রতিষ্ঠিত লেখক ও বুদ্ধিজীবী, তাকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে তার স্বামীর পরিচয়ের আলোকে। এই প্রবণতা কেবল লিঙ্গবৈষম্যের প্রতিফলন নয়, বরং এটি আমাদের সামাজিক বিচারবোধের সীমাবদ্ধতার একটি নগ্ন প্রকাশ।
দ্বিতীয়ত, ‘স্বজনপ্রীতি’ বা ‘প্রভাব খাটানো’র অভিযোগ—যা সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে—তা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি গভীর অসুখের ইঙ্গিত দেয়। আমরা প্রায়শই প্রমাণের আগে সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাই। অথচ কোনো সুস্পষ্ট তথ্য বা প্রমাণ ছাড়া একজন ব্যক্তির দীর্ঘদিনের পেশাগত সততা ও নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা কেবল অন্যায় নয়, এটি একধরনের সামাজিক সহিংসতা। জনাব জিল্লুর রহমানের দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবন, বিভিন্ন সরকারের সময়ে তার অবস্থানের ধারাবাহিকতা এবং প্রলোভন প্রত্যাখ্যানের ইতিহাস—এসব কিছুই তাকে একটি ব্যতিক্রমী অবস্থানে স্থাপন করে। সেই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে তাকে হঠাৎ করে ‘স্বার্থপর’ আখ্যায়িত করা আমাদের বিচারবোধের দেউলিয়াত্বকেই প্রকাশ করে।
তৃতীয়ত, একই পরিবারের সদস্যদের ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণের বিষয়টি একটি সুস্থ গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু আমাদের সমাজে এটি এখনো সন্দেহের চোখে দেখা হয়। আমরা ব্যক্তি ও সম্পর্ককে আলাদা করে দেখতে ব্যর্থ হই। ফলে একজনের সিদ্ধান্ত অন্যজনের ওপর আরোপ করা হয়। এটি কেবল অযৌক্তিক নয়, বরং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী।
চতুর্থত, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভূমিকা এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি যেমন মতপ্রকাশের একটি শক্তিশালী মাধ্যম, তেমনি এটি অপপ্রচার, আবেগনির্ভর বিচার এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের একটি প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। যুক্তিনির্ভর সমালোচনার পরিবর্তে আমরা ক্রমশ ‘ট্রায়াল বাই সোশ্যাল মিডিয়া’র দিকে ঝুঁকছি, যা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য মারাত্মক হুমকি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—আমরা কি সত্যিই গণতান্ত্রিক সমাজে বাস করছি, নাকি গণতন্ত্রের কাঠামোর ভেতরে এক ধরনের অসহিষ্ণু, আবেগপ্রবণ এবং বিভাজিত মানসিকতা লালন করছি? গণতন্ত্র মানে কেবল নির্বাচন নয়; এটি সহনশীলতা, যুক্তিবাদিতা এবং ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটি ধারাবাহিক চর্চা।
এই ঘটনাটি আমাদের সামনে একটি কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রশ্ন তুলে ধরেছে: আমরা কি ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যকে স্বীকৃতি দিতে প্রস্তুত? আমরা কি প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ থেকে বিরত থাকতে পারি? আমরা কি ভিন্ন মতকে সহ্য করার মতো মানসিক পরিপক্বতা অর্জন করেছি?
যদি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নেতিবাচক হয়, তবে আমাদের স্বীকার করতে হবে—সমস্যাটি ব্যক্তি বা কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সমস্যাটি আমাদের সামষ্টিক চেতনায়, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে, এবং আমাদের গণতান্ত্রিক চর্চার ভিতরেই প্রোথিত। এই বাস্তবতা স্বীকার করেই আমাদের সামনে এগোতে হবে—অন্যথায় আমরা কেবল ব্যক্তি আক্রমণের বৃত্তেই আবদ্ধ থেকে যাব, কিন্তু কখনোই একটি পরিপক্ব, সহনশীল এবং যুক্তিনির্ভর গণতান্ত্রিক সমাজে পৌঁছাতে পারব না।
( পর্দার আড়াল থেকে সংসদে: সমালোচনার রাজনীতি, সামাজিক মনস্তত্ত্ব ও গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার সংকট-
প্রফেসর ডঃ মোহাম্মদ আনিসুর রহমান ফরাজী )




