প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। শুক্রবার (২১ আগস্ট) গভীর রাতে নয়াদিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবন তার আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনার পূর্ণাঙ্গ মহড়ার কারণে শনিবারের গার্ড পরিবর্তন অনুষ্ঠান বাতিলের ঘোষণা দেওয়ার পর এক ঘণ্টার মধ্যেই তা প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
সফর নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ চললেও এখনো কোনো তারিখ চূড়ান্ত হয়নি বলে জানিয়েছে ঢাকা ও নয়াদিল্লি। এর মধ্যে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের মতপার্থক্য সফরটির ওপর প্রভাব ফেলছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, যা সাধারণত সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে রাষ্ট্রপ্রধান ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সফরের ঘোষণা দিয়ে থাকে, তারেক রহমানের সফর প্রসঙ্গে জানিয়েছে, ‘এই মুহূর্তে তাদের কিছু বলার নেই’। ঢাকাও সফর শুরুর কোনো তারিখ নিশ্চিত করেনি।
রাষ্ট্রপতি ভবনের পক্ষ থেকে ঘোষণা এবং পরে তা প্রত্যাহার করে নেওয়ার ঘটনায় তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। নয়াদিল্লি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে এবং উপযুক্ত তারিখ নির্ধারণের জন্য উভয় পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ চলছে।
২০২৪ সালের আগস্টে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমান বাংলাদেশের দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছিল। কিন্তু গত ৫ আগস্ট, হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির দুই বছর পূর্তিতে, নয়াদিল্লি থেকে অডিও লিঙ্কের মাধ্যমে তার প্রকাশ্য বক্তব্য ঢাকাকে ক্ষুব্ধ করেছে। ঢাকা তাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের দাবি করে আসছে, যেখানে তার মৃত্যুদণ্ড রয়েছে। এই ঘটনাও তারেক রহমানের ভারত সফরের ওপর একটি কালো ছায়া ফেলেছে।
গতকাল শুক্রবার দুপুর ২টার দিকে রাষ্ট্রপতি ভবন ‘এই শনিবার গার্ড পরিবর্তন অনুষ্ঠান হচ্ছে না’ শিরোনামে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনার পূর্ণাঙ্গ মহড়ার কারণে এই শনিবার (২২ আগস্ট, ২০২৬) রাষ্ট্রপতি ভবনের সম্মুখ চত্বরে গার্ড পরিবর্তন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে না।’
সাধারণত অনুষ্ঠানের এক দিন আগেই পূর্ণাঙ্গ মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। তাই এই বিজ্ঞপ্তিকে তারেক রহমানের ভারত সফরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। কিন্তু এক ঘণ্টা পরই রাষ্ট্রপতি ভবন প্রেস বিজ্ঞপ্তিটি প্রত্যাহার করে নেয়।
নতুন বিবৃতিতে বলা হয়, “‘এই শনিবার গার্ড পরিবর্তন অনুষ্ঠান হবে না’-এ বিষয়ে ২১ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে জারি করা প্রেস বিজ্ঞপ্তিটি প্রত্যাহার করা হলো।”
রাষ্ট্রপতি ভবনের এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের পর জল্পনা শুরু হয়, কোনো পক্ষ সফরটি বাতিল করে দিয়েছে কি না।
তারেক রহমানের সফর প্রসঙ্গে প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমার কিছু বলার নেই। নতুন কোনো খবর পেলে আপনাদের জানাব।’
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এ এ এম সালেহ বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘এই সফর নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’
তিনি বলেন, শেখ হাসিনা এবং ‘অন্যান্য পলাতক অপরাধীদের’ প্রত্যর্পণের বিষয়ে ঢাকা ভারতের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি ভবনে ভারতে রাষ্ট্রীয় সফরে আসা রাষ্ট্রপ্রধান ও অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনার আয়োজন করা হয়। এটি ভবনের সম্মুখ চত্বরে অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ত্রি-বাহিনীর আনুষ্ঠানিক গার্ড অব অনার, ভারত ও সফরকারী বিশিষ্ট ব্যক্তির দেশের জাতীয় সংগীত এবং রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পরিচয়পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।
পরে রাষ্ট্রপতি সফররত নেতার সম্মানে একটি নৈশভোজেরও আয়োজন করেন। এতে সফররত প্রতিনিধিদল এবং প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসহ ভারতের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকেন।
তারেক রহমানের সফরসূচি নির্ধারণের মূলে রয়েছে ঢাকার এই পূর্বশর্ত যে, সফরের জন্য একটি ‘অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে’-যা ভারতে শেখ হাসিনার উপস্থিতি এবং গত ৫ আগস্ট তার দেওয়া প্রকাশ্য বক্তব্যের প্রতি ইঙ্গিত করে।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারত কী পদক্ষেপ নিয়েছে, সে বিষয়ে বাংলাদেশ একটি সুস্পষ্ট জবাব চায়। দিল্লি এখনো কোনো সাড়া দেয়নি। ফলে একটি ‘মধ্যপন্থা’ খুঁজে বের করতে জোরদার আলোচনার মধ্যে দুই দেশের মধ্যে এক ধরনের স্নায়ুচাপের লড়াই চলছে।
ভারত তারেক রহমানের একটি স্বতন্ত্র দ্বিপাক্ষিক সফরের জন্য সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে ২১ আগস্টের প্রস্তাব দিয়েছিল। পরে তারা এর সময়সীমা বাড়িয়ে ২৫ আগস্ট পর্যন্ত করেছে। তবে সফরের সময়সূচি নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধটি সর্বপ্রথম ২০২৪ সালে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার উত্থাপন করেছিল। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারও সেই অনুরোধ পুনর্ব্যক্ত করেছে।
‘এ লক্ষ্যে, আমরা শেখ হাসিনা ও অন্যান্য পলাতক অপরাধীদের প্রত্যর্পণের এবং আমাদের দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি মেনে শহিদ শরীফ ওসমান হাদীর অভিযুক্ত হত্যাকারীদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের অনুরোধে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে ভারত কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছি’, গত রবিবার এক বিবৃতিতে বলেছিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
যদিও নয়াদিল্লি জানিয়েছে, প্রত্যর্পণের অনুরোধটি ‘খতিয়ে দেখা হচ্ছে’, ভারত ‘পারস্পরিক স্বার্থ ও আদান-প্রদানের’ ভিত্তিতে একটি ভবিষ্যৎমুখী সম্পর্কের ওপর জোর দিয়ে আসছে।
নয়াদিল্লি ইঙ্গিত দিয়েছে, ঢাকার অনুরোধগুলোর পাশাপাশি তারা বৃহত্তর দ্বিপাক্ষিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগগুলোরও সমাধান করতে চায়।
সূত্র জানায়, দিল্লি ও ঢাকা উভয়েই এই সফরের গুরুত্ব সম্পর্কে অবগত। একটি শক্তিশালী ও সুদৃঢ় সম্পর্ক থেকে উভয় পক্ষই ব্যাপকভাবে লাভবান হবে।
‘আমরা একটিমাত্র বিষয় নিয়ে সম্পর্ককে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে চাই না। তাই আমরা আমাদের বাংলাদেশি অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছি। কারণ আমাদের আলোচনার জন্য যোগাযোগ থেকে শুরু করে জ্বালানি, পানি বণ্টন থেকে অবকাঠামো, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা থেকে জনগণের মধ্যে যোগাযোগ- এমন বিভিন্ন বিষয় রয়েছে। আমরা শিগগিরই একটি সফরের ব্যাপারে আশাবাদী’, সূত্রগুলো জানায়।
দিল্লি যেখানে তারেক রহমানকে একটি স্বতন্ত্র দ্বিপাক্ষিক সফরে আতিথ্য দিতে চায়, সেখানে আগামী মাসে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস নেতাদের শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের জন্যও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে তারা।
বিএনপির দীর্ঘদিনের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায়, তারেক রহমান ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে না পারলে তার সেখানে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস




