নিউজ ডেস্ক | ঢাকা | সকালের নাশতা তৈরির জন্য চুলায় হাঁড়ি বসিয়েছিলেন মোহাম্মদপুরের এক গৃহিণী। কিন্তু অনেকক্ষণ অপেক্ষার পরও জ্বলেনি চুলা। একই সময়ে মিরপুরে কেউ ইন্ডাকশন কুকারে রান্না করছেন, বাড্ডায় কেউ এলপিজি সিলিন্ডারের খোঁজে ছুটছেন, আবার রাজধানীর বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে দেখা যাচ্ছে দীর্ঘ যানবাহনের সারি। একটি প্রযুক্তিগত ত্রুটি কীভাবে সারা দেশের জনজীবনকে নাড়িয়ে দিতে পারে, চলমান গ্যাস সংকট যেন তারই বাস্তব চিত্র।
কক্সবাজারের মহেশখালীতে মার্কিন প্রতিষ্ঠান Excelerate Energy পরিচালিত ভাসমান এলএনজি (FSRU) টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড-পরবর্তী কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০–৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। এর ফলে আবাসিক, শিল্প, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সিএনজি খাত—সব ক্ষেত্রেই তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশে দৈনিক প্রায় ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২,১৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে। ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল মেরামতে বিদেশি বিশেষজ্ঞরা দিনরাত কাজ করছেন। সরকারের আশা, আগামী সপ্তাহে টার্মিনালটি আংশিক সক্ষমতায় চালু করা যাবে এবং এরপর ধাপে ধাপে সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, পুরো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগতে পারে।
রাজধানীতে ভোগান্তির কেন্দ্রবিন্দু মোহাম্মদপুর, মিরপুর, ধানমন্ডি, খিলগাঁও, বনশ্রী, বাড্ডা, ফার্মগেট ও আশপাশের বহু এলাকায় দিনের বড় একটি সময় গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যে নেমে আসছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বিদ্যুৎনির্ভর রান্নার যন্ত্র কিংবা এলপিজির ওপর নির্ভর করছে, ফলে সংসারের ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের।
শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে চাপ গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের স্বল্পচাপে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল ও সিরামিক শিল্পের উদ্যোক্তারা সময়মতো রপ্তানি আদেশ সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। একই সঙ্গে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমে যাওয়ায় সরকার বিকল্প জ্বালানিভিত্তিক কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
মোহাম্মদপুরে ক্ষোভের প্রতিধ্বনি
এই জাতীয় সংকটের প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে। সম্প্রতি মোহাম্মদপুর সেচ্ছাসেবী সংগঠন এক প্রেস রিলিজে অভিযোগ করেছেন, দীর্ঘদিন ধরে এলাকার বিভিন্ন স্থানে গ্যাসের তীব্র সংকট ও স্বল্পচাপের কারণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
সংগঠনটি জানিয়েছেন, নিয়মিত গ্যাস না পেলেও গ্রাহকদের কাছ থেকে পূর্ণ বিল আদায় করা হচ্ছে, যা তারা অন্যায্য বলে মনে করছেন। এ পরিস্থিতির প্রতিবাদে এবং স্থায়ী সমাধানের দাবিতে তারা মোহাম্মদপুরের কাটাশুর ‘আল্লাহ করিম জামে মসজিদ’ প্রাঙ্গণে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন।
প্রেস রিলিজে সংগঠনটির চারটি প্রধান দাবি হলো—
- নিয়মিত ও পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা।
- গ্যাসের চাপ সংকটের স্থায়ী সমাধান করা।
- সেবা না দিয়েও পূর্ণ বিল আদায়ের অভিযোগের অবসান।
- দায়িত্বে অবহেলার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ।
সরকার বলছেন, এটি সাময়িক প্রযুক্তিগত সংকট। সংশ্লিষ্ট এফএসআরইউ মেরামত শেষ হলে ধাপে ধাপে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে নতুন গ্যাসকূপ খনন, দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, নতুন এফএসআরইউ স্থাপন এবং সরবরাহ অবকাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।-
গ্যাসের শিখা নিভে গেলে শুধু একটি চুলা নয়, থমকে যায় একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবন, একটি কারখানার উৎপাদন, একটি শহরের গতি। তাই সংকট নিরসনে দ্রুত মেরামতের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আর মোহাম্মদপুরের মতো এলাকার বাসিন্দাদের দাবি—অস্থায়ী আশ্বাস নয়, তারা চান স্থায়ী সমাধান।




