ঢাকা  বৃহস্পতিবার, ২রা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ১৭ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeখোলা কলামবাংলাদেশের নার্সিং ও মিডওয়াইফারি সংস্কারে নতুন দিগন্ত

বাংলাদেশের নার্সিং ও মিডওয়াইফারি সংস্কারে নতুন দিগন্ত

প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আনিসুর রহমান ফরাজী
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। জনসংখ্যার তুলনায় চিকিৎসক, নার্স ও মিডওয়াইফের ঘাটতি, স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের চ্যালেঞ্জ, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির প্রয়োজনীয়তা—সব মিলিয়ে এখন স্বাস্থ্যখাতে একটি যুগোপযোগী রূপান্তর অপরিহার্য।

ধারাবাহিক মতবিনিময়

এই বাস্তবতায় সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি শিক্ষা ও সেবার উন্নয়ন বিষয়ে ধারাবাহিক মতবিনিময় নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা সরদার মোঃ সাখাওয়াত হোসেন (বকুল), এমপি, মাননীয় স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম. এ. মুহিত, এমপি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস. এম. জিয়াউদ্দিন হায়দার, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আনিসুর রহমান ফরাজীর একাধিক সৌজন্য সাক্ষাৎ ও গঠনমূলক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

আলোচনায় বাংলাদেশের নার্সিং ও মিডওয়াইফারি শিক্ষা, জনবল উন্নয়ন, গবেষণা, আন্তর্জাতিক মানের কারিকুলাম, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়।

এটি শুধু একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়; বরং বাংলাদেশের নার্সিং খাতের ভবিষ্যৎ রূপান্তরের সম্ভাব্য সূচনাবিন্দু বলেই বিবেচিত হতে পারে।

পরিবর্তন জরুরি
বাংলাদেশে প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী নার্সিং ও মিডওয়াইফারি শিক্ষায় ভর্তি হলেও স্বাস্থ্যসেবার বাস্তব চাহিদার তুলনায় দক্ষ নার্সের ঘাটতি এখনো প্রকট। অনেক প্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, শিক্ষক সংকট, আধুনিক ল্যাব ও সিমুলেশন সুবিধার অভাব এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। অন্যদিকে সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিপুল সংখ্যক শূন্য পদ দীর্ঘদিন ধরে পূরণ না হওয়ায় কর্মরত নার্সদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, যা সেবার মানকে প্রভাবিত করছে।

দক্ষ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, একটি শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হলো দক্ষ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি জনবল। উন্নত দেশগুলোতে রোগীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে নার্সদের ভূমিকা সর্বাধিক গুরুত্ব পায়।

বাংলাদেশেও সেই বাস্তবতা অনুধাবন করে এখন সময় এসেছে যুগোপযোগী নীতিগত সংস্কারের।

আন্তর্জাতিক মানের কারিকুলাম

বর্তমান বিশ্বে নার্সিং শিক্ষা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডিজিটাল হেলথ, টেলিমেডিসিন, এভিডেন্স-বেইজড নার্সিং, রোগীর নিরাপত্তা, ক্লিনিক্যাল সিমুলেশন এবং গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা এখন আধুনিক নার্সিং কারিকুলামের অপরিহার্য অংশ।

বাংলাদেশের কারিকুলামকেও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, সিঙ্গাপুর এবং ইউরোপের উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে পুনর্গঠন করা প্রয়োজন। শুধু তাত্ত্বিক শিক্ষা নয়, দক্ষতা, নেতৃত্ব, গবেষণা, যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা তৈরির ওপরও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

গবেষণাভিত্তিক নীতিনির্ধারণ

স্বাস্থ্যখাতে টেকসই উন্নয়নের জন্য আবেগ নয়, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত জরুরি। এজন্য দেশব্যাপী নার্সিং শিক্ষা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, হাসপাতাল, রোগী, কর্মপরিবেশ, কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা নিয়ে একটি জাতীয় গবেষণা পরিচালনা করা সময়ের দাবি।

এই গবেষণার মাধ্যমে জানা যাবে—
                   -দেশে প্রকৃতপক্ষে কতজন নার্স প্রয়োজন।
                   -কোথায় কী ধরনের দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে।
                   -কোন কারিকুলাম পরিবর্তন জরুরি।
                   -বৈদেশিক কর্মসংস্থানের জন্য কী ধরনের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।
                   -সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়নের রূপরেখা কী হওয়া উচিত।

শূন্য পদ পূরণ ও নতুন কর্মসংস্থান

বাংলাদেশে বহু সরকারি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। দ্রুত এসব পদে নিয়োগ সম্পন্ন করা হলে একদিকে যেমন স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত হবে, অন্যদিকে হাজার হাজার শিক্ষিত বেকার নার্স কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন।

এর পাশাপাশি কমিউনিটি হেলথ, জেরিয়াট্রিক কেয়ার, হোম কেয়ার, ক্যান্সার নার্সিং, আইসিইউ, ডায়ালাইসিস, মানসিক স্বাস্থ্য, পুনর্বাসন, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা এবং বিশেষায়িত নার্সিং সেবায় নতুন পদ সৃষ্টি করা যেতে পারে।

বৈদেশিক কর্মসংস্থান: বাংলাদেশের নতুন সম্ভাবনা

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে দক্ষ নার্সের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। জাপান, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বহু দেশে দক্ষ নার্সের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

যদি সরকার পরিকল্পিতভাবে ইংরেজি ভাষা প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক লাইসেন্সিং পরীক্ষা, আধুনিক ক্লিনিক্যাল দক্ষতা এবং সাংস্কৃতিক অভিযোজন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে, তবে বাংলাদেশ বৈদেশিক কর্মসংস্থানে নতুন একটি বড় খাত গড়ে তুলতে পারবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব হবে।

সমন্বিত সংস্কারই সফলতার চাবিকাঠি

শুধু মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিল, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, পেশাজীবী সংগঠন এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত অংশগ্রহণ ছাড়া কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়।

একটি জাতীয় সংলাপ, স্টেকহোল্ডার পরামর্শসভা এবং দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ প্রণয়নের মাধ্যমে নার্সিং খাতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যেতে পারে।

প্রয়োজন—সাহসী সিদ্ধান্ত

বাংলাদেশের নার্সিং ও মিডওয়াইফারি খাত এখন আর কেবল একটি পেশাগত ক্ষেত্র নয়; এটি দেশের সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থানের একটি কৌশলগত খাত। সরকারের নীতিগত আগ্রহ, গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা এবং দক্ষ জনবল তৈরির উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের নার্সিং খাত একটি নতুন যুগে প্রবেশ করবে।

এখন প্রয়োজন—সাহসী সিদ্ধান্ত, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা এবং দ্রুত বাস্তবায়ন। এভাবেই বাংলাদেশের নার্সিং ও মিডওয়াইফারি শিক্ষা ও সেবা সত্যিকার অর্থে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করতে সক্ষম হবে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular