মাহমুদ মীর
বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০২৫-এর জন্য ৯ জনের নাম ঘোষণা করা হয়েছে।
সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিজয়ীদের তালিকা প্রকাশ করা হয়।
এতে বলা হয়েছে, আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি অমর একুশে বইমেলা ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গুণী ব্যক্তিত্বদের হাতে পুরস্কার তুলে দেবেন।
কবিতায় মোহন রায়হান, কথাসাহিত্যে নাসিমা আনিস, প্রবন্ধ/গদ্যে সৈয়দ আজিজুল হক, শিশুসাহিত্যে হাসান হাফিজ, অনুবাদে আলী আহমদ, গবেষণায় মুস্তাফা মজিদ ও ইসরাইল খান, বিজ্ঞানে ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী, মুক্তিযুদ্ধে মঈদুল হাসান বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০২৫ পাচ্ছেন।

স্বাধীনতা পরবর্তীকালে বাংলাদেশে যে-কয়জন নবীন কবির দীপ্ত আবির্ভাব হয়, মোহন রায়হান তাদের অন্যতম। বাংলাদেশের কবিতার ধারায় কবি মোহন রায়হান এক তেজী কণ্ঠস্বর। ১৯৭১-এর রণাঙ্গন থেকে উঠে আসা দ্রোহ, প্রেম, প্রতিবাদ, স্বাধীনতা, সাম্য ও বিপ্লবের কবি মোহন রায়হান কবিতাকে কেবল শিল্প ভাবেন না, বরং কবিতা তাঁর কাছে সমাজ বদলের শাণিত হাতিয়ার। জীবন ও কবিতায় সমান লড়াকু মোহন রায়হান। কবি মোহন রায়হান আমাদের দেশের এক কিংবদন্তি পুরুষ। তাঁর জীবন ইতিহাস বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জাতীয় ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ঘাত-প্রতিঘাত ও উত্থান-পতনের জটিল আবর্তনের খতিয়ান। রাষ্ট্রিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সাহিত্য আন্দোলনের ইতিহাসে মোহন রায়হান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
মোহন রায়হান ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ১ আগস্ট সিরাজগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা সিরাজগঞ্জের কৃতিমানব আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈনিক, সিরাজগঞ্জের খোকশাবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের প্রায় ৩০ বছর নির্বাচিত চেয়ারম্যান, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, খোকশাবাড়ি হাসপাতাল ও ব্রাহ্মণ বয়ড়া গ্রোইন বাঁধের প্রতিষ্ঠা। সিরাজগঞ্জ কওমি জুট মিলস প্রতিষ্ঠার প্রথম উদ্যোক্তা। মাতা মাহমুদা খাতুন আজীবন মানবদরদি, গরিব-দুখি মানুষের সুখ-দুখের নিত্যসঙ্গী, দয়াময়ী, জনহিতৈষিণী, অত্যন্ত ধার্মিক, পবিত্র আত্মার মানুষ ছিলেন।
কবি মোহন রায়হান ১৯৬৯ থেকে শুরু করে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে সকল রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও কবিতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। তিনি বাংলাদেশের একজন অন্যতম সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ও জাতীয় কবিতা পরিষদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, জাতীয় কবিতা পরিষদের দু-বারের সাধারণ সম্পাদক, সাংস্কৃতিক জোটের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাবেরও দু-বারের সাধারণ সম্পাদক। স্ফুলিঙ্গ সাংস্কৃতিক সংসদ, সৃজন, আবৃত্তি সংসদ, বাংলাদেশ লেখক শিবির, প্রাক্সিস অধ্যয়ন সমিতি, অরণি সাংস্কৃতিক সংসদ, তাহের সংসদ, রাখাল, লেখক ইউনিয়ন, সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ কমিটিসহ অসংখ্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালনায় দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর সম্পাদিত পত্র-পত্রিকাগুলোর মধ্যে সাপ্তাহিক দিকচিহ্ন, সূর্য সৈকত, স্ফুলিঙ্গ, সমকণ্ঠ, জনান্তিক, অরণি, সাহস, দুর্বিনীত এই মাটি জ¦লে প্রতিরোধে, লাল তোমার পতাকা, ইশতেহার, বিদ্রোহের পঙ্ক্তিমালা উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে তিনি কবিতাপত্র দিকচিহ্ন এবং সাওল সময় পত্রিকার সম্পাদক।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনে রাজপথে নেতৃত্ব দেন কবি মোহন রায়হান। তিনি ছিলেন সামরিক স্বৈরাচার বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে দেশ-কাঁপানো সাহসী ছাত্রনেতা। আশির দশকে স্বৈরশাসন বিরোধী আন্দোলনের সূচনাকারী ১৪টি ছাত্র সংগঠন নিয়ে যে-সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়, তিনি তার কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন। ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দের ১১ জানুয়ারি ছাত্র-বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়ে প্রথম সামরিক শাসন ভঙ্গ করে ১০ হাজার ছাত্রছাত্রীর মিছিল নিয়ে শিক্ষাভবন ঘেরাও করেন। এ অভিযোগে তাঁকে চোখ-হাত বেঁধে সামরিক গোয়েন্দা বাহিনী তুলে নিয়ে ২১ দিন গুম করে রেখে নির্মম নির্যাতন চালিয়ে মেরুদণ্ড ভেঙে পঙ্গু করে দেয়। পরে ভারতের চেন্নাইয়ে অপারেশন করিয়ে তিনি চলাচলে সক্ষমতা লাভ করেন।
অর্থ, বিত্ত, সম্পদ, ক্ষমতার লোভের কাছে বিক্রি হননি, ভয়-ভীতি, অত্যাচারের কাছে মাথা নত করেননি, আপোস করেনি কখনো অকুতোভয়, লড়াকু, সাহসী, সৎ, ‘মানুষের জন্য জীবন’ মন্ত্রে উদ্দীপ্ত কবি ও যোদ্ধা মোহন রায়হান।
প্রেমিক এবং বিপ্লবী কবি মোহন রায়হান জীবনের অনেক ঘাত-প্রতিঘাত, চড়াই-উৎড়াই পেরিয়ে, অভিজ্ঞতা ঋদ্ধ জীবনে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, শোষণ মুক্ত-সাম্য, ন্যায় বিচার, সামাজিক মর্যাদা-তথা মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন।

নাসিমা আনিস বাংলাদেশের একজন প্রতিশ্রুতিশীল ও পুরস্কারপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক, যিনি মূলত উপন্যাস ও ছোটগল্পের জন্য পরিচিত। তাঁর লেখায় গ্রামীণ জীবন, লোকজ উপাদান এবং মানবিক সম্পর্কের গভীর চিত্র ফুটে ওঠে।
তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘মোহিনীর থান’ তরুণ কথাসাহিত্য পুরস্কার এবং ‘চন্দ্রভানুর পিনিস’ দৈনিক সমকাল নবীন কথাসাহিত্য পুরস্কার লাভ করে।
নাসিমা আনিস আজিমপুর গার্লস স্কুল, ইডেন কলেজ এবং চট্টগ্রাম কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে পড়াশোনা করেছেন।
তিনি এ যাবৎ অন্য যে সব পুরস্কার পেয়েছেন সেগুলো হলো: আবু রুশদ সাহিত্য পুরস্কার (মেহেরপুরের সাহিত্যিক হিসেবে), দৈনিক সমকাল নবীন কথাসাহিত্য পুরস্কার (চন্দ্রভানুর পিনিস) ও তরুণ কথাসাহিত্য পুরস্কার (মোহিনীর থান)।
তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘মোহিনীর থান’ (মাওলা ব্রাদার্স), ‘চন্দ্রভানুর পিনিস’ এবং ‘স্বপ্ন, আমরা বাঁচবো’ (নান্দনিক)।

বাংলা সাহিত্য ও শিল্পকলাবিষয়ক গবেষণায় সৈয়দ আজিজুল হক নামটি স্বমহিমায় ভাস্বর। সাহিত্য ও শিল্পকলার তিনি একজন একাগ্রচিত্ত পাঠক, অনুসন্ধানী বিশ্লেষক, সর্বোপরি একজন ‘যথার্থ’ গবেষক। গবেষণার বন্ধুর পথে তিনি ইতোমধ্যেই পাড়ি দিয়েছেন তিন দশকের বেশি সময়। ৩০ এপ্রিল জীবন-পরিক্রমায় তার পূর্ণ হবে ছয় দশক। ছয় দশকের এ জীবন-পরিক্রমাকে সামনে রেখে তাঁর গবেষণাগ্রন্থসমূহ থেকে কেবল ছয়টি গবেষণাগ্রন্থের অতি-সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনার মধ্যে এ নিবন্ধটি সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। গ্রন্থগুলো হচ্ছে : ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্প : সমাজচেতনা ও জীবনের রূপায়ণ’ (১৯৯৮), ‘ময়মনসিংহের গীতিকা : জীবনধর্ম ও কাব্যমূল্য’ (১৯৯০), ‘জয়নুল আবেদিন : সৃষ্টিশীল জীবনসমগ্র’ (২০১৫), ‘কামরুল হাসান : জীবন ও কর্ম’ (১৯৯৮), সফিউদ্দীন আহমদ’ (২০১৩) এবং ‘কাইয়ুম চৌধুরী : শিল্পীর একান্ত জীবনকথা’ (২০১৫)।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্প বিষয়ে তিনি ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্প : সমাজচেতনা ও জীবনের রূপায়ণ’ (১৯৯৮) শীর্ষক যে গবেষণাগ্রন্থটি প্রণয়ন করেছেন, তা নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও দুর্লভ গবেষণাগ্রন্থসমূহের অন্যতম। মানব জীবনের দর্পণ হিসেবে খ্যাত সাহিত্যমাধ্যকে কতোটা গভীর অনুসন্ধানী দৃষ্টি দিয়ে বিশ্লেষণ করা যায়, এ গবেষণাগ্রন্থ তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। উল্লিখিত গবেষণাগ্রন্থ এবং মানিক-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য গবেষণাকর্মের মাধ্যমে ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে অধ্যাপক ড. সৈয়দ আজিজুল হক অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানিকগবেষক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন।
বাঙালির স্বকীয় সাহিত্যধারার প্রাকৃত ও প্রকৃত সাহিত্যরূপ ময়মনসিংহ গীতিকার একজন শেকড়সন্ধানী বিশ্লেষক হিসেবেও সৈয়দ আজিজুল হকের নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রাচীন গীতিকবি তথা পালাকারদের রচিত প্রত্যেকটি পালাগানে বিধৃত লোকজ জীবনাখ্যানকে কতোটা শিল্পসুষমামণ্ডিত ভাষায় ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা যায়, তার দালিলিক প্রমাণ গবেষক সৈয়দ আজিজুল হকের গবেষণাগ্রন্থ ‘ময়মনসিংহের গীতিকা : জীবনধর্ম ও কাব্যমূল্য’ (১৯৯০)।
বাংলাদেশের শিল্পকলাবিষয়ক গবেষণার ক্ষেত্রেও সৈয়দ আজিজুল হকের নাম সর্বাগ্রে স্মরণীয়। বাংলাদেশের শিল্পকলা যে সৃজন-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এবং যাঁদের হাত ধরে শৈশব-কৈশোর পেরিয়ে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে, তার প্রকৃত ইতিহাস ও স্বাতন্ত্র্যের স্বরূপ অনুধাবন করার জন্য তাঁর গবেষণাকর্মের কাছে দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া গতি নেই। বাংলাদেশের শিল্পকলা তথা পুরো সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের প্রধান পুরুষ, বাংলাদেশের আধুনিক শিল্প আন্দোলনের পুরোধা, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের (১৯১৪-৭৬) জীবন ও শিল্পকর্মের অনুপুঙ্খ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে ঋদ্ধ তাঁর গবেষণাগ্রন্থ ‘জয়নুল আবেদিন : সৃষ্টিশীল জীবনসমগ্র’ (২০১৫)। ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্রের লালিত্যে নদী ও অবারিত প্রকৃতির মাঝে বাল্য-কৈশোর অতিক্রম করা জয়নুল আবেদিন কীভাবে শিল্পসমুদ্রে অবগাহনের মধ্য দিয়ে শিল্পের জন্য আত্মোৎসর্গের করলেন; তাঁর হয়ে ওঠার বিস্তৃত ইতিহাস ও তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনাখ্যানকে সামগ্রিকভাবে বিবৃত করে সৈয়দ আজিজুল হক রচনা করেছেন তাঁর এই শ্রমসাধ্য গবেষণাগ্রন্থ। জয়নুল আবেদিনের জীবন ও সৃষ্টিকর্মের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে এ গ্রন্থের মর্যাদা তুলনারহিত।
‘পটুয়া’ হিসেবে পরিচয়দানকারী, বাংলাদেশের চিত্রকলার অমর শিল্পী কামরুল হাসানের (১৯২১-৮৮) জীবন ও সৃষ্টিকর্ম নিয়ে প্রণীত তাঁর অপর গবেষণাগ্রন্থ ‘কামরুল হাসান : জীবন ও কর্ম’ (১৯৯৮)। ঢাকায় চিত্রকলার চর্চা ও প্রসারের লক্ষ্যে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে মিলিত হয়ে আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠাসহ (১৯৪৮) বাংলাদেশের চিত্রকলার বিকাশে কামরুল হাসানের ভূমিকা অতুলনীয়। এই মহান চিত্রশিল্পীর জন্ম ও পারিবারিক বৃত্তান্ত, শৈশব-কৈশোর পেরিয়ে বেড়ে ওঠার প্রতিটি পর্যায় ও চিত্রকর্মের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে অভাবনীয় দক্ষতায় উল্লিখিত গবেষণাগ্রন্থটি সাজিয়েছেন গবেষক সৈয়দ আজিজুল হক।
বাংলাদেশের পথিকৃৎ শিল্পীদের অন্যতম, বাংলাদেশের আধুনিক ছাপচিত্রের জনক শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদের (১৯২২-২০১২) জীবন ও সৃষ্টিকর্মের এক বিশ্লেষণধর্মী জীবনাখ্যান সৈয়দ আজিজুল হকের গ্রন্থ ‘সফিউদ্দীন আহমেদ’ (২০১৩)। কলকাতার পদ্মপুকুরে শৈশব-কৈশোর কাটানো, কলকাতা সরকারি আর্ট স্কুলের প্রাক্তন এই শিক্ষার্থীর ‘শিল্পগুরু’ হয়ে ওঠার পর্যায়ক্রমিক উপস্থাপনা এবং তাঁর শিল্পকর্মসমূহের অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ এ গ্রন্থের সর্বত্র লক্ষ করা যায়।
বাংলাদেশের চিত্রকলা-জগতের প্রথম প্রজন্মের শিল্পীদের এক কিংবদন্তির নাম কাইয়ুম চৌধুরী (১৯৩২-২০১৪), যিনি ছয় দশক ধরে তাঁর সৃষ্টিসম্ভারে শোভিত করে গেছেন বাংলাদেশের প্রকাশনাশিল্পকে। তাঁর সৃষ্টিকর্ম ও সৃষ্টিশীল জীবন-পরিক্রমার নান্দনিক উপস্থাপনায় রচিত সৈয়দ আজিজুল হকের অপর গবেষণাগ্রন্থ ‘কাইয়ুম চৌধুরী : শিল্পীর একান্ত জীবনকথা’ (২০১৫)। কাইয়ুম চৌধুরীর ব্যক্তিজীবন ও শিল্পীজীবনের নানা তথ্যে সমৃদ্ধ এই গ্রন্থে তাঁর ‘শিল্পী’ হয়ে ওঠার জীবনেতিহাস অবিশ্বাস্য শিল্পকুশলতায় বাণীবদ্ধ করেছেন লেখক। এগারোটি অধ্যায়ে সুবিন্যস্ত এ গ্রন্থের কেবল প্রতিটি অধ্যায়ের শিরোনামগুলো লক্ষ করলেও খুব সহজেই অনুধাবন করা যাবে, কতোটা বিশ্লেষণী দৃষ্টি দিয়ে কতোটা গভীর মমতায় গ্রন্থটি সৃজন করেছেন গবেষক।

হাসান হাফিজ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি ও প্রবীণ সাংবাদিক। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও দৈনিক কালের কণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় দুই শত।
কবি হাসান হাফিজের জন্ম ১৯৫৫ সালের ১৫ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ জেলার সােনারগাঁও উপজেলার এলাহি নগর গ্রামে। জন্মসূত্রে তার নাম গোলাম মওলা শাহজাদা। পরে তিনি লেখক নাম হাসান হাফিজ পরিগ্রহণ করেন। তিনি হােসেনপুর হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্য এবং গণযােগাযােগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে দুইবার এম.এ. ডিগ্রি লাভ করেন।
কবি হাসান হাফিজের স্ত্রীর নাম শাহীন আখতার। তিনি ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের প্রাক্তন সহকারী অধ্যাপক। তাদের একমাত্র সন্তান ডা. শিহান তাওসিফ গৌরব।
কবি হাসান হাফিজ সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি সাংবাদিকতাকে প্রধান পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় সাংবাদিকতার ৪৯ বছর যাবৎ কর্মরত বয়েছেন তিনি। বিভিন্ন পত্রিকায় সাংবাদিক ও সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় দৈনিক বাংলায়। কবি শামসুর রাহমান সম্পাদিত দৈনিক বাংলা পত্রিকায় ১৯৭৬ সালে যোগদান করেন। দৈনিক বাংলায় তাঁর ২১ বছরের কর্মকাল শেষে দৈনিক জনকণ্ঠ, কলকাতার সাপ্তাহিক দেশ (বর্তমানে পাক্ষিক), বৈশাখী টেলিভিশন এবং আমার দেশ-এ কাজ করেছেন। তিনি ২৭ আগস্ট, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে বাংলাদেশের বিখ্যাত পত্রিকা দৈনিক কালের কণ্ঠে সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন।
তিনি অস্ট্রেলিয়া, জাপান, চীন, ফিলিপিন্স, থাইল্যান্ড, ভারত, জর্ডান, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ফিজি, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, সিঙ্গাপুর, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়া প্রভৃতি দেশে কর্মসূত্রে ভ্রমণ করেছেন।
কবি হাসান হাফিজ প্রথম ছড়া ছাপা হয় ইত্তেফাকের কচি কাঁচার আসরে। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘এখন যৌবন যার’ প্রকাশিত হয়েছে ১৯৮২ সালে। এ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ প্রায় ১৯০টি। তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: এখন যৌবন যার, অবাধ্য অর্জুন, অপমানে বেজে উঠি, জলরেখায় শব্দজোড়, হয়তো কিছু হবে, ছড়াসমগ্র, রূপকথা সমগ্র ১-৪, বিদেশিনী বধূ, রবীন্দ্রনাথ: দেশে ভাষণ, টাকডুম টাকডুম বাজে, ছড়ার গাড়ি দূরের পাড়ি, জোড়া হাতি রিমান্ডে, সত্যি সেলুকাস,ফুল পাখি নদীও বিপদে ইত্যাদি।
১৯৭৪ সালের ১৪ই এপ্রিল তারিখে ‘আমরা সুন্দর হব’ এ মূলমন্ত্র নিয়ে নতুন প্রজন্মকে আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়াসে পূর্বদেশের শিশু-কিশোরদের বিভাগ চাঁদের হাটকে একটি শিশু-কিশোর প্রতিষ্ঠানে রূপ দেয়া হয়। নেতৃত্বে ছিলেন বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছড়াকার রফিকুল হক। তরুণ ও ছড়াকার লেখক হাসান হাফিজ ছিলেন চাঁদের হাটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।
কবি হাসান হাফিজ ১১ আগস্ট, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় প্রেসক্লাবের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেন। এর পূর্বে তিনি জাতীয় প্রেসক্লাবের সিনিয়র সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন।[ এছাড়া তিনি বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের (এফইজেবি) সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি প্রায় ১৫টি দেশ ভ্রমণ করেছেন।
কবি হাসান হাফিজ সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে অসংখ্য সম্মাননা ও পুরস্কার পেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে অগ্রণী ব্যাঙ্ক শিশুসাহিত্য পুরস্কার, জাতীয় প্রেস ক্লাব লেখক সম্মাননা, ডাকসু সাহিত্য পুরস্কার, শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর স্বর্ণপদক, কলকাতার সৌহার্দ্য কবিতা উৎসব সম্মাননা, ঢাকা রিপাের্টার্স ইউনিটি লেখক সম্মাননা, কবিতালাপ পুরস্কার, কবি জসীম উদ্দীন স্মৃতি পুরস্কার, এম নূরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার, স্বপ্নকুঁড়ি পদক ইত্যাদি।
উল্লেখ্য, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সমসাময়িক জীবিত লেখকদের সামগ্রিক মৌলিক অবদান চিহ্নিত করে তাঁদের সৃজনী প্রতিভাকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অনুকুল পরিবেশ সৃষ্টি করাই বাংলা একাডেমির সাহিত্য পুরস্কার প্রদানের উদ্দেশ্য। বাংলা সাহিত্যের ১০টি শাখায় এ পুরস্কার প্রদান করা হয়। প্রতিটি পুরস্কারের মূল্যমান ৩,০০,০০.০০ (তিন লক্ষ) টাকা। প্রতি বছর মাসব্যাপী আয়োজিত অমর একুশে গ্রন্থমেলা ও অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পুরস্কার প্রাপ্তদের পুস্কারের অর্থমূল্যের চেক, সম্মাননা পত্র ও সম্মাননা স্মারক প্রদান করেন।
১৯৬০ সাল থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত সাহিত্যিকের তালিকা দেওয়া হলো:
১৯৬০
ফররুখ আহমদ (কবিতা) (জন্ম : জুন ১০, ১৯১৮ – মৃত্যু : অক্টোবর ১৯, ১৯৭৪), আবুল হাশেম খান (উপন্যাস), আবুল মনসুর আহমদ (ছোটগল্প) (১৮৯৮-মার্চ ১৮, ১৯৭৯), আবদুল্লাহ্ হেল কাফী (প্রবন্ধ-গবেষণা) (১৯০০-জুন ৪, ১৯৬০), মোহম্মদ বরকতুল্লাহ (প্রবন্ধ-গবেষণা) (১৮৯৮-১৯৭৪), আসকার ইবনে শাইখ (নাটক) (১০ মার্চ, ১৯২৫ – ১৮ মে, ২০০৯), খান মোহাম্মদ মঈনুদ্দীন (শিশুসাহিত্য) (৩০ অক্টোবর ১৯০১ – ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৮১)।
১৯৬১
আহসান হাবীব (কবিতা) (জন্ম : ২ জানুয়ারি ১৯১৭ – মৃত্যু : ১০ জুলাই ১৯৮৫), সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (উপন্যাস) (আগস্ট ১৫, ১৯২২ – অক্টোবর ১০, ১৯৭১), মবিনউদ্দীন আহমদ (ছোটগল্প), মুহম্মদ আবদুল হাই (প্রবন্ধ-গবেষণা) (১৯১৯-১৯৬৯), নূরুল মোমেন (নাটক) (নভেম্বর ২৫, ১৯০৮ – ফেব্রুয়ারি ১৬, ১৯৯০), বেগম হোসনে আরা (শিশুসাহিত্য) (১৯১৬- ৩০ মার্চ ১৯৯৯)।
১৯৬২
বেগম সুফিয়া কামাল (কবিতা), আবুল ফজল (উপন্যাস), শওকত ওসমান (ছোটগল্প), আকবর আলী (প্রবন্ধ-গবেষণা), মুনীর চৌধুরী (নাটক), বন্দে আলী মিয়া (শিশুসাহিত্য)।
১৯৬৩
আবুল হোসেন (কবিতা), আবু ইসহাক (উপন্যাস), আবু রুশদ্ মতিন উদ্দীন (ছোটগল্প), আবদুল কাদির (প্রবন্ধ-গবেষণা), ইব্রাহীম খাঁ (নাটক), কাজী কাদের নেওয়াজ (শিশুসাহিত্য)।
১৯৬৪
সানাউল হক (কবিতা), বে-নজীর আহমদ (কবিতা), শামসুদ্দীন আবুল কালাম (উপন্যাস), শাহেদ আলী (ছোটগল্প), ড. মুহম্মদ এনামুল হক (প্রবন্ধ-গবেষণা), আকবরউদ্দীন (নাটক), ড. আশরাফ সিদ্দিকী (শিশুসাহিত্য), হাবীবুর রহমান (শিশুসাহিত্য)।
১৯৬৫
তালিম হোসেন (কবিতা), মাহবুব-উল-আলম (উপন্যাস), ড. আলাউদ্দিন আল আজাদ (ছোটগল্প), মোহাম্মদ মনসুরউদ্দীন (প্রবন্ধ-গবেষণা), ওবায়দুল হক (নাটক), মোহাম্মদ মোদাব্বের (শিশুসাহিত্য)।
১৯৬৬
মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা (কবিতা), কাজী আফসারউদ্দীন আহমদ (উপন্যাস), সৈয়দ শামসুল হক (ছোটগল্প), ড. কাজী মোতাহার হোসেন (প্রবন্ধ-গবেষণা), সিকান্দার আবু জাফর (নাটক), আবু যোহা নূর আহমদ (শিশুসাহিত্য)।
১৯৬৭
সৈয়দ আলী আহসান (কবিতা), সরদার জয়েনউদ্দীন (উপন্যাস), আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী (ছোটগল্প), ড. মযহারুল ইসলাম (প্রবন্ধ-গবেষণা), আ.ন.ম. বজলুর রশীদ (নাটক), মোহাম্মদ নাসির আলী (শিশুসাহিত্য)।
১৯৬৮
আল মাহমুদ (কবিতা), আবু জাফর শামসুদ্দীন (উপন্যাস), শওকত আলী (ছোটগল্প), ড. আহমদ শরীফ (প্রবন্ধ-গবেষণা), আনিস চৌধুরী (নাটক), রোকনুজ্জামান খান (শিশুসাহিত্য)।
১৯৬৯
শামসুর রাহমান (কবিতা), শহীদুল্লাহ কায়সার (উপন্যাস), বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর (ছোটগল্প), ড. নীলিমা ইব্রাহীম (প্রবন্ধ-গবেষণা). আলী মনসুর (নাটক), গোলাম রহমান (শিশুসাহিত্য)।
১৯৭০
আতাউর রহমান (কবিতা), সত্যেন সেন (উপন্যাস), হাসান আজিজুল হক (ছোটগল্প), ড. আনিসুজ্জামান (প্রবন্ধ-গবেষণা), ইব্রাহীম খলিল (নাটক), আতোয়ার রহমান (শিশুসাহিত্য), আবুল কালাম শামসুদ্দীন (অনুবাদ সাহিত্য)।
১৯৭১
হাসান হাফিজুর রহমান (কবিতা), জহির রায়হান (উপন্যাস), জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত (ছোটগল্প), মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী (প্রবন্ধ-গবেষণা), আনোয়ার পাশা (প্রবন্ধ-গবেষণা), এখ্লাসউদ্দিন আহ্মদ (শিশুসাহিত্য)।




