ঢাকা  বুধবার, ১লা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ১৬ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeঅর্থনীতিঅভিজ্ঞতা ছাড়াই আমলারা বাড়তি দায়িত্বে

অভিজ্ঞতা ছাড়াই আমলারা বাড়তি দায়িত্বে

নিউজ ডেস্ক: দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের রাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলোর পরিচালনা পর্ষদে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের ব্যাপক উপস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের আওতাধীন ৩৭টি কোম্পানির ৩০৬ জন বোর্ড সদস্যের মধ্যে চেয়ারম্যান ও পরিচালকের ১৬৭টি পদেই রয়েছেন বর্তমান ও সাবেক আমলারা। একই ব্যক্তি একাধিক প্রতিষ্ঠানের বোর্ডে দায়িত্ব পালন করছেন, অথচ সংশ্লিষ্ট খাতে তাদের অনেকেরই প্রত্যক্ষ পেশাগত অভিজ্ঞতা নেই। এ পরিস্থিতিতে করপোরেট সুশাসন, জবাবদিহি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা মহলে সমালোচনা তৈরি হয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পেট্রোলিয়াম খাতের গুরুত্বপূর্ণ কোম্পানিগুলোর বোর্ডে সচিব, সিনিয়র সচিব এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের আধিপত্য রয়েছে। অনেকেই একই সময়ে দুই, তিন বা চারটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান কিংবা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর ফলে বিশেষায়িত খাতের সিদ্ধান্ত গ্রহণে দক্ষতা ও সময় ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

নথি অনুযায়ী, সংস্কৃতি সচিব কানিজ মওলা স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান হওয়ার পাশাপাশি গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল)-এর পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। একইভাবে কৃষি সচিব ড. রফিকুল ইসলাম মোহামেদ, যিনি অর্থনীতিতে পিএইচডিধারী, তিনি নর্দান ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো)-এর চেয়ারম্যান ও প্রশাসনিক বিষয়ক কমিটির আহ্বায়ক। কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির নেতৃত্ব দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ তালিকায় আরও রয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি, যিনি ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসির চেয়ারম্যান। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হক বিআর পাওয়ার জোনের চেয়ারম্যান। জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম একসঙ্গে তিতাস গ্যাস, নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি, বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি এবং বাংলাদেশ-চায়না রিনিউয়েবল এনার্জি কোম্পানির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন।

অন্যদিকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)-এর চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম আটটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি, আশুগঞ্জ পাওয়ার, নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি, বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি, কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি, বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি, তিতাস গ্যাস এবং বাখরাবাদ গ্যাস কোম্পানি।

বর্তমানে জনপ্রশাসনে সংযুক্ত থাকলেও সাবেক বিদ্যুৎ সচিব ফারজানা মমতাজ এখনো পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, এলপিজিএল এবং বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি কোম্পানির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একইভাবে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আবদুল মান্নান বাপেক্স, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস বিতরণ কোম্পানি, জিটিসিএল, বাখরাবাদ ও কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানির বোর্ড সদস্য।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিদ্যুৎ বিভাগের ১৫টি কোম্পানির ১৩৬ জন বোর্ড সদস্যের মধ্যে ৫৮ জনই প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। পেট্রোবাংলার ১৪টি কোম্পানির ১০৮ সদস্যের মধ্যে ৭০ জন, আর বিপিসির আটটি কোম্পানির ৬২ সদস্যের মধ্যে ৩৯ জনই আমলা। ফলে তিনটি খাত মিলিয়ে বোর্ডগুলোর বড় অংশই প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

শুধু দায়িত্বই নয়, এসব বোর্ডে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক ও প্রশাসনিক সুবিধাও। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কোনো কোনো বোর্ড সভায় সদস্যরা ৫০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত সম্মানী পান। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে প্রতি সভায় ৬ থেকে ১২ হাজার টাকা সম্মানী দেওয়া হয়। মাসে একাধিক সভা, বিদেশ সফর, গাড়ি সুবিধা এবং অন্যান্য বৈধ সুযোগ-সুবিধাও বোর্ড সদস্যরা ভোগ করেন।

আরেকটি আলোচিত বিষয় হলো, ঢাকার বাইরে অবস্থিত কোম্পানিগুলোর বোর্ড সভাও অধিকাংশ সময় ঢাকায় আয়োজন করা হয়, যাতে রাজধানীতে অবস্থানরত প্রভাবশালী আমলারা সহজে অংশ নিতে পারেন। এতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত সময় ও ব্যয় বহন করতে হয়।

কোম্পানির কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বোর্ডে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পেশাদার কর্মকর্তাদের প্রতিনিধিত্ব অত্যন্ত সীমিত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শুধু ব্যবস্থাপনা পরিচালক বোর্ডে থাকেন, অন্য অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হয় না। ফলে বাস্তব অভিজ্ঞতার বদলে প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গিই প্রাধান্য পায় এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব ঘটে।

আন্তর্জাতিক চিত্র ভিন্ন। ভারতের রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এনটিপিসি, চীনের নরিনকো গ্রুপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান ইলেকট্রিক পাওয়ারের পরিচালনা পর্ষদে সংশ্লিষ্ট খাতের পেশাজীবী, স্বাধীন পরিচালক ও করপোরেট বিশেষজ্ঞদের প্রাধান্য দেখা যায়। সেখানে সরকারি কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ সীমিত, যা করপোরেট সুশাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম মনে করেন, প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মূল দায়িত্ব নীতিনির্ধারণ ও প্রশাসন পরিচালনা; ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন পরিচালনা নয়।

তাঁর ভাষায়, “ওসির কাজ ডিসিকে দিয়ে হয় না। আমলাদের কাজ ব্যবসা করা নয়। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যবসায়ী বানানো হয়েছে।” তিনি করপোরেট নীতিমালার আলোকে বোর্ড পুনর্গঠন এবং সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞদের অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।-

বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলোর পরিচালনা পর্ষদে দক্ষতা, জবাবদিহি ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে হলে প্রশাসনিক নির্ভরতা কমিয়ে করপোরেট গভর্ন্যান্সভিত্তিক কাঠামো গড়ে তোলাই হবে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর সমাধান।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular