চৌধুরী নূরুল হুদা
বৃহত্তর ময়মনসিংহ লেখক-সংবাদিক ফাউন্ডেশন সংগঠনটি এ অঞ্চলের লেখক ও সাংবাদিকদের সমন্বয়ে গঠিত। এ অঞ্চলের অধিকাংশ লেখক সাংবাদিকদের সাথে আমাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। আমরা একজন আরেকজনের সাথে পরিচয় সম্পর্ক রচনা করতে পেরেছি। তবে এটাও সত্য যে, কোন সংগঠনের উদ্দেশ্যকে সফল করতে একাত্মতা প্রয়োজন। ফাউন্ডেশনের সৃষ্টির শুরুতেই একটি সুন্দর স্বপ্ন নিয়ে সংগঠনটি কাজ করার প্রত্যয়ে নেমেছিল।আমি মনে করি যে কোন বুদ্ধিভিত্তিক সংগঠন রাতারাতি আলোর মুখ দেখতে পায় না। কারণ লেখক ও সাংবাদিক বিষয়টি মেধা ও মননশীলতার জায়গা। আর মননশীল ব্যক্তিগণ সাংগঠনিক ভাবে মনোযোগী হতে দেখা যায় না। কারণ তাঁরা সৃষ্টিশীলতায় নিবিষ্ট থাকেন। তাঁদের মনোজগতে কল্যাণের ভাবনা নিরন্তর কাজ করে।
তবে এটাও সত্য যে, সমাজের কোন কল্যাণ হয় এমন ভাবনায় লেখকরা নিজেকে নিয়োজিত রাখেন আর এ কাজটি তাঁরা নিভৃতে করে থাকেন। তবে যাই হোক লেখকের ভাবনা মনোজগতের কথা বললাম এবার বলা যাক সাংবাদিকদের বিষয়ে। আক্ষরিক অর্থে সংবাদ বা তথ্য অনুসন্ধান বিষয়ে যাঁরা কাজ করেন তাঁদেরকে আমরা সাংবাদিক বলে জানি। এ পেশার গুরুত্ব অনেক, একটা দেশের বা জাতির উন্নয়নে তাঁদের অবদান অনেক বেশি। তাঁরা তাঁদের নিরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নাগরিক সমাজে তুলে ধরেন এবং দেশকে দুষ্টচক্রের হাত থেকে রক্ষা করেন। আর এজন্য যেকোনো সমাজে এ দুই শ্রেণিপেশার মানুষের অবদান বা মূল্যায়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু লক্ষ্য করা যায় আমাদের সমাজে এই দুই শ্রেণিপেশার মানুষের গুরত্ব বা কদর কতটুকু তা বলার অবকাশ নেই।
এজন্য একজন লেখক বা সাংবাদিক মূল্যবোধ বা মূল্যায়নের জায়গায় রাষ্ট্র কতটুকু সহায়ক তা আমরা সহজেই অনুমান করতে পারি। আমরা জানি যে, একজন লেখক ও সাংবাদিক তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অবদানের দিক বিবেচনা করে সমাজের উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রাখা উচিত। আমাদের সমাজে বুদ্ধিভিত্তিক মানুষের কদর বা মূল্যায়ন এখনো যথেষ্ঠ ঘাটতি রয়েছে। বুদ্ধিভিত্তিক সৎ শ্রেণি পেশা মানুষদের কিভাবে সহযোগিতা করা যায় এবং অসৎ সুবিধাবাদী মানুষদের সুন্দর পথে আনা যায় সেই চেষ্টা করে যাওয়া।
বৃহত্তর ময়মনসিংহ লেখক সাংবাদিক ফাউন্ডেশন এর দীর্ঘ পথ চলায় আমরা আমাদের ব্যর্থতা ও ঘাটতির জায়গা গুলো চিহ্নিত করে আরো ভাল কাজের দিকে সকলকে উৎসাহিত করা।
সত্যি কথা বলতে কি যেকোনো সামাজিক সংগঠনের সফলতা আনায়নে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ নেয়া। আর যদি সে কাজটি যৌথ উদ্যোগে না হয় তবে সেটির সফলতা আশা করা কঠিন। সাংগঠনিক কোন কাজ পৃথিবীতে একক ভাবে অর্জন হয় না সাংগঠনিক ভাবেই এর লক্ষ্যে পৌঁছানো উচিত। আমাদের লক্ষ্য বৃহত্তর ময়মনসিংহের লেখক-সাংবাদিকদের একত্রিত করা এবং অত্র অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও কৃষ্টিকে গবেষণার মাধ্যমে তুলে ধরা।
তাছাড়া আমরা যদি সকল মতভেদ ভুলে গিয়ে অত্র অঞ্চলের লেখক ও সাংবাদিকগণ সত্যিকার মনন মেধা বিলিয়ে দিয়ে আন্তরিক হই তাহলে এ বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের নানামুখী উন্নয়নে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি উজ্জ্বল ও গৌরবময় পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে। আমাদের দরকার বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষদের একটি আত্মীক ঐক্য গড়ে তোলা।
আর সেটির জন্য ময়মনসিংহ অঞ্চলের অনেক সংগঠন কাজ করে যাচ্ছে কিন্তু অত্র অঞ্চলের মানুষদের আরো আন্তরিক ভূমিকার প্রয়োজন বলে মনে হয়। একজন আরেক জনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। আমিত্বকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে ঐক্যমতের ভিত্তিতে এগিয়ে যাবার মানুসিকতা সৃষ্টি করতে হবে।
বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের বেশ কয়েকটি শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে এদের মধ্যে ঢাকা কেন্দ্রিক বেশ কয়েকটি সংগঠন রয়েছে। যেমন- বৃহত্তর ময়মনসিংহ লেখক সাংবাদিক ফাউন্ডেশন, বৃহত্তর ময়মনসিংহ সাংস্কৃতিক ফোরাম, মহুয়া সাংস্কৃতিক পরিষদ, বৃহত্তর ময়মনসিংহ গবেষণা ফাউন্ডেশন ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ সাহিত্য পরিষদ উল্লেখযোগ্য। এ সংগঠন গুলোর মধ্যে বৃহত্তর ময়মনসিংহ সাংস্কৃতিক ফোরাম বিভিন্ন সামাজিক অঙ্গণে কাজ করে যাচ্ছে। এবং মহুয়া সাংস্কৃতিক পরিষদ বিভিন্ন জাতীয় দিবসে শিল্প-সাহিত্যের বিভিন্ন অনুষ্ঠান করে থাকে প্রতিবছর।
একুশের বই মেলায় ”মহুয়া সাংস্কৃতিক পরিষদ” মুখপত্র মহুয়া প্রকাশ করে আসছে দীর্ঘদিন যাবৎ। কিন্তু এ মহুয়ার কর্তৃপক্ষ এই সংখ্যাটিকে ত্রৈ-মাসিক সাহিত্য সংখ্যা হিসাবে প্রকাশ করছে, এই সংখ্যাটি মহুয়ার অষ্টম সংখ্যা। আর এ জন্যে মহুয়া’র সম্পাদক হামিদুল আলম সখা ভাইকে ধন্যবাদ জানাই, মহুয়ার অগ্রযাত্রায় তাঁর আন্তরিকতাকে অভিনন্দন জানাতে হয়। তাঁর যাত্রাপথে বিশেষ করে শিল্পসাহিত্য কর্মে আমরা একসাথে আছি দীর্ঘদিন।
আমাদের বৃহত্তর অঞ্চলের ঢাকাস্থ বেশ কয়েকটি সাহিত্য ম্যাগাজিন রয়েছে যারা আমাদের অঞ্চলের ঐতিহ্য তুলে ধরছেন নানাভাবে। যেমন- ত্রৈমাসিক মহুয়া , ফুলেশ্বরী, পাক্ষিক সূর্যতরু, ব্রহ্মপুত্র, মাসিক সৌরভ, কালান্তর ও সাপ্তাহিক ঢাকা নিউজ২৪ তারাও সমাজের বিভিন্ন সংবাদের পাশাপাশি সাহিত্যের বিভিন্ন উপাদান সংকলিত করে থাকে । বৃহত্তর ময়মনসিংহ সাংস্কৃতিক ফোরাম, মহুয়া সাংস্কৃতিক পরিষদ, বৃহত্তর ময়মনসিংহ সাহিত্য পরিষদ, বৃহত্তর ময়মনসিংহ গবেষণা ফাউন্ডেশন, মনিরউদ্দীন ইউসুফ সাহিত্য পরিষদ থেকে অন্বীক্ষণ সাহিত্য পত্র প্রকাশ করা।
বৃহত্তর ময়মনসিংহ লেখক সাংবাদিক ফাউন্ডেশনসহ অত্র অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ধারণ করে ঐক্যতানে এগিয়ে যাওয়ার জোরালো দাবী জানাই। শিল্প- সাহিত্য ও ঐতিহ্যে ভরপুর বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চল। এ অঞ্চল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার বলা যায়। তাছাড়া অত্র অঞ্চলের ছয়টি জেলায় স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন শিল্প-সাহিত্যের সংগঠন রয়েছে তাঁরা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে তুলে ধরছে এবং তা লালন করে আমাদের মননশীলতাকে আরও সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে।
আমাদের বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিভিন্ন জেলাভিত্তিক শিল্প-সাহিত্যের সংগঠন রয়েছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য যে সংগঠনগুলো কাজ করছে এ সংগঠনগুলোর নাম উল্লেখ করা প্রয়োজন। ময়মনসিংহ জেলায় যে সকল সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে যেমন- ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদ, স্বাধীনতা সাহিত্য পরিষদ (কেন্দ্রীয় কমিটি), ময়মনসিংহ লোককৃষ্টি সংস্থা, ময়মনসিংহ ছায়ানট সাংস্কৃতিক সংস্থা, বহুরুপী নাট্য সম্প্রদায় এবং সন্দীপন সাহিত্য সংস্থা উল্লেখযোগ্য।
কিশোরগঞ্জ জেলায় রয়েছে- কিশোরগঞ্জ বঙ্গবন্ধু আবৃত্তি সংসদ, কিশোরগঞ্জ ছড়াকার সংসদ, কিশোরগঞ্জ কবি মনিরউদ্দীন ইউসুফ স্মৃতি ও সাহিত্য পরিষদ, কিশোরগঞ্জ সাহিত্য-সংস্কৃতি পরিষদ, জেগে উঠো নরসুন্দা, চন্দ্রাবতী আবৃত্তি পরিষদ, তাড়াইল সাহিত্য পরিষদ, পাকুন্দিয়া সাহিত্য পরিষদ, হোসেনপুর সাহিত্য পরিষদ, কন্ঠশীলন আবৃত্তি পরিষদ, ভোরের আলো সাহিত্য পরিষদ, সন্দীপন সাহিত্য আড্ডা, কিশোরগঞ্জ তর্কালঙ্কার মঞ্চ, কিশোরগঞ্জ দৃশ্যপট ’৭১, সাহিত্য ও গবেষণা পরিষদ উল্লেখযোগ্য।
নেত্রকোনায় রয়েছে- নেত্রকোনা সাহিত্য সমাজ, শেকড় উন্নয়ন সংস্থা ও চেতনা সংগঠন উল্লেখযোগ্য।
টাঙ্গাইলে রয়েছে – টাঙ্গাইল সাহিত্য সংসদ, স্বকাল সাহিত্য পরিষদ, উত্তর আকাশ, অরুণি সাহিত্য গোষ্ঠী ও গাঙচিল সাহিত্য পরিষদ উল্লেখযোগ্য।
শেরপুরে রয়েছে- কবি সংসদ বাংলাদেশ, নেত্রকোনা কবি পরিষদ, সাহিত্য সংঘ ও অঞ্জলী আবৃতি নিকেতন উল্লেখযোগ্য।
জামালপুরে রয়েছে- জাতীয় কবিতা পরিষদ (জামালপুর), সাহিত্য পরিষদ, লোকজ সামাজিক সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, উদীচী শিল্প গোষ্ঠী উল্লেখযোগ্য। আমাদের বৃহৎ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এ অঞ্চলে যারা সাংস্কৃতিক কর্মে নিয়োজিত রয়েছেন এবং অত্র অঞ্চলের ঐতিহ্যকে তুলে ধরার পাশাপাশি তা জনমনে সঞ্চালন করছেন তাঁদের প্রতি রইল আমাদের অভিনন্দন ও শুভকামনা।
আমাদের স্বপ্ন তখনই সফলতা পাবে যখন আমরা একমঞ্চে দাঁড়িয়ে হাতে হাত রেখে দাঁড়াবার শক্তি অর্জন করবো।
লেখক: নির্বাহী সভাপতি, বৃহত্তর ময়মনসিংহ লেখক-সাংবাদিক ফাউন্ডেশন




