আন্তর্জাতিক ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্প্রতি হওয়া ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি নতুন করে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। হরমুজ প্রণালীতে একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার পর উভয় দেশ পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে আবারও সংঘাতের আশঙ্কা জোরালো হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ব জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
মার্কিন ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালীতে অন্তত তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার শিকার হয়। ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজগুলোর মধ্যে সৌদি আরবের একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার এবং কাতারের একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বহনকারী জাহাজ ছিল। যুক্তরাষ্ট্র এ হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করে এবং একে গত মাসে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে।
এর জেরে ওয়াশিংটন দ্রুত ইরানের তেল রপ্তানির ওপর দেওয়া অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা-ছাড় প্রত্যাহার করে। ওই ছাড়ের ফলে তেহরান সীমিত পরিসরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল রপ্তানির সুযোগ পেয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, আন্তর্জাতিক নৌপথে হামলার পর সেই সুবিধা বহাল রাখার কোনো সুযোগ নেই।
পাল্টা সামরিক অভিযানে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, তারা ইরানের ৮০টিরও বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। হামলায় বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় রাডার, কমান্ড ও কন্ট্রোল অবকাঠামো, জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর ৬০টিরও বেশি ছোট নৌযান লক্ষ্যবস্তু করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই অভিযান পরিচালিত হয়েছে।
অন্যদিকে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে ‘স্পষ্ট আগ্রাসন’ হিসেবে বর্ণনা করে কঠোর জবাব দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ইরানের সামরিক নেতৃত্ব জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনায় বিদেশি হস্তক্ষেপ মেনে নেওয়া হবে না। একই সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবরও সামনে এসেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী?
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথগুলোর একটি। পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি হওয়া বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই জলপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে সামান্য অস্থিরতাও বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি, জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। সাম্প্রতিক হামলার পর অন্তত চারটি তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজ নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে হরমুজ প্রণালীতে প্রবেশ না করে ফিরে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালী ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত চাপের হাতিয়ার। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে এই পথের গুরুত্বের কারণে তেহরান প্রায়ই এ অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে কূটনৈতিক ও সামরিক আলোচনায় প্রভাব বিস্তারের উপায় হিসেবে ব্যবহার করে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন অবাধ রাখতে সেখানে শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখছে।-
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটো সম্মেলনে যাওয়ার আগে মন্তব্য করেছেন, ইরানের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা এখন কার্যত “শেষ”। যদিও মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উত্তেজনা সত্ত্বেও চূড়ান্ত সমঝোতার লক্ষ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। একই সময়ে চীন, কাতারসহ একাধিক দেশ অবিলম্বে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছে।




