মোঃ নজরুল ইসলাম, ময়মনসিংহ : দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (মউক)। আর এই নতুন সংস্থার প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ময়মনসিংহ উত্তর জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোতাহার হোসেন তালুকদার।
জামালপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও শেরপুরসহ চার জেলা নিয়ে ২০১৫ সালে ময়মনসিংহ বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং ২০১৮ সালে বিভাগীয় শহরকে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা হলেও পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনায় পিছিয়ে রয়েছে ময়মনসিংহ। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ন, যানজট, জলাবদ্ধতা, খাল ও জলাধার দখল, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, সংকীর্ণ সড়ক এবং সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যানের অভাবে নগরজীবন দিন দিন জটিল হয়ে উঠেছে। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এ বাস্তবতায় কার্যকর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বিকল্প নেই।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সঠিক পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার সমন্বয় ঘটাতে পারলে মউক ময়মনসিংহের নগর ব্যবস্থাপনায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। ইতোমধ্যে নগরবাসীর মধ্যে পরিকল্পিত আবাসন, আধুনিক সড়ক যোগাযোগ, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, খাল পুনরুদ্ধার, সবুজায়ন ও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়ে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আদলে গড়ে ওঠা এই সংস্থাটি ভবিষ্যতে ময়মনসিংহের নগর সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগবান্ধব অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে এমএ, এলএলবি ও এমএড ডিগ্রিধারী মোতাহার হোসেন তালুকদার দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার অধিকারী। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতির মাধ্যমে তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়। পরে তিনি জিএস, ভিপি, জেলা ছাত্রদলের সভাপতি, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহ-সভাপতি, জেলা যুবদলের সভাপতি, তারাকান্দা উপজেলা বিএনপির সভাপতি এবং ময়মনসিংহ উত্তর জেলা বিএনপির নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি তারাকান্দা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও ময়মনসিংহ উত্তর জেলা বিএনপির একমাত্র যুগ্ম-আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায়ও রয়েছে তার বাস্তব অভিজ্ঞতা। উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন, গ্রামীণ সড়ক নির্মাণ, অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখেন তিনি।
দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রতিক্রিয়ায় মোতাহার হোসেন তালুকদার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমার ওপর যে বিশ্বাস ও আস্থা রেখেছেন এবং ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন, সেই আস্থার মর্যাদা রক্ষায় আমি আন্তরিকভাবে কাজ করব। তিনি অতীতেও জনগণের রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। এখন উন্নয়নের মাধ্যমে মানুষের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করতে চাই।’
মোতাহার হোসেন তালুকদার আরও বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য ময়মনসিংহকে একটি পরিকল্পিত, আধুনিক ও নান্দনিক নগরীতে রূপান্তরিত করা। ব্রহ্মপুত্র নদের ওপারের সম্ভাবনাময় এলাকাগুলোকেও উন্নয়নের আওতায় এনে একটি সমন্বিত নগর গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা এমন একটি শহর গড়তে চাই, যেখানে উন্নয়ন, সৌন্দর্য ও নাগরিক সুবিধার সমন্বয় থাকবে। দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে কেউ ময়মনসিংহে প্রবেশ করলেই যেন বুঝতে পারে এটি একটি পরিকল্পিত ও স্বতন্ত্র নগরী—সেই লক্ষ্য নিয়েই কাজ করব, ইনশাআল্লাহ।’
নগর বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের পক্ষে প্রত্যাশা ব্যক্ত করে ময়মনসিংহ জেলা নাগরিক আন্দোলন ও উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি এএইচএম খালেকুজ্জামান অ্যাডভোকেট বলেন, “ময়মনসিংহ শহরে প্রতিদিন যানজট ও অব্যবস্থাপনা বাড়ছে। কার্যকর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের দাবি বহুদিনের। এখন মানুষ দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখতে চায়।”
ঐতিহ্যবাহী মুসলিম ইনস্টিটিউটের সেক্রেটারি ও শিক্ষক নেতা অধ্যাপক কামরুল হোসেন বলেন, “পরিকল্পিত নগরায়ন ছাড়া একটি বিভাগীয় শহরের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। নতুন চেয়ারম্যানের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা।”
ময়মনসিংহ মহানগর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক কাজী রানা বলেন, স্থানীয় সরকার পর্যায়ে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা নতুন চেয়ারম্যানকে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়ক হবে।
অন্যদিকে ময়মনসিংহ নাগরিক সমাজ (মনাস)-এর সদস্য সচিব ও ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট অ্যান্ড বিজনেসম্যান ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন, ময়মনসিংহ মহানগরের সভাপতি মো. শামসুদ্দোহা মাসুম বলেন, “মউক কার্যকরভাবে কাজ শুরু করতে পারলে যানজট নিরসন, জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ, খাল পুনরুদ্ধার, আধুনিক আবাসন, সবুজায়ন ও সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনায় নতুন গতি আসবে। একই সঙ্গে বিভাগীয় শহর হিসেবে ময়মনসিংহের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও বহুগুণে বাড়বে।”
উন্নয়ন বনাম বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ
তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুধু কর্তৃপক্ষ গঠনই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দক্ষ নগর পরিকল্পনা, বাস্তবভিত্তিক মাস্টারপ্ল্যান, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত উদ্যোগ। কারণ ইতোমধ্যে অপরিকল্পিত স্থাপনা, দখলদারিত্ব, অপর্যাপ্ত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং জলাধার সংকট নগর উন্নয়নের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এমন বাস্তবতায় ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে মোতাহার হোসেন তালুকদারের দায়িত্ব গ্রহণকে শুধু প্রশাসনিক নিয়োগ নয়, বরং পরিকল্পিত ও আধুনিক ময়মনসিংহ গড়ার নতুন সূচনা হিসেবেই দেখছেন।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন, ২০২৬) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চুক্তি ও বৈদেশিক নিয়োগ শাখা থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে তার নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। গ্রেড-২ মর্যাদার (অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদা) এই গুরুত্বপূর্ণ পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন তিনি। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২৬’-এর ধারা ৮(১) অনুযায়ী অন্য যেকোনো পেশা, ব্যবসা বা সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কর্মসম্পর্ক পরিত্যাগের শর্তে তাকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. গোলাম রব্বানী স্বাক্ষরিত এ আদেশ জনস্বার্থে জারি করা হয়।
চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন ‘ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করেন। এর মাধ্যমে ময়মনসিংহ নগর ও পার্শ্ববর্তী এলাকার পরিকল্পিত উন্নয়ন, ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, আবাসন ব্যবস্থাপনা, সড়ক ও যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং টেকসই নগর পরিকল্পনার জন্য একটি স্বতন্ত্র কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমের আইনি ভিত্তি তৈরি হয়।




