ঢাকা  , ;           সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeউৎসব/দিবসমহালয়া পিতৃস্মৃতি থেকে দেবীর আবাহন

মহালয়া পিতৃস্মৃতি থেকে দেবীর আবাহন

অভ্র বড়ুয়া

কিছু কিছু ভোর কেবল সূর্যোদয়ের জন্য অপেক্ষা করে না অপেক্ষা করে এক জাতির সম্মিলিত আবেগের জাগরণের জন্য। মহালয়া তেমনই এক প্রভাত যেখানে রাতের নিবিড় অন্ধকার ভেদ করে জেগে ওঠে চণ্ডীপাঠ, স্মৃতির অন্তঃসলিলা বেয়ে ফিরে আসে অতীত, আর শরতের আকাশে অদৃশ্য অক্ষরে লেখা হয় দেবীর আগমনী বার্তা। বাঙালির কাছে মহালয়া তাই নিছক পঞ্জিকার একটি দিন নয় এটি সময়, সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও উত্তরাধিকারের এক আশ্চর্য সেতুবন্ধন।

কিন্তু মহালয়ার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য কি কেবল দুর্গাপুজোর আগমনী সুরে সীমাবদ্ধ? এর গভীরে রয়েছে এমন কিছু ঐতিহ্য, যা আমাদের পরিচিত উৎসবের আড়ালে নীরবে বহন করে চলেছে ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাস, পুরাণের দর্শন এবং মানুষের চিরন্তন জীবনবোধ।

মহালয়ার গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য নিহিত রয়েছে পিতৃপক্ষের অবসানে। প্রচলিত হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই সময় প্রয়াত পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে তর্পণ, শ্রাদ্ধ ও দানের মাধ্যমে তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। সর্বপিতৃ অমাবস্যা সেই স্মরণের বিশেষ পর্ব যাঁদের প্রয়াণতিথি অজানা কিংবা যাঁদের উদ্দেশে নির্দিষ্ট দিনে শ্রাদ্ধ করা সম্ভব হয়নি, তাঁদেরও এই দিনে স্মরণ করার প্রথা রয়েছে।

এই আচারকে কেবল ধর্মীয় বিধির পরিসরে দেখলে তার মানবিক তাৎপর্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়। মানুষ একা নিজের ইতিহাস নির্মাণ করে না তার ভাষা, সংস্কার, মূল্যবোধ ও জীবনবোধের ভিত গড়ে ওঠে পূর্ববর্তী প্রজন্মের অবদানে। পিতৃস্মরণ তাই অতীতের কাছে কৃতজ্ঞতা স্বীকারের এক সাংস্কৃতিক ভাষা। মহালয়া যেন মনে করিয়ে দেয়, নতুনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আগে নিজের শিকড়কে স্মরণ করাও জরুরি।

পিতৃপক্ষের গাম্ভীর্য পেরিয়ে দেবীপক্ষের আবাহন এই প্রতীকী যাত্রায় নিহিত রয়েছে এক গভীর জীবনদর্শন। স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা অক্ষুণ্ণ রেখেই জীবনের দিকে ফিরে তাকানো, শোকের মধ্যেও আশার সন্ধান করা এবং অতীতের উত্তরাধিকার বহন করে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাওয়া মহালয়ার অন্তর্লীন সুর যেন এই কথাই বলে।

মহালয়ার ইতিহাসে এমন এক সাংস্কৃতিক অধ্যায় রয়েছে, যা বাঙালির শ্রবণস্মৃতিকে চিরকালের জন্য বদলে দিয়েছে। ১৯৩০ এর দশকে আকাশবাণী কলকাতার উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ অনুষ্ঠান সেই ইতিহাসেরই অমর নিদর্শন। বাণীকুমারের গ্রন্থনা, পঙ্কজকুমার মল্লিকের সংগীত পরিচালনা এবং বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে চণ্ডীপাঠ ও বাচনভঙ্গি মিলে তৈরি করেছিল এক অনন্য শ্রুতিনাট্যধর্মী অভিজ্ঞতা। ১৯৩১ সাল থেকে এই ঐতিহ্যের সূত্রপাত ঘটে; পরবর্তী সময়ে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ বাঙালির মহালয়া-সকালের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।

এই অনুষ্ঠানের মাহাত্ম্য কেবল তার ধর্মীয় বিষয়বস্তুতে নয়, বরং শব্দের মাধ্যমে দৃশ্য নির্মাণের অসাধারণ ক্ষমতায়। চোখের সামনে কোনও ছবি নেই, নেই মঞ্চের আলোকসজ্জা অথচ কণ্ঠের ওঠানামা, সংস্কৃত মন্ত্রের অনুরণন, সংগীতের আবহ এবং নাটকীয় বিরতির মধ্যে শ্রোতার কল্পনায় জীবন্ত হয়ে ওঠে দেবী ও অসুরের সংঘাত। বেতারের সীমিত মাধ্যম কীভাবে এক বিশাল সাংস্কৃতিক পরিসর নির্মাণ করতে পারে, ‘মহিষাসুরমর্দিনী’তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

আজ রেডিওর জায়গায় এসেছে সাউন্ডবক্স, মুঠোফোন ও ডিজিটাল মাধ্যম। তবু সেই পরিচিত কণ্ঠের সামনে প্রযুক্তির পরিবর্তন যেন তুচ্ছ হয়ে যায়। কারণ, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে বাঙালি কেবল চণ্ডীপাঠ শোনে না শোনে তার শৈশব, পারিবারিক স্মৃতি এবং প্রজন্মান্তরে বহমান এক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের পদধ্বনি।

মহিষাসুরের বিরুদ্ধে দেবী দুর্গার যুদ্ধ ভারতীয় পুরাণের বহুল পরিচিত আখ্যান। কিন্তু এই কাহিনির তাৎপর্য কেবল এক দৈত্যের বিনাশে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রতীকী ব্যঞ্জনায় রয়েছে অহংকারের বিরুদ্ধে আত্মসংযম, অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা।

দেবী দুর্গার আবির্ভাবের পৌরাণিক বর্ণনায় দেবতাদের সম্মিলিত শক্তির কথা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। একক শক্তির সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে সম্মিলিত শুভশক্তির আবির্ভাবই হয়ে ওঠে অশুভের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ভিত্তি। আধুনিক সমাজের পরিপ্রেক্ষিতেও এই প্রতীকী বার্তা প্রাসঙ্গিক। অন্যায়, বৈষম্য, নারী-নির্যাতন কিংবা বিদ্বেষের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ কেবল ব্যক্তিগত সদিচ্ছায় সম্পূর্ণ হয় না তার জন্য প্রয়োজন সামাজিক দায়িত্ববোধ,সম্মিলিত উদ্যোগ এবং নৈতিক সাহস।

দেবীর আরাধনা তখনই প্রকৃত অর্থ লাভ করে, যখন তাঁর শক্তির প্রতীক আমাদের দৈনন্দিন আচরণে প্রতিফলিত হয়। যে সমাজ নারীকে সম্মান করে না, দুর্বলকে নিরাপত্তা দিতে পারে না কিংবা অন্যায়ের সামনে নীরব থাকে, সেই সমাজের কাছে দেবীর আবাহন আত্মসমালোচনারও আহ্বান।

মহালয়ার আবেগের কোনও ভৌগোলিক সীমানা নেই। কলকাতা থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম থেকে আহমেদাবাদ বাংলাভাষী মানুষের স্মৃতি ও সংস্কৃতির পরিসরে এই দিনের আবেদন বহমান। প্রবাসে থাকা মানুষের কাছে মহালয়ার ভোর কখনও কখনও আরও গভীর অর্থ বহন করে। পরিচিত পাড়া, বাড়ির উঠোন, ভোরের চণ্ডীপাঠ কিংবা পরিবারের সঙ্গে কাটানো পুজোর দিনগুলি তখন স্মৃতির পর্দায় ফিরে আসে।

দূরদেশে বসে যখন পরিচিত আগমনী সুর শোনা যায়, তখন হাজার মাইলের দূরত্বও মুহূর্তের জন্য মুছে যায়। ভাষা ও সংস্কৃতি যে মানুষের মানসিক আশ্রয়, মহালয়া তারই এক মর্মস্পর্শী উদাহরণ। এই আবেগ কোনও একটি ভূখণ্ডের সম্পত্তি নয় এটি বাংলার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, যা সীমান্ত অতিক্রম করে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে।

মহালয়ার ভোর আমাদের সামনে তাই দুটি প্রশ্ন রেখে যায় আমরা কি কেবল উৎসবের জন্য অপেক্ষা করি, নাকি উৎসবের অন্তর্নিহিত আদর্শকেও জীবনে ধারণ করি? আমরা কি শুধু দেবীর প্রতিমায় শক্তির আরাধনা করি, নাকি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তিও নিজেদের মধ্যে জাগিয়ে তুলি?

উৎসবের জাঁকজমক, আলোকসজ্জা ও আনন্দ অবশ্যই সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু তার পাশাপাশি প্রয়োজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সমাজে সম্প্রীতি রক্ষা করা এবং মানুষের মর্যাদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। মহালয়ার প্রকৃত আহ্বান তখনই সার্থক হবে, যখন দেবীপক্ষের আলো আমাদের চিন্তা ও বিবেককেও আলোকিত করবে।

মহালয়া আসলে এক অন্তহীন প্রত্যাবর্তনের নাম অতীত থেকে বর্তমানের দিকে, স্মৃতি থেকে সম্ভাবনার দিকে, অন্ধকার থেকে আলোর দিকে। এই দিনে আমরা পূর্বপুরুষদের স্মরণ করি, ঐতিহ্যের কাছে ফিরে যাই এবং নতুন আশায় ভবিষ্যতের দরজা খুলে দিই।

শরতের আকাশে কাশফুল দোলে, শিউলি ঝরে, ভোরের বাতাসে ভেসে আসে সেই চিরপরিচিত কণ্ঠ। সময় বদলায়, প্রজন্ম বদলায়, বদলে যায় প্রযুক্তির ভাষা তবু বাঙালির হৃদয়ে মহালয়ার আবেগ অমলিন থাকে।

মা আসছেন এই উচ্চারণ তাই কেবল দেবীর আগমনী বার্তা নয় এটি শুভবোধের প্রত্যাবর্তন, মানবিকতার পুনর্জাগরণ এবং অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর চিরন্তন অঙ্গীকার।

লেখক: প্রবাস প্রতিবেদক , গুজরাট, ভারত ।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular