ভৈরব (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি : আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস—মে দিবস। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের প্রতীক হিসেবে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় দিনটি। কিন্তু কিশোরগঞ্জের ভৈরবে অনেক শ্রমিকই জানেন না এই দিবসের অর্থ বা তাৎপর্য। বছরের পর বছর কাজ করেও তারা রয়ে গেছেন অবহেলিত, বঞ্চিত হচ্ছেন ন্যায্য মজুরি ও শ্রম অধিকার থেকে।
দেশের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী হিসেবে পরিচিত ভৈরবে পুরাতন ফেরিঘাট, নৌকাঘাট, বাজার, কল-কারখানা ও বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন কয়েক হাজার শ্রমিক। তাঁদের অনেকেরই জানা নেই শ্রমিক হিসেবে তাঁদের কোনো অধিকার আছে। তাঁদের কাছে জীবন মানে—কাজ করলে ভাত, না করলে অনাহার।
ভৈরব বাজার নৌকাঘাটে প্রায় ৫০ বছর ধরে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন রমিজ উদ্দিন। মে দিবস সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি কিছুই বলতে পারেননি। তাঁর ভাষায়, “কাম করলে পেটে ভাত, না করলে মাথায় হাত—এইটাই জানি।”
মেঘনা ফেরিঘাটের কয়লা শ্রমিক আবদুর রশিদ বলেন, “মে দিবস দিয়ে কী করব? আমরা গরিব মানুষ। সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করি। দিনে ৫০০-৬০০ টাকা পাই। এই টাকায় সংসার চলে। একদিন কাজ না করলে ভাত জোটে না।” আট ঘণ্টা কর্মদিবসের বিষয়েও তাঁর কোনো ধারণা নেই। একই কথা বলেন আরেক শ্রমিক কালু মিয়া।
ভৈরবের অন্যতম বড় খাত পাদুকা শিল্পেও একই চিত্র দেখা যায়। এখানে প্রায় পাঁচ হাজার কারখানায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। তাঁদের অধিকাংশই জানেন না শ্রম অধিকার, কর্মঘণ্টা বা ন্যায্য মজুরি সম্পর্কে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করলে দৈনিক ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পান। কাজের নির্দিষ্ট সময়সীমা বা অতিরিক্ত সময়ের পারিশ্রমিকের কোনো নিশ্চয়তা নেই।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের বিধান থাকলেও বাস্তবে শ্রমিকদের অনেক সময় ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। অতিরিক্ত সময়ের জন্য কোনো বাড়তি মজুরি পান না তাঁরা।
পাদুকা শ্রমিক আলমগীর হোসেন বলেন, “মে দিবস শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের দিন—এটা জানি। কিন্তু অধিকার চাইলে কাজ থাকে না। তাই চুপ করে কাজ করি।”
ভৈরবে পাদুকা শিল্পসহ বিভিন্ন বেসরকারি খাতে লক্ষাধিক শ্রমিক কাজ করলেও তাঁদের কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা নেই। ভৈরব পাদুকা কারখানা মালিক সমিতির সভাপতি মো. আল আমিন মিয়া বলেন, শ্রমিকদের একটি ডাটাবেইজ তৈরি করা জরুরি। এতে তাদের কল্যাণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সহজ হবে।
তিনি আরও বলেন, শ্রমিকদের দুর্দিনে সরকারের সহায়তা প্রয়োজন। পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া হলে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নত হতে পারে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কেএম মামুনুর রশীদ বলেন, “মে দিবস একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও অনেক শ্রমিক এ সম্পর্কে সচেতন নন। তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে হলে আগে সঠিক তালিকা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা জরুরি।”
প্রতি বছর মে দিবসে নানা আয়োজন হলেও ভৈরবের শ্রমিকদের জীবনে তেমন পরিবর্তন আসেনি। তাদের দাবি—কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বাস্তবে যেন নিশ্চিত হয় ন্যায্য মজুরি, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ও শ্রমিক হিসেবে মর্যাদা।




