ঢাকা  বুধবার, ১লা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ১৬ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeঅর্থনীতিরাজউক : সম্প্রসারিত উত্তরা তৃতীয় পর্ব প্রকল্প

রাজউক : সম্প্রসারিত উত্তরা তৃতীয় পর্ব প্রকল্প

নিউজ ডেস্ক : উত্তরা আবাসিক শহরের তৃতীয় পর্ব সম্প্রসারণ প্রকল্প ১৯৯৯ সালে রাজউক কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছিল। ঢাকা মহানগরের জনসংখ্যা চাপ কমাতে এবং নতুন বসতি গড়ে তুলতে এই প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রাথমিক পরিকল্পনায় দুই দফায় ২০৮২ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের প্রারম্ভিক ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ২৪৪৪ কোটি টাকা, বাস্তবায়নকার্য ২০০২ সালের মধ্যে সম্পন্নের লক্ষ্য নিয়ে। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে বাজেট পুনর্মূল্যায়ন করে ব্যয় বৃদ্ধি করে ২৩৪০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয় এবং সময়সীমা বাড়িয়ে ২০০৯ সালের শেষ পর্যন্ত নেওয়া হয়। কাজ ঠিকমতো শেষ না হওয়ায় মেয়াদ আরও একবার বাড়িয়ে ২০১৪ সাল এবং পরবর্তীতে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়।

সাল ঘটনা ও অগ্রগতি
১৯৯৯ উত্তরা তৃতীয় পর্ব প্রকল্প অনুমোদন; দুই দফায় ২০৮২ একর জমি অধিগ্রহণ।
২০০৬ বাজেট আপডেট: ব্যয় বেড়ে ২৩৪০ কোটি; মেয়াদ বাড়িয়ে ২০০৯ সালের শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ।
২০১৬ পূর্বের মেয়াদ (২০১৪) শেষ না হওয়ায় মেয়াদ বাড়িয়ে ডিসে. ২০১৬ পর্যন্ত নির্ধারণ।
২০২২ ২৬ ডিসেম্বর: উত্তরা উত্তর মেট্রোরেল স্টেশন উদ্বোধন; রাজউকের হিসাব অনুযায়ী প্রকল্পের আনুমানিক ৮৩% কাজ সম্পন্ন।
২০২৫ ২৩ জানুয়ারি: জমিসংক্রান্ত ক্ষতিগ্রস্তদের মানববন্ধন; “অবৈধ বরাদ্দ” প্লট বাতিল দাবি।

জমি অধিগ্রহণ ও সেক্টর বিভাজন
মোট ৮২৯৫টি আবাসিক প্লট নির্মাণের পরিকল্পনা এর আওতায় নেওয়া হয়। প্রকল্প এলাকা চারটি সেক্টরে (১৫-১৮) বিভক্ত। এর মধ্যে সেক্টর-১৮-এ রাজউক নিজস্ব উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, বাকী তিনটি (১৫, ১৬, ১৭) সেক্টর আবাসিক প্লটের জন্য নির্ধারিত। জমি অধিগ্রহণ করা বেশিরভাগই আবাসন উপযোগী; তবে অধিগ্রহণের সূত্রে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন সমস্যাও প্রকল্পের একটি ইস্যু। ২০২৫ সালে জমিসংক্রান্ত ক্ষতিগ্রস্ত নেতারা দাবি করেন, “২০০১ সালে ৫০ হাজার টাকা জমা দিয়ে আবেদনকারী” ক্ষতিগ্রস্তরা অধিকার অনুযায়ী প্লট পাওয়া উচিত; তারা অভিযোগ করেছেন অনেক প্লট ‘অবৈধভাবে বরাদ্দ’ হয়েছে এবং এগুলো বাতিল করে তাদের মধ্যে পুনর্বিতরণ করা প্রয়োজন।

নির্মাণ অগ্রগতি ও অবকাঠামো
প্রকল্পের বাস্তবায়ন দীর্ঘমেয়াদি দেরির শিকার। ২০১৬ সালের দিকে প্রকল্পের মেয়াদ বারবার বাড়ানো হলেও কাজ তেমন এগোয়নি। ২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী রাজউক জানিয়েছে সাইট উন্নয়ন কাজ ৮৩% শেষ। কিন্তু মাঠ পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে বিভিন্ন সেক্টরে গুরুত্বপুর্ণ অবকাঠামো (রাস্তা, গ্যাস, পানি, ড্রেনেজ) এখনও অসম্পূর্ণ। বেশিরভাগ প্লটে সীমানা চিহ্নিত করা হয়নি, অনেকখানি রাস্তা নির্মাণ বাকি। তাছাড়া আবাসিক চাহিদামতো স্কুল, হাসপাতাল, বাজার, লেক সহ সামাজিক-অবকাঠামো নির্মাণও এখনো শুরু হয়নি।

আবাসন বরাদ্দ ও উপকারভোগী
প্রকল্পভুক্ত ৮২৯৫টি প্লটের প্রায় ৯৫% বরাদ্দ দেওয়া হয়ে গেছে। সেক্টর-১৫, ১৬, ১৭-এ প্লট পেয়েছেন আগ্রহী সাধারণ আবেদনকারীরা; তবে অধিকাংশ প্লট বরাদ্দ পেয়েও ২০ বছরেও পরিবেশ অনুপযোগী হওয়ায় বাসস্থানের সুযোগ পাননি। দ্বিতীয়দিকে সেক্টর-১৮-এ বাজেটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য আধুনিক ফ্ল্যাট নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। এই অংশে ‘এ, বি ও সি’ তিন ব্লকে মোট ১৫,০৩৬টি ফ্ল্যাটের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এ হিসেবে ১৭৯টি ষোলতলা ভবন নির্মাণ করার কথা ছিল। এর মধ্যে ‘এ’ ব্লক (৭৯টি ভবন) শেষ করে ৬৬৩৬টি ফ্ল্যাট প্রস্তুত হয়েছে। তবে প্লট বরাদ্দের বিপরীতে ফ্ল্যাট বরাদ্দের জন্য রাজউকের কঠোর আর্থিক শর্ত ও উচ্চ দামে নেয়ার কারণে সাধারণ নিম্ন-মধ্যবিত্তের জন্য ফ্ল্যাটগুলো বেশিরভাগই নাগালের বাইরে রয়েছে। (একটি ১৬৫৪ বর্গফুটের ফ্ল্যাটের শুরুর দাম ছিল প্রায় ৭৯ লাখ টাকা, ক্যাব পার্কিং ও ইউটিলিটি ফি যোগ করে মোট খরচ প্রায় ৯৭ লাখ টাকা তোলা হয়েছিল।)

বিতর্ক ও অভিযোগ
প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ২০১৪ সালে মাটি ভরাটে ব্যবহৃত ঠিকাদারি কাজ নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল: প্রথম ঠিকাদার মাটি ভরাটের বিল নিয়ে চলে যাওয়ার পর নতুন ঠিকাদার নিয়োগেও প্রকল্পের পরিমাপ ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ব্যবধান ধরা পড়ে। জরিপ অনুসারে প্রকৃতিতে প্রয়োজনীয় মাটির পরিমাণের চেয়ে অর্ধেকেরও কম পরিমাণ দিয়েছিল রাজউক, ফলে কাজ আটকে যায়। এছাড়া জমিসংক্রান্ত ক্ষতিগ্রস্তদের মানববন্ধনে বলা হয় অনেক প্লট “অবৈধভাবে বরাদ্দ” হয়ে গেছে, যা বাতিল করে অধিকারভোগীদের মাঝে পুনর্বণ্টন দাবি করা হচ্ছে। নিরাপত্তা সংকটের অভিযোগও রয়েছে: অপর্যাপ্ত যোগাযোগ ও নিরাপত্তার কারণে সেক্টর-১৮-এর ফ্ল্যাটগুলোর প্রায় ৭০% এখনও ফাঁকা রয়েছে এবং অপরাধীদের দখলে রয়েছে। এসব কারণে প্রকল্পের আদর্শ সময় অনুযায়ী অগ্রগতি হচ্ছে না এবং দরিদ্র-নিম্নবিত্ত উপকারভোগীদের ভাবনা অনুযায়ী বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

সাম্প্রতিক উদ্যোগ ও বর্তমান অবস্থা
সম্প্রতি ২৬ ডিসেম্বর ২০২২-এ উদ্বোধন করা উত্তরা উত্তর মেট্রোরেল স্টেশন নির্মাণের ফলে প্রকল্প এলাকায় যান চলাচলের সুযোগ বেড়েছে। রাজউকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মেট্রোরেল চালু হওয়ার পর প্রকল্পের বাকি অবকাঠামো কাজ (রাস্তা, ড্রেনেজ ইত্যাদি) দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হবে। তাছাড়া ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও প্লট-বণ্টন নিশ্চিত করতে সরকারের নজরদারি থাকছে। তবে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি সম্পর্কে কোনো ঘোষণা দেয়নি; জমিসংক্রান্ত ও বরাদ্দ সংক্রান্ত বিরোধ এখনো বহাল। সামগ্রিকভাবে, সম্প্রসারিত উত্তরা তৃতীয় পর্ব প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, বাসযোগ্য নগরায়ন ও সমাজিক সুবিধাসম্পন্ন এলাকা গড়ে তোলার লক্ষ্যে বর্তমানে এগিয়ে থাকা কাজ, মন্থর অগ্রগতি ও নানা সমাধান প্রয়োজনীয়তায় ফোকাস করা হচ্ছে।

ঢাকানিউজ২৪/মহফ

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular