ড. মোহাম্মদ আনিসুর রহমান ফরাজী
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা আজ এক অস্বস্তিকর ও বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও অধ্যক্ষদের উপর অপমান, নিপীড়ন ও সহিংস আচরণের যে ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে, তা কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা নয়—বরং একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের বহিঃপ্রকাশ।
রাজশাহীর দুর্গাপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষিকা অপদস্থ হওয়া, রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষকদের অপমান, এবং কুমিল্লা ও নরসিংদীর মতো জেলাগুলোতে অধ্যক্ষদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া লাঞ্ছনাকর ঘটনাগুলো মিলিয়ে একটি ভয়াবহ বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে—শিক্ষাঙ্গনের নেতৃত্ব আজ নিরাপত্তাহীন, সম্মানহীন এবং অনেক ক্ষেত্রে অসহায়।
বিশেষভাবে উদ্বেগজনক একটি অভিযোগ হলো—একটি কলেজের অধ্যক্ষকে ট্রেনে তুলে একটি কক্ষে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। এমন ঘটনা যদি সত্য হয়, তবে এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত নিপীড়ন নয়; এটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা, নিরাপত্তা এবং মানবিক মূল্যবোধের উপর সরাসরি আঘাত। একজন অধ্যক্ষ, যিনি একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান, যিনি শত শত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের দিকনির্দেশনা দেন—তার যদি এই পরিণতি হয়, তাহলে সাধারণ শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা কোথায়?
এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা জরুরি—সহিংসতা বা নির্যাতন কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়, এবং কোনো ব্যক্তির পরিচয়, লিঙ্গপরিচয় বা সামাজিক অবস্থানকে লক্ষ্য করে দোষারোপ করা সমস্যার সমাধান নয়। আমাদের মনোযোগ থাকা উচিত অপরাধ ও জবাবদিহির ওপর—কে, কেন এবং কীভাবে এমন কাজ করল, এবং তার বিচার কীভাবে নিশ্চিত হবে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষরা কেবল প্রশাসনিক প্রধান নন; তারা একটি প্রতিষ্ঠানের নৈতিক দিকনির্দেশক, একটি শিক্ষাব্যবস্থার মেরুদণ্ড। তাদের নেতৃত্বে একটি প্রজন্ম গড়ে ওঠে। কিন্তু যখন সেই নেতৃত্বই অপমানিত হয়, তখন পুরো ব্যবস্থাটিই ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ে। শিক্ষকদের মধ্যে ভয়, অনিশ্চয়তা এবং হতাশা তৈরি হয়। তারা তাদের দায়িত্ব পালনে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীদের ওপর—যারা শিখে ফেলে যে ক্ষমতা ও সহিংসতাই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে।
এই ধারাবাহিক ঘটনাগুলোর পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত সমস্যা কাজ করছে। প্রথমত, আইনের শাসনের দুর্বলতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি। যখন অপরাধের দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার হয় না, তখন অপরাধীরা উৎসাহিত হয়।
দ্বিতীয়ত, প্রভাবশালী মহলের অপব্যবহার। সমাজে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে ক্ষমতাবানদের জন্য আলাদা নিয়ম প্রযোজ্য—যা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।
তৃতীয়ত, প্রশাসনিক নীরবতা ও দায়িত্বহীনতা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান পদক্ষেপ না থাকলে সাধারণ মানুষ মনে করে—এই ধরনের ঘটনা ‘সহ্যযোগ্য’।
গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব ঘটনার ব্যাপক আলোচনা থাকলেও, মূলধারার সংবাদমাধ্যমে তা প্রায়ই যথাযথ গুরুত্ব পায় না। ফলে একটি জাতীয় সংকট জনপরিসরে পূর্ণাঙ্গ আলোচনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।
এখন প্রশ্ন—এই পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কী?
প্রথমত, প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। গুজব, অতিরঞ্জন বা অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না; তবে অভিযোগকে উপেক্ষাও করা যাবে না।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় বিশেষ আইনগত সুরক্ষা প্রয়োজন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ‘সেফ জোন’ হিসেবে ঘোষণা করে সেখানে সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
তৃতীয়ত, প্রশাসনিক জবাবদিহি ও নেতৃত্বের দৃঢ়তা নিশ্চিত করতে হবে। অধ্যক্ষ ও পরিচালনা কমিটিকে পেশাদার ও দায়িত্বশীল হতে হবে।
চতুর্থত, সামাজিক মূল্যবোধের পুনর্গঠন জরুরি—যেখানে শিক্ষককে সম্মান করা একটি মৌলিক নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হবে।
পঞ্চমত, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য—যাতে এসব ঘটনা আড়ালে না থেকে জাতীয় আলোচনায় আসে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষাব্যবস্থার উপর। যদি সেই ব্যবস্থার নেতৃত্বই নিরাপত্তাহীন ও অপমানিত হয়, তবে আমরা একটি অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছি। আজকের এই প্রশ্ন—“দেশ চলছে কোন পথে?”—এটি কেবল একটি অলঙ্কারিক প্রশ্ন নয়; এটি একটি বাস্তব, জরুরি এবং গভীর উদ্বেগের প্রতিফলন।
সময় এসেছে—এই প্রশ্নের জবাব খোঁজার, এবং তার চেয়েও বেশি—সঠিক পথে ফিরে আসার।
লেখক— শিক্ষক ও কলাম লেখক




