ঢাকা  বৃহস্পতিবার, ২রা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ১৭ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeখোলা কলামশিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা বেড়েই চলছে!

শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা বেড়েই চলছে!

মোঃ সাইদুর রহমান

আগে ছাত্ররা পরীক্ষায় ফেল করলে লজ্জায় ঘর থেকে বের হতো না অথবা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে চলে যেত। কারণ, তাদের ভেতর অনুশোচনা কাজ করত। বর্তমানে ফেল করে মিছিল করে অটোপাশের জন্য, শিক্ষা বোর্ডে হামলা করে!

২০২৬ সালেও এসএসসি পরীক্ষার ফল বিপর্যয়ের অভিযোগ তুলে অটোপাশের জন্য স্লোগান দিল পরীক্ষার্থীরা। আমরা শিক্ষার্থীকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যর্থ। ভবিষ্যৎ জাতি আত্মসম্মানহীন, নির্লজ্জ ও ভাষার অকথ্যতার অন্ধকারে ধাবিত হচ্ছে! রাষ্ট্র তাহলে মৌলিক অধিকার নিয়ে উদাসীনতা দেখাচ্ছে?
শিক্ষা জাতির অন্যতম মৌলিক অধিকার। শিক্ষাকে জাতির সার্বিক অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি বললে অতিরঞ্জিত হবে না। বর্তমানে শিক্ষা ব্যবস্থা মুমূর্ষু অবস্থায় আছে—এটি অনস্বীকার্য। এই অবস্থায় শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে ফিরিয়ে আনা সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষা ব্যবস্থা ভারসাম্যহীন সেতুতে ঝুলন্ত। বিপর্যয় বললে সময়ের কালক্ষেপণ হবে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদের মেয়াদ সংকুচিত হচ্ছে। অন্যদিকে, ছাত্রদল-শিবির তাদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে রক্তাক্ত রণক্ষেত্রে পরিণত করছে। ছাত্ররা বুঝে গেছে, ক্ষমতার কাছে আলাদীনের চেরাগ আছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুনাম, নিজের পরীক্ষা ও ভবিষ্যৎ—সবই তুচ্ছ। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, কলেজ ও স্কুলগুলোতেও সামান্য বিষয় থেকে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে। আচরণে তাদের মনে হয়, আটম বোমা! সবার ঊর্ধ্বে থেকে রাষ্ট্রকে শাসাতে চায়। তাদের অদম্যতা গতানুগতিক রাষ্ট্রকে পরিহাস করে।

তারা বলতে চায়, আমাদের কথায়, প্রতিবাদে, মিছিলে ও হুংকারে রাষ্ট্রের সমস্ত নীতিমালা নতজানু হবে। শিষ্টাচার, নৈতিক মূল্যবোধ, শ্রদ্ধাবোধ, গুরুজনের প্রতি সম্মান—এসবকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতে চায়। শিক্ষার্থী হিসেবে নিজের ভবিষ্যৎ, প্রতিষ্ঠানের সম্মান, শিক্ষকের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ, ছাত্র হিসেবে জাতির কাছে দায়বদ্ধতা, পিতা-মাতার বুকে লালিত স্বপ্ন—সবই যেন তাদের মেমোরি থেকে ডিলিট হয়ে গেছে। জাতির ভবিষ্যৎ আজ বিপথে ধাবিত।

এই মহাসংকট উত্তরণে সরকারকে অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। পড়ার টেবিলে আমাদের শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনার জন্য বহুমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিটি স্তরের মানুষকে। সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে, দল-মতের ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করতে হবে।

শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারণ, শিক্ষা হলো নাগরিকদের মৌলিক অধিকার। অটোপাশ, প্রশ্নফাঁস ও শিক্ষার মানের অবনতি যেমন অশনিসংকেত, তেমনি বিনা কারণে বা সামান্য অজুহাতে পরীক্ষা বন্ধের জন্য রাজপথ অবরোধ, প্রশাসন কিংবা সরকারকে আলটিমেটাম দেওয়া ক্ষমতার গন্ধ খোঁজার মতো।

প্রশাসনিক অদক্ষতা, মবের ভয়, রাজনৈতিক বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ এবং ছাত্রসংগঠনগুলোর রাজনৈতিক চর্চার অভাব আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে নৈতিকভাবে নড়বড়ে, ঝুলন্ত সেতুতে পরিণত করেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের দেশের অর্জিত ডিগ্রির মর্যাদা ও সনদের মান ক্ষুণ্ন হচ্ছে। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেশনজটের বেড়াজালে আটকা পড়বে সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

ভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে নব আবিষ্কার ও প্রযুক্তির বোমা ফোটাচ্ছে, আর এ দেশের ক্যাম্পাসে ফুটছে ককটেল ও পেট্রোলবোমা। শিক্ষাঙ্গনে অস্ত্রের ঝনঝনানি জাতিকে অন্ধকারের বার্তা দেয়। শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারলে আমরা শিকড়েই ধ্বংস হয়ে যাব। ৫ আগস্ট রাষ্ট্রীয় আয়োজনে অনুষ্ঠানে হট্টগোলের নেতিবাচক প্রভাব বহির্বিশ্বে পড়বে। এতে আমাদের দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, পড়ার টেবিলে শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনার উপায় কী? বর্তমান প্রেক্ষাপটে জাতির ভবিষ্যৎ কর্ণধারদের রক্ষায় এটি একটি জটিল প্রশ্ন। তবে বহুমুখী ও শিক্ষার্থী-বান্ধব শিক্ষানীতি প্রণয়নসহ অন্যান্য

সমস্যার দ্রুত সমাধান করলে শিক্ষাঙ্গনে সুবাতাস বইবে।
সমাধানের জন্য কিছু পদক্ষেপ অতি জরুরি ভিত্তিতে নিতে হবে—
* ঘন ঘন শিক্ষানীতি প্রণয়নের সংস্কৃতি থেকে বের হতে হবে।
* সেশনজট কমাতে হবে।
* শিক্ষানীতি হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি।
*:শিক্ষাঙ্গনের প্রশাসনিক কাঠামোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে।
*’প্রশাসনিক দুর্বলতা ও শিক্ষাঙ্গনে মব সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।
* দলীয় বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ করতে হবে।
* জোরপূর্বক শিক্ষক অপসারণ বন্ধ করতে হবে।
* শিক্ষাঙ্গনে আধিপত্য বিস্তারকে না বলতে হবে।
* ছাত্র সংসদ নির্বাচন যথাসময়ে দিতে হবে।
* শিক্ষাঙ্গনে খেলাধুলা ও সংস্কৃতিচর্চা বৃদ্ধি করতে হবে।

মোঃ সাইদুর রহমান : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular