সাদ্দাম উদ্দিন আহমদ
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ভ্রমণের সুযোগ মিলবে যথেষ্ট সাশ্রয়ী খরচে।অনন্য সংস্কৃতি এবং রাফটিং ও হাইকিংয়ের মতো রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা নিতে খুব বেশি দূরে যাওয়ার দরকার নেই। স্বতন্ত্র স্থাপত্য শিল্পকর্মের সাক্ষী হতে পৃথিবীর নানা প্রান্তের বিশ্বপরিব্রাজকরা ভীড় করেন দক্ষিণ এশিয়ার দেশে, আর বাংলাদেশি পর্যটকদের কাছে বাজেট ভ্রমণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে পছন্দের দেশ ভুটান। সার্কভুক্ত হওয়ায় কারনে বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য এই বৌদ্ধ রাজ্য ভ্রমণ বেশ সুবিধাজনক। চোখ ধাঁধানো প্রাকৃতিক নৈসর্গের মাঝে , ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর দর্শন, পর্যটকদের মনে অভূতপূর্ব অনুভূতির সঞ্চার করে।
ভুটানে মোট ২০ টা ডিস্ট্রিক্ট আছে । সব গুলাতেই রয়েছে বেশ কিছু দর্শনীয় স্থান, যার সবগুলাই অসম্ভব সুন্দর। সব দর্শনীয় স্থান ভ্রমণ করতে মোটামোটি এক মাস লেগে যাবে। যাদের প্রচুর টাকা পয়সা রয়েছে এবং হাতে আছে যথেষ্ট সময় আছে তারাই এমন অভিযানে নামতে পারে। তবে সস্তায় সল্প সময়ে ভুটান ভ্রমণ করতে চাইলে থিম্পু, পারো, ফুন্টসলিং, পুনাখা, বুমথং এবং হা ভ্যালি এই শহর গুলি ঘুরলেই মোটামোটি ভুটান ভ্রমণ হয়ে যাবে। এর জন্য প্রয়োজন হবে প্রায় ৭-৮ দিন।
ভুটান ট্যুর প্ল্যান
ভুটানে আপনে কোথায় কোথায় ঘুরবেন, কখন কোথায় থাকবেন তার একটা খসড়া ঢাকা থেকেই করে নিবেন। মোটামোটি সাত দিনে ভুটান ভ্রমণের প্ল্যান
অনেকটা এইরকম:
প্ৰথম দিন:
রাতের বাসে ঢাকা থেকে বাসে রওনা দিলে সকালে বুড়িমারী বর্ডার পৌছাবেন।
দ্বিতীয় দিন:
সকালের নাস্তা বুড়িমারী বাজারে করার পর, ভারতের ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ করে, চ্যাংড়া বান্দা থেকে ময়নামতি বাইপাস হয়ে জয়গাও ইমিগ্রেশন থেকে এক্সিট সিল লাগিয়ে ভুটান গেট চলে যেতে পারেন। ভুটান গেটে ইমিগ্রেশন শেষ করে ফুন্টশোলিং চলে যাবেন, দুপুরের খাবার ফুন্টশোলিং পৌঁছেও করে বাসে করে থিম্পু যেতে হবে। । মূলত ইমিগ্রেশনেই সময় বেশী লাগে। তাই ইমিগ্রেশন শেষ করে দুপুর বা বিকালের দিকে বাস বা ট্যাক্সিতে থিম্পু পৌঁছাতে প্রায় রাত ৮-১০টা বেজে যায়। থিম্পু পৌঁছে হোটেলে চেক ইন করে রাতের খাবার হোটেলেই খেয়ে নিন। আর যেহেতু থিম্পু পৌছাতে পৌছাতে রাত হয়ে যাবে তাই প্রথম দিন ভুটানের রাতের জীবন যাপন দেখতে পাবেন ।
আর বিমানে ভুটানে গেলে হোটেলে যাওয়ার আগেই ট্যাক্সি ভাড়া করে পারো শহরের ভিতরের কিছু জায়গা দেখে নিতে পারেন। আর কিছু জায়গা ফেরার দিন দেখার জন্য রেখে দিন । পারো শহড় কিছুটা দেখার পর নতুন কোন ট্যাক্সি বা গাড়ি ভাড়া করে থিম্পু শহরে চলে যেতে পারেন।
৩য় দিন থিম্ফু ভ্রমণ
৩য় দিন সকাল সকাল নাস্তা করে থিম্ফু শহরটা ঘুরে দেখুন। হোটেল থেকে বের হয়ে পায়ে হেঁটে কাছাকাছি জায়গা গুলো দেখেন, তাহলে কম খরচে নানা জায়গা ঘুরে দেখা যাবে। হাঁটা দূরত্বের মধ্যে থিম্পু শহরে দেখতে পারবেন- সিটি ভিউ পয়েন্ট, মেমোরিয়াল চর্টেন, ক্লক টাওয়ার, থিম্পু নদী, থিম্পু জং, লাইব্রেরি, থিম্পু ডিজং ও পার্লামেন্ট হাউস। তারপর ট্যাক্সিতে করে শহর থেকে একটু দূরের জায়গা গুলো দেখতে হবে । যেমন- ন্যাশনাল তাকিন সংরক্ষিত চিড়িয়াখানা, বুদ্ধ দর্দেনমা স্ট্যাচু, থিম্পু ন্যাশনাল মেমোরিয়াল চর্টেন। এর মধ্যে বাইরে কোথাও দুপরের খাবার খেয়ে নিন। আর তাসিং ডিজং বা থিম্পু দিজং এর পাশেই ইমিগ্রেশন অফিস। ওখানে আবেদনপত্র পূরণ করে পুনাখা শহরে ঢোকার পারমিট নিতে হবে। এর মধ্যেই আগামী দিন সকালে পুনাখা যাবার বাসের অগ্রিম টিকেট কেটে রাখতে হবে। কারন থিম্পু থেকে সারদিনে মাত্র ২ টা বাস পুনাখাতে যায়। আবার ট্যাক্সি শেয়ার করেও পুনাখা যেতে পারেন। সেই ক্ষেত্রে সময় ১ ঘণ্টা কম লাগবে।
৪ চতুর্থ দিন পুনাখা ভ্রমণ
সকাল সকাল নাস্তা করে থিম্পু থেকে পুনাখা চলে যাবেন। পুনাখায় পৌছেই গাড়ি ভাড়া করে পুরো শহরটা দেখে নিলে ভালো হবে। প্রথমেই যেতে পারেন দোচুলা পাস, ওখানে যাওয়া বেশ সময় সাপেক্ষ , দো চুলা পাস ঘুরতে ৩.৫ থেকে ৪ ঘণ্টার মতো লাগবে। দোচুলা পাস থেকে ফেরার পথে আরও কিছু স্থান দেখতে পারবেন, তার মধ্যে অন্যতম দর্শনীয় স্থান, পুনাখা জং , ন্যাশনাল লাইব্রেরি, আর্ট স্কুল, ফোক হেরিটেজ মিউজিয়াম এই জায়গা গুলো অবশ্যই দেখে আসবেন। তারপরদিন রাফটিং করার জন্য পুনাখাতে থেকে যাবেন, রাফটিং না করলে পুনাখার আসল মজা আসলে পাওয়া হবে না।
৫চতুর্থ দিন:
থিম্পু থেকে পুনাখার উদ্দেশ্যে যাত্রা। যাবার পথে দোচুলা পাস দেখা।
এই দিন সকাল সকাল বের হয়ে লাখাং মন্দির, পেলিরি মন্দির, তালো মনস্ট্রি দেখে নিন, তারপর ফু ছু নদীতে রাফটিং এর জন্য চলে যান। একটা দিন রাফটিং এ বেশী সময় দিলে ভালো লাগবে। আর রাফটিং এর সাথেই সাসপেনশন ব্রিজ দেখা হয়ে যাবে। হাতে কিছুটা সময় থাকলে ন্যাশনাল পার্ক আর টর্সা ন্যাচারাল রিজার্ভার দেখে আসতে পারেন। সন্ধ্যার মধ্যে পুনাখা থেকে থিম্পু হোটেলে ফিরে আসলে ভালো হবে ।কারণ পরের দিন আবার পারোর উদ্দ্যেশে রওনা দিতে হবে। তাই রাতে ভালো ঘুমের প্রয়োজন আছে।
৬পঞ্চম দিন :
থিম্পু থেকে পারো শহরের উদ্দেশ্যে যাত্রা। চেলে লা পাস দেখা, পারো শহরে ঘুরাঘুরি এবং টাইগার নেস্ট দেখা বা উঠা। পারোতে রাত্রি যাপন।
পুনাখা থেকে ট্যাক্সি বা গাড়ি ভাড়া করে সকাল সকাল পারো যেতে পারবেন । ভুটানের সবচেয়ে উঁচু রাস্তা চেলে লা পাসে সকালে চলে যেতে পারেন । এখান থেকে জলমহরি পর্বত দেখতে পারবেন। তারপর এক এক করে গাড়ি বা ট্যাক্সি ভাড়া করে টাইগারস নেস্ট (Tiger Nest), ন্যাশনাল মিউজিয়াম, রিনপুং জং, পারো মনস্ট্রি (Paro Taktsang), কিছু মনস্ট্রি, পারো চু সহ আরও কিছু জায়গা ঘুরে দেখবেন। পারোতে একদিন থেকে তাং সাং দেখলে ভালো হবে কারন শহর থেকে তাং সাং ৮০ কিলো দূরে। আর রাতে পারোতেই থাকা ভালো আর সন্ধ্যার মধ্যেই সকালে ফুন্টশোলিং যাবার টিকিট কেটে রাখতে হবে।
যদি বিমানে ঢাকায় ফিরতে চান, তাহলে পারো থেকে আর ফুন্টশোলিং যেতে হবে না, পারোতেই থেকে যেতে হবে। তারপর পারো বিমানবন্দর থেকে সরাসরি ব্রুক এয়ারলাইন্স এ ঢাকায় ফিরতে পারবেন। আর সেই ক্ষেত্রে পারোর বাকি জায়গা গুলো দেখে নিতে পারবেন যা আগে দেখা বাকি ছিল। তাই বিমানে ভুটান আসা যাওয়া করলে এক দিন সময় কম লাগতে পারে। সড়ক পথের যাত্রিরা আজই ট্যাক্সি ঠিক করে রাখেন।
৭ম দিন:
দিন ঢাকার উদ্বেশ্যে রওনা দিতে হবে তাই সকাল সকাল তাং সাং দেখে ট্যাক্সিতে করে ইমিগ্রেশনের উদ্বেশ্যে রওনা দেন। পারো থেকে ফুন্টশোলিং/জয়গাঁ হয়ে ভারতের চ্যাংড়াবান্ধা বর্ডারের উদ্দেশ্যে যাত্রা। সন্ধ্যার আগে বর্ডার পার হয়ে বুড়িমারী তে প্রবেশ। বুড়িমারী থেকে রাতের বাসে যাত্রা করে সকালে ঢাকায় পৌঁছানো।
জায়গাঁও ও বুড়িমারীতে ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ করে। তারপর ফুন্টশোলিং এসে ইমিগ্রেশন শেষ করে এক্সিট সিল নিয়ে নিন। বাসে যাবার ক্ষেত্রে আবার আগের মতো করেই ভুটান গেট থেকে জয়গাও – ময়নামতি বা হাসিমারা- চ্যাংড়া বান্ধা – বুড়িমারী বর্ডার হয়ে ঢাকায় ফিরতে হবে।



