নিউজ ডেস্ক: সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় ফুলজোড় নদীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে পানসি নৌকা বাইচ। উপজেলার রামকান্তপুর ঘাটে রামকান্তপুর যুব সংঘের আয়োজনে সম্প্রতি এ বাইচ অনুষ্ঠিত হয়। সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলার ১৮টি পানসি নৌকা অংশ নেয়।
বাইচকে ঘিরে নদীর দুই পাড়ে জড়ো হন হাজারো মানুষ। পানসির বৈঠার ছন্দ, সারিগান ও বাদ্যযন্ত্রের শব্দে নদীর পাড়ে তৈরি হয় উৎসবের পরিবেশ।
বাংলার প্রাচীন লোকসংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ নৌকা বাইচ। নদীমাতৃক বাংলাদেশে বর্ষাকালে নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয় পানিতে ভরে উঠলে এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। একসময় এর প্রচলন বেশি থাকলেও সময়ের সঙ্গে নৌকা বাইচের আয়োজন কমেছে। তবে এখনো বিভিন্ন এলাকার মানুষ ঐতিহ্যটি ধরে রেখেছেন।
রামকান্তপুরের বাইচে অংশ নেওয়া পানসিগুলোর মধ্যে ছিল ‘বস্তাল একতা এক্সপ্রেস’, ‘নিউ শাড়ির ভিটা এক্সপ্রেস’ ও ‘উড়ন্ত বলাকা’সহ বিভিন্ন নৌকা। এসব নৌকায় ছিলেন প্রবীণ ও নবীন বাইচাল, সংগঠক এবং বাদ্যযন্ত্রীরা।
পাবনার আমিনপুর থানার বস্তাল গ্রামের আবুল কালাম ‘বস্তাল একতা এক্সপ্রেস’-এর প্রবীণ বাইচাল। ৪৫ বছর ধরে নৌকা বাইচে বৈঠা টানছেন। তার বাবা জসির উদ্দিনও ছিলেন পানসি নৌকার বাইচাল। আবুল কালাম বলেন, শখ ও বিনোদনের জন্যই তিনি বাইচে অংশ নেন। বাইচে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। তবে প্রতিযোগিতার সময় নদীর দুই পাড়ের মানুষের উচ্ছ্বাস তাঁদের আরও উৎসাহিত করে।
একই নৌকার বাইচাল রঘু শেখ বলেন, সুজানগরে একবার বাইচে প্রথম হয়ে তারা ‘সোনার নৌকা’ পুরস্কার পেয়েছিলেন। নৌকাটি ছোট হলেও ওই অর্জনের আনন্দ ছিল অনেক বড়। সেই সাফল্য তাদের পরবর্তী সময়ে আরও উৎসাহ দিয়েছে।
উল্লাপাড়ার শ্রীবাড়ি গ্রামের প্রায় ৭০ বছর বয়সী মোতালেব হোসেন খানও দীর্ঘদিন নৌকা বাইচের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার বাবা হাজী আব্দুল মালেক খান পাকিস্তান আমলে নৌকা বাইচে অংশ নিতেন। বাবার কাছ থেকেই ছোটবেলায় বাইচের তালিম নেন । ১৯৭৪ সাল থেকে বড় বড় বাইচে অংশ নেওয়া শুরু করেন।
বর্তমানে বাইচে অংশ না নিলেও এ বছর আবার নতুন পানসি নৌকা তৈরি হয়েছে গ্রামের উদ্যোগে। শ্রীবাড়ি, হাড়িভাঙ্গা ও গোপিনাথপুর গ্রামের বাসিন্দারা মিলে প্রায় ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে নৌকাটি তৈরি করেছেন। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘একতা এক্সপ্রেস’। মোতালেব হোসেনও আবার বৈঠা হাতে পানসিতে ফিরতে চান।
মোতালেব হোসেন জানান, পাকিস্তান আমলে একটি পানসি নৌকা তৈরি করতে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ হতো। গ্রামের মানুষ চাঁদা তুলে সেই টাকা সংগ্রহ করতেন। সত্তরের দশকের শেষ দিকে উল্লাপাড়ার কৃষকগঞ্জ বাজার থেকে ৬০ ফুট দীর্ঘ পানসি নিয়ে ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীতে বাইচ দিতে গিয়েছিলেন। নৌকাটিতে ৫০ জন বাইচাল ছিলেন। তাদের দুই দিন দুই রাত বৈঠা টানতে হয়েছিল। যাত্রাপথে বাইচালদের মনোবল ধরে রাখতে সারিগান গাওয়া হতো। সঙ্গে থাকত চিড়া, গুড় ও মুড়ি। ওই বাইচে তৃতীয় স্থান অর্জন করে পুরস্কার হিসেবে একটি রেডিও পেয়েছিলেন।
নবীন বাইচাল হিরা প্রামাণিক, জহুরুল সরকার, আব্দুল করিম, নান্নু মিয়া ও শাহাদাত হোসেনসহ অন্যরাও নৌকা বাইচকে সংস্কৃতির অংশ হিসেবে ধরে রাখতে চান।
বাইচ দেখতে আসা কলেজশিক্ষার্থী সাকিব হোসেন, মামুন রেজা ও সুমন আহমেদ বলেন, ছোটবেলায় দাদা-নানার কাছে নৌকা বাইচের গল্প শুনেছি। এখন নিজেরা বাইচ দেখতে এসে ভালো লাগছে। বিকেলে ফুলজোড় নদীতে পানসির মহড়া, সারিগান এবং দুই পাড়ের মানুষের উচ্ছ্বাস মিলিয়ে অন্য রকম পরিবেশ তৈরি হয়।
আয়োজকেরা বলেন, সময়ের সঙ্গে নৌকা বাইচের আয়োজন কমে গেলেও মানুষের আগ্রহ এখনো রয়েছে। স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা ও উদ্যোগে বাংলার প্রাচীন লোকখেলাটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব।




