নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশের জ্বালানি রূপান্তর নিয়ে নতুন করে আশাবাদ ও সংশয় দুই-ই দেখা দিয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সৌরশক্তির ওপর আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও অগ্রিম কর শূন্যে নামিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের বিলের ওপর ৫ শতাংশ কর রিবেটের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎচাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণ করা এবং ২০৫০ সালের মধ্যে তা ৩০ থেকে ৫০ শতাংশে উন্নীত করা।
তবে কেবল করছাড় দিলেই বাংলাদেশের জ্বালানি রূপান্তর সফল হবে না। TBS-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি যন্ত্রপাতির প্রায় ৯০ শতাংশই স্থানীয় আমদানিকারকদের মাধ্যমে বাজারে আসে; ফলে আমদানির ধাপে কার্যকর করছাড় না এলে ভোক্তার চূড়ান্ত খরচ কমবে না। ওই বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, নীতিগত ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব প্রয়োগে বড় ধরনের অসংগতি তৈরি হয়েছে, যা নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সস্তা করার বদলে অনেক ক্ষেত্রে আরও ব্যয়বহুল করে তুলেছে।
সরকারি বাজেট ঘোষণায় সৌর প্যানেল, উইন্ড কম্পোনেন্ট ও ব্যাটারি স্টোরেজসহ সবুজ জ্বালানি অবকাঠামোতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করার কথাও বলা হয়েছে। BSS জানায়, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় জ্বালানি সক্ষমতা বাড়াতে সরকার এই লক্ষ্য নিয়েছে। বাজেটের নীতিগত অবস্থান নিয়ে বলা হয়েছে, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে বলে সরকার আশা করছে।
CPD-এর বিশ্লেষণ আরও কঠোর প্রশ্ন তুলেছে। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, এবারের বাজেট জীবাশ্ম জ্বালানি-নির্ভর অবকাঠামোকে যে কর-সুবিধা দিয়ে আসছিল, তার কিছু অংশে বিরতি এনেছে। তবে ২০৩০ সালের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে শুধু বাজেট নয়, পুরো কর-কাঠামো, গ্রিড সক্ষমতা, সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ—সবকিছুতেই সমন্বিত পরিবর্তন দরকার। CPD আরও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশ ২০০৮ সালে ২০১৫ সালের মধ্যে ৫ শতাংশ নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের লক্ষ্য নেয়, পরে ২০২০ সালের জন্য ১০ শতাংশের প্রতিশ্রুতিও পূরণ করতে পারেনি।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এবার কি বাংলাদেশ সত্যিই লক্ষ্যপূরণ করতে পারবে? উত্তরটি নির্ভর করছে নীতির ধারাবাহিকতা ও বাস্তবায়নের ওপর। একটি সাম্প্রতিক সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দেশের বর্তমান নবায়নযোগ্য উৎপাদন সক্ষমতা আরও বাড়াতে ছাদভিত্তিক সৌর কর্মসূচি, উপকূলীয় এলাকায় বায়ুসম্পদ জরিপ, বৃহৎ সৌর প্রকল্প, শক্তি সঞ্চয় রোডম্যাপ এবং গ্রিড নমনীয়তা বৃদ্ধির পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ করছাড় হচ্ছে সূচনা, কিন্তু একে এগিয়ে নিতে হলে আমদানি নীতি, ব্যাংকিং সহায়তা, স্থানীয় উৎপাদন এবং বিদ্যুৎবণ্টনব্যবস্থার গভীর সংস্কার অপরিহার্য।-
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের সবুজ জ্বালানি অভিযাত্রা এখন গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বাজেটের কর-প্রণোদনা আশাব্যঞ্জক হলেও বাজার, নীতি ও বাস্তবায়নের ফারাক কমাতে না পারলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা কাগজেই আটকে যেতে পারে। আর যদি এই ত্রিমুখী সমন্বয় সম্ভব হয়, তাহলে ২০৩০ সালের লক্ষ্য অনেক বেশি বাস্তবসম্মত হয়ে উঠতে পারে।




