ঢাকা  , ;           সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
HomeUncategorizedস্পিরুলিনার বহুমুখী গুণ ও বাংলাদেশে এর সম্ভাবনা

স্পিরুলিনার বহুমুখী গুণ ও বাংলাদেশে এর সম্ভাবনা

কুদরত-ই-মওলা

প্রকৃতির এক অপার বিস্ময় স্পিরুলিনা। এটি মূলত একটি অতি ক্ষুদ্র নীলাভ-সবুজ অণুবীক্ষণিক শৈবাল জাতীয় উদ্ভিদ, যা সাধারণত পানিতে জন্মায়। অতুলনীয় খাদ্যগুণ ও অনন্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সুবাদে এটি আজ বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে একটি অত্যন্ত পরিচিত ও জনপ্রিয় ‘সুপার ফুড’ বা খাদ্য পরিপূরক (Food Supplement) হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে।

স্পিরুলিনার পুষ্টি উপাদান:পুষ্টির দিক থেকে স্পিরুলিনা অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে আমিষ (Protein), ভিটামিন, লোহা (Iron) এবং বিভিন্ন প্রয়োজনীয় খনিজ পদার্থ। এর একটি অন্যতম বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এতে থাকা প্রাকৃতিক রঞ্জক পদার্থ, যার নাম সি-ফাইকোসায়ানিন (C-Phycocyanin)। এই রঞ্জকটি মানবদেহের জন্য সম্পূর্ণ ক্ষতিকর নয় এবং বিভিন্ন পুষ্টিকর খাবার ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধে প্রাকৃতিক রঙ হিসেবে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

রোগ প্রতিরোধ ও শক্তিবর্ধক হিসেবে ভূমিকা: গবেষকদের মতে, স্পিরুলিনা নিয়মিত সেবন করলে তা মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং শারীরিক শক্তি বৃদ্ধি করে। এটি যেসব স্বাস্থ্যগত সমস্যায় দারুণ কার্যকর, সেগুলো হলো:

• পুষ্টিহীনতা ও ক্লান্তি দূরীকরণ

• রক্তশূন্যতা ও রাতকানা রোগ প্রতিরোধ

• ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ

• আলসার, বাত (Arthritis) এবং হেপাটাইটিস নিরাময়

আর্সেনিক প্রতিরোধে অলৌকিক ক্ষমতা: বাংলাদেশের জন্য স্পিরুলিনার সবচেয়ে বড় অবদান হতে পারে আর্সেনিকোসিস নিরাময়ে। চিকিৎসকদের মতে, আর্সেনিকে আক্রান্ত রোগী যদি প্রতিদিন ৯ থেকে ১০ গ্রাম করে স্পিরুলিনা সেবন করেন, তবে মাত্র ৬ মাসের মধ্যে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন।

সতর্কতা: তবে স্পিরুলিনায় উচ্চ মাত্রায় লৌহ ও ভিটামিন থাকায় এটি সবার শরীরে সমানভাবে সহ্য নাও হতে পারে। কারো ক্ষেত্রে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এর ডোজ বা মাত্রা কমিয়ে নিতে হবে।

বাংলাদেশে স্পিরুলিনার ইতিহাস ও বিসিএসআইআর-এর ভূমিকা: বাংলাদেশে স্পিরুলিনার প্রচলন ও পরিচিতির ইতিহাস জড়িয়ে আছে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (BCSIR) বা সায়েন্স ল্যাবরেটরির সাথে। ১৯৮৯ সালে বিসিএসআইআর-এর প্রাক্তন চেয়ারম্যান ডক্টর এফ জেড মাজিদ-এর হাত ধরে দেশে প্রথম স্পিরুলিনার চাষ ও ব্যবহার শুরু হয়।

বর্তমানে বিসিএসআইআর-এর অ্যাপ্লাইড বোটানি বিভাগ স্পিরুলিনা নিয়ে নিরলস গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। এই বিভাগের অধীনে বর্তমানে ৪টি বিশেষ পুকুরে স্পিরুলিনার চাষ করা হচ্ছে। অ্যাপ্লাইড বোটানি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডক্টর মনিরুজ্জামান জানান, এই পুকুরগুলোকে সংস্কার করে পুরোপুরি আধুনিক ও কাজের উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য একটি বিশেষ সংস্কার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, যার কাজ এ বছরের শেষ নাগাদ শুরু হয়ে ধাপে ধাপে সম্পন্ন হবে।

বাণিজ্যিক উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ:গবেষণাগার থেকে স্পিরুলিনাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে বিসিএসআইআর এ পর্যন্ত ৪৩টি বেসরকারি কোম্পানিকে স্পিরুলিনা থেকে ওষুধ ও সাপ্লিমেন্ট তৈরির টেকনোলজি বা প্রযুক্তি লিজ (Lease) দিয়েছে। বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির স্পিরুলিনা ট্যাবলেট এবং পাউডার পাওয়া যায়। তবে সচেতন ক্রেতা হিসেবে কেনার আগে পণ্যটি বিসিএসআইআর অনুমোদিত বা নির্ভরযোগ্য কোনো উৎস থেকে যাচাই করে নেওয়া উচিত।

বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে স্পিরুলিনা চাষ ও এর থেকে বিভিন্ন পুষ্টিকর পণ্য তৈরি করছে এমন কিছু শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হলো:

১. লাইফলাইন ইন্টারন্যাশনাল (লাঙ্গলবন্দ, সোনারগাঁও)

২. এভারগ্রিন হারবাল অ্যান্ড নিউট্রাসিউটিক্যালস (সাভার)

৩. ওয়ান্ডার হার্বস (সোনারগাঁও)

৪. ইউরেকা ইন্টারন্যাশনাল (ধউর, উত্তরা)

৫. বক্সটার ল্যাবরেটরিজ (বগুড়া)

খাদ্য হিসেবে স্পিরুলিনার বহুমুখী ব্যবহার:শুধু ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল হিসেবেই নয়, দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় স্পিরুলিনা যুক্ত করার চমৎকার সব উপায় রয়েছে। স্পিরুলিনার পাউডার ব্যবহার করে ঘরেই তৈরি করা সম্ভব কিংবা বাজার থেকে কেনা সম্ভব বিভিন্ন পুষ্টিকর খাবার। যেমন— স্পিরুলিনা মিশ্রিত চাপাতি বা রুটি, আলুভর্তা, নুডলস, সুস্বাদু শরবত ও বিভিন্ন ফলের রস। এর ফলে সব বয়সী মানুষ সহজেই এর পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে।

বিজ্ঞানী কুদরত-ই-খুদা (কুদরত-ই-মওলা)-এর দূরদর্শী ভাবনার পথ ধরে বাংলাদেশে আজ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যে অগ্রগতি, তার একটি অন্যতম সফল উদাহরণ স্পিরুলিনা। পুষ্টিহীনতা দূরীকরণ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় এই ক্ষুদ্র শৈবালটি এক বিশাল বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছে। সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এর উৎপাদন ও ব্যবহার আরও বৃদ্ধি করা গেলে তা দেশের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে।

স্পিরুলিনার সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ:বাংলাদেশের কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে স্পিরুলিনার সম্ভাবনা অপরিসীম। এর উৎপাদন বৃদ্ধি ও বাজারজাতকরণে সরকারের সহযোগিতা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।

স্পিরুলিনা নিয়ে গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে নতুন নতুন পণ্য তৈরি করা যেতে পারে, যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম। দেশের যুব সমাজকে স্পিরুলিনার চাষ ও ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করা হলে, এটি একটি লাভজনক ব্যবসায়িক ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

সুতরাং, স্পিরুলিনা শুধু একটি খাদ্য উপাদান নয়, বরং এটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির উন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular