স্পোর্টস ডেস্ক : ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্স ও মরক্কোর মধ্যকার বহুল প্রতীক্ষিত লড়াই শুরুর আগেই রেফারি নিয়োগকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্কের জন্ম হয়েছে। ফিফা এই ম্যাচের জন্য এমন একটি রেফারি প্যানেল ঘোষণা করেছে, যেখানে অন-ফিল্ড পাঁচজন ম্যাচ কর্মকর্তার সবাই আর্জেন্টিনার। চলতি বিশ্বকাপে এই প্রথম কোনো ম্যাচে একই দেশের পাঁচজন অন-ফিল্ড কর্মকর্তা দায়িত্ব পাচ্ছেন। বিষয়টি প্রকাশের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং ফুটবলবিশ্বে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
ফিফার ঘোষণা অনুযায়ী, ম্যাচের প্রধান রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক রেফারি ফাকুন্দো টেলো। তার সঙ্গে দুই সহকারী রেফারি, চতুর্থ কর্মকর্তা এবং রিজার্ভ সহকারী—সবারই জাতীয়তা আর্জেন্টাইন। তবে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR) দল আলাদা থাকতে পারে।
আর্জেন্টিনা–মিসর ম্যাচের পর নতুন বিতর্ক
ফ্রান্স–মরক্কো ম্যাচের রেফারি ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো, যখন আর্জেন্টিনা–মিসর শেষ ষোলোর ম্যাচের রেফারিং নিয়েই ব্যাপক সমালোচনা চলছে। ওই ম্যাচে কয়েকটি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে মিসর ফুটবল কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানিয়ে তদন্তের দাবি করেছে। বিশেষ করে বাতিল হওয়া গোল, পেনাল্টির আবেদন নাকচ এবং শেষ মুহূর্তের কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
এর ঠিক পরেই ফ্রান্স–মরক্কো ম্যাচে পুরো অন-ফিল্ড রেফারি প্যানেল আর্জেন্টিনার হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। অনেক সমর্থক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও, এ ধরনের অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি। ফিফাও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অনিয়মের ইঙ্গিত দেয়নি।
কেন বিতর্ক এত তীব্র?
ফ্রান্স ও আর্জেন্টিনার সাম্প্রতিক বিশ্বকাপ ইতিহাস এই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। ২০১৮ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে কিলিয়ান এমবাপ্পের দুর্দান্ত নৈপুণ্যে ফ্রান্স ৪-৩ গোলে আর্জেন্টিনাকে বিদায় করেছিল। পরে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের ঐতিহাসিক ফাইনালে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা টাইব্রেকারে ফ্রান্সকে হারিয়ে শিরোপা জেতে। সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রেক্ষাপটে ফ্রান্সের ম্যাচে পুরো আর্জেন্টাইন রেফারি প্যানেল নিয়োগ অনেকের কাছে সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ফরাসি সংবাদমাধ্যম RMC Sport-সহ কয়েকটি ইউরোপীয় গণমাধ্যম ফিফার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, এটি অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক তৈরি করতে পারে। তবে এসব অভিযোগ মূলত সমর্থকদের প্রতিক্রিয়া; ফিফা বা কোনো স্বাধীন তদন্তে পক্ষপাতের প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি।
ফ্রান্সের কোচের প্রতিক্রিয়া
ফ্রান্সের প্রধান কোচ দিদিয়ে দেশম অবশ্য এই বিতর্ককে গুরুত্ব দিতে রাজি নন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, তার দলের প্রতিপক্ষ মরক্কো, রেফারি নয়। তিনি ম্যাচ পরিচালনায় নিয়োজিত কর্মকর্তাদের ওপর আস্থা রাখছেন এবং খেলোয়াড়দেরও রেফারি বিতর্কে মনোযোগ না দিয়ে মাঠের খেলায় মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান। ফ্রান্সের গোলরক্ষক রবিন রিসেরও একই ধরনের মন্তব্য করেছেন।
পরিসংখ্যান ও সাম্প্রতিক ফর্ম
মাঠের লড়াইয়ে কাগজে-কলমে এগিয়ে রয়েছে ফ্রান্স। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলটি টুর্নামেন্টজুড়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। কিলিয়ান এমবাপ্পের নেতৃত্বে তাদের আক্রমণভাগ যেমন কার্যকর, তেমনি রক্ষণভাগও তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল।
অন্যদিকে মরক্কো আবারও প্রমাণ করেছে যে তারা কেবল চমক দেখানোর দল নয়। ২০২২ বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে ওঠার পর এবারও শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ, দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক এবং দলগত ফুটবলের মাধ্যমে তারা কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে। তাই ম্যাচটি একপেশে হওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে ফ্রান্স–মরক্কো
চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ফ্রান্স ২-০ গোলে মরক্কোকে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছিল। সেই হারের প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ এবার মরক্কোর সামনে। অন্যদিকে ফ্রান্স চাইছে টানা আরেকটি বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল নিশ্চিত করতে।-
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, ম্যাচটি হবে কৌশল, গতি ও মানসিক দৃঢ়তার লড়াই। তবে মাঠের খেলার পাশাপাশি রেফারি নিয়োগ নিয়ে চলমান বিতর্কও ম্যাচটিকে বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত ইভেন্টে পরিণত করেছে। এখন সবার নজর—বিতর্ককে পেছনে ফেলে দুই দল মাঠে কতটা আকর্ষণীয় ফুটবল উপহার দিতে পারে।




