ঢাকা  বুধবার, ১লা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ১৬ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ          সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

spot_img
Homeআন্তর্জাতিক৯/১১ পরবর্তী বাতাসের বিষাক্ততা নিয়ে তথ্য গোপন করেছিল কর্মকর্তারা: নথি প্রকাশ

৯/১১ পরবর্তী বাতাসের বিষাক্ততা নিয়ে তথ্য গোপন করেছিল কর্মকর্তারা: নথি প্রকাশ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:  যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার ২৫তম বার্ষিকী পালনের মাত্র কয়েক দিন আগে ১ লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি পৃষ্ঠার নথি প্রকাশ করা হয়েছে।

এই নথিতে হামলার পর বিষাক্ত বায়ুমণ্ডলের মাত্রা নিয়ে তৎকালীন কর্মকর্তারা বার বার নগরবাসীকে বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য দিয়েছিলেন বলে উন্মোচিত হয়েছে।

এই তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে এই ট্র্যাজেডির পর থেকে বিগত বছরগুলোতে যেসব মানুষের স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের জীবনহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহ মাত্রা প্রকাশ্যে এল।

এটি টাওয়ার দুটি ধসে পড়ার পর লোয়ার ম্যানহাটনকে পুনরায় স্থিতিশীল ও চালু করার জন্য নগর কর্তৃপক্ষ কীভাবে পদক্ষেপ নিয়েছিল, সে সম্পর্কেও সাধারণ মানুষকে আরও স্পষ্ট ধারণা দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।

নথি অনুসারে, অভ্যন্তরীণ তথ্য-উপাত্ত এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সরকারের দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত হওয়া সত্ত্বেও গ্রাউন্ড জিরোর নিকটবর্তী বাসিন্দাদের বারবার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে- বাতাস শতভাগ নিরাপদ।

প্রকাশিত নথিতে গ্রাউন্ড জিরো থেকে সংগৃহীত বায়ুমানের প্রতিবেদনের হয়তো একটি ক্ষুদ্র অংশ রয়েছে, তবে এগুলোতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু অভ্যন্তরীণ গোপনীয় স্মারকলিপিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এগুলোর মধ্যে কিছু নথিতে কর্মকর্তাদের ২০০১-এর অক্টোবর এবং নভেম্বরে চালানো পরিবেশগত পরীক্ষার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখা যায়। সেই পরীক্ষায় নিয়মিতভাবে অ্যাসবেস্টস এবং সহজে সনাক্ত করা যায় না এমন বিপজ্জনক রাসায়নিক উপাদানসহ উচ্চমাত্রার বিষাক্ত পদার্থের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছিল।

এতে জরুরি উদ্ধারকর্মীদের স্বাস্থ্য রক্ষায় ব্যর্থতা, অ্যাসবেস্টসের তথ্য ও অন্যান্য পরীক্ষা গোপন করা এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি সংক্রান্ত বিষয়ে জনগণের কাছে কর্মকর্তাদের প্রদত্ত পরস্পরবিরোধী বিবৃতির বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।

মঙ্গলবার এই নথিগুলো প্রকাশের সময় এক সংবাদ সম্মেলনে মেয়র জোহরান মামদানি বলেন, ‘বছরের পর বছর অতিবাহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানবিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যেমন বাড়ছে, তেমনি আরও একজন নিউইয়র্কবাসী যখন অকালে আমাদের কাছ থেকে ঝরে যান, তখন আমরা সেপ্টেম্বর ১১-এর ভয়াবহ মাশুলকে নতুন করে উপলব্ধি করি।‘

৯/১১ মেমোরিয়ালের তথ্য অনুসারে, ৯/১১-এর দিনে প্রায় তিন হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। কিন্তু তারপর থেকে আরও কয়েক হাজার মানুষ- যাদের মধ্যে সেই স্থানে কাজ করা উদ্ধারকর্মীরাও রয়েছেন, যারা ক্যান্সার এবং অন্যান্য দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন।

কর্মকর্তারা মঙ্গলবার জানান, একটি অনুসন্ধানযোগ্য পোর্টালের মাধ্যমে এই নথিগুলো দেখার সুযোগ মিলবে এবং আগামী মাসগুলোতে সিটি কর্তৃপক্ষ পর্যায়ক্রমে আরও তথ্য যুক্ত করবে বলে আশা করা হচ্ছে। পোর্টালে প্রকাশিত প্রতিটি নথি বিনামূল্যে দেখা এবং ডাউনলোড করা যাবে।

নগর কর্মকর্তাদের মতে, নথিগুলো সিটির এক সরকারি কার্যালয়ে সংরক্ষিত ৬৮টি বাক্সের মধ্যে ছিল, যেগুলো গত বছর আবিষ্কৃত হয় এবং হামলার ২৫তম বার্ষিকীর ঠিক প্রাক্কালে প্রকাশ করা হচ্ছে।

বছরের পর বছর ধরে ৯/১১-এর অধিকারকর্মী, হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষ, জরুরি উদ্ধারকর্মীরা- যাদের অনেকেই হামলার পর বাতাসের বিষাক্ত উপাদানের সংস্পর্শে এসে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন- তারা আরও বেশি স্বচ্ছতার দাবি জানিয়ে এসব নথি প্রকাশের দাবি তুলেছিলেন।

অধিকার রক্ষা সংস্থা ‘৯/১১ হেলথ ওয়াচ’-এর নির্বাহী পরিচালক বেন শেভাতের মতে, এই নথিগুলো প্রকাশের মাধ্যমে তাদের করা একটি মামলার নিষ্পত্তি হলো। সংস্থাটি আরও বেশি ফেডারেল সহায়তা নিশ্চিত করতে এবং স্বাস্থ্যগত ফলাফলের ওপর অতিরিক্ত গবেষণা ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে নথিগুলো প্রকাশের দাবি জানিয়ে সিটির বিরুদ্ধে এই মামলাটি করেছিল।

মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে মেয়র মামদানিকে উদ্দেশ্য করে শেভাত বলেন, ‘মিস্টার মেয়র, ২৫ বছর পর এমন একজন মেয়র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার জন্য আমি আপনাকে ধন্যবাদ জানাতে চাই, যিনি অন্তত এই প্রশ্নের উত্তর দিতে শুরু করেছেন। গ্রাউন্ড জিরোর বিষাক্ত মেঘ থেকে তৈরি বিপদের বিষয়ে সিটি কর্তৃপক্ষ ঠিক কী জানত, এবং তারা কখন তা জেনেছিল?’

নথিগুলো প্রকাশে বছরের পর বছর দেরির কারণ কোনো তথ্য গোপন বা ধামাচাপা দেওয়ার অংশ ছিল কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে মেয়র মামদানি বলেন, ‘এটি মূলত পর পর একাধিক মেয়র প্রশাসনের ব্যর্থতা, যারা নিউইয়র্কবাসীর পাওনা এই নথিগুলো প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।’

নথিপত্রে এমন সব প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে যা দেখায়, তৎকালীন মেয়র রুডলফ জুলিয়ানি এবং সিটির অন্যান্য দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা অভ্যন্তরীণ উপাত্তের সুস্পষ্ট বিরোধিতা সত্ত্বেও বারবার বাসিন্দা এবং জরুরি উদ্ধারকর্মীদের আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, বাতাস নিরাপদ।

২০০২ সালের ফেব্রুয়ারির সংবাদ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, জুলিয়ানির পর মেয়র হওয়া মাইকেল ব্লুমবার্গ বলেছিলেন, ‘এ পর্যন্ত করা প্রতিটি পরীক্ষার ফলাফলেই দেখা গেছে বায়ুর মান গ্রহণযোগ্য সীমার মধ্যে ছিল। আমার মনে হয় কিছু মানুষ কখনোই এটি বিশ্বাস করবে না।’

মঙ্গলবার ব্লুমবার্গের এক মুখপাত্র এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

নথিতে একইভাবে জুলিয়ানির অগণিত জনসমক্ষে দেওয়া বক্তব্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে তিনি বাতাসকে নিরাপদ দাবি করে সাধারণ মানুষকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য উৎসাহিত করেছিলেন।

নথি অনুসারে, একটি উদাহরণে দেখা যায়- ২০০১ সালের ৬ অক্টোবর অ্যাসোসিয়েট হেলথ কমিশনার কেলি ম্যাককিনি একটি অভ্যন্তরীণ স্মারকপত্রে সতর্ক করে লিখেছিলেন, ‘ওই স্থানগুলোতে বায়ুর মান এখনও পুনরায় বসবাস শুরু করার উপযোগী নয়।’ অথচ ঠিক একইদিনে জুলিয়ানি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন যে বাতাস সম্পূর্ণ নিরাপদ।

পরবর্তীতে স্বাধীন বিজ্ঞানী এবং পরিবেশবাদী গোষ্ঠীগুলো জুলিয়ানির সেই দাবিগুলোকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেয়।

মঙ্গলবার (৯ সেপ্টেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তার স্টাফদের পক্ষ থেকে দেওয়া একটি পোস্টে জুলিয়ানি এই অভিযোগগুলোর তীব্র প্রতিবাদ জানান।

পোস্টে লেখা হয়, ‘ইপিএ বলেছিল বাতাস নিরাপদ। তারা ভুল করেছিল। কেউ কোনো তথ্য গোপন করেনি। অন্যদের মতোই জুলিয়ানিও ৯/১১ সংক্রান্ত ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত, কারণ মানুষকে সাহায্য করা থেকে তাকে আটকে রাখা সম্ভব হয়নি।’

নথিতে আরও বলা হয়, সরকারি কর্মকর্তারা বাতাসে অ্যাসবেস্টসের বিপজ্জনক মাত্রা সম্পর্কে তথ্য গোপন রেখে, পরিবহণ বিভাগের সদর দপ্তর ভবনে ব্যাপক সীসা দূষণের তথ্য চেপে গিয়ে এবং জরুরি উদ্ধারকর্মীদের রেসপিরেটর বা মাস্ক ব্যবহারে অনুৎসাহিত করে জনগণকে প্রতারিত ও বিভ্রান্ত করেছিলেন।

নথি অনুসারে, জুলিয়ানি এবং ইপিএ প্রশাসক ক্রিস্টি হুইটম্যানের ‘আশ্বস্তকরণ বক্তব্যে বিভ্রান্ত হয়ে’ যেসব অধিবাসী তাদের ছাইয়ে ভরা অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে গিয়েছিলেন, তাদের স্বাস্থ্যের ওপর অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছিল।

নথিতে বলা হয়, এই অধিবাসী এবং কর্মরত মানুষদের অনেকেই ‘অত্যন্ত ক্ষারীয় ও টিস্যু-ক্ষয়কারী ধূলিকণা’ নিশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করার ফলে দীর্ঘস্থায়ী নাকের রক্তক্ষরণ, ত্বকের র‌্যাশ, তীব্র মাথাব্যথা, নতুন করে হাঁপানি এবং কাশির মতো ‘গুরুতর ও দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য সমস্যায়’ আক্রান্ত হয়েছিলেন।

ট্র্যাজেডির পর নিউইয়র্কের ডেমোক্রেটিক কংগ্রেস সদস্য জেরি নাডলারসহ সরকারের কিছু দায়িত্বশীল নেতা বায়ুর গুণমান নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।

২০০২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মেয়র ব্লুমবার্গের কার্যালয়ে পাঠানো নাডলারের এক শ্বেতপত্রে বিস্তারিত তুলে ধরা হয় যে, এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন অ্যাজেন্সি (ইপিএ) ‘গ্রাউন্ড জিরোর আশেপাশের ঘরের ভেতরের বায়ুর মান পর্যবেক্ষণে অবহেলা দেখিয়েছে।’

প্রকাশিত নথিতে দেখা যায়, নাডলার মেয়র কার্যালয়কে জানিয়েছিলেন- হামলার ঠিক পরপরই ইপিএ প্রধান হুইটম্যান পরিবেশ সম্পূর্ণ ‘শ্বাস নেওয়ার উপযোগী ও নিরাপদ’ ঘোষণা করে জনগণকে বিভ্রান্ত করেছিলেন, অথচ ঘরের ভেতরের বায়ুর মান সম্পর্কিত কোনো সরকারি পরীক্ষা সম্পন্ন করার আগেই তিনি ওই বক্তব্য দিয়েছিলেন।

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, ডেভিসের বিজ্ঞানীদের এক গবেষণা তথ্যের কথা উল্লেখ করে তিনি মেয়র কার্যালয়কে আরও লেখেন যে, বাতাসে অত্যন্ত সূক্ষ্ম কণার ‘আতঙ্কজনক ঘনত্ব’ পাওয়া গেছে, যা সরাসরি ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করে চিরতরে আটকে যেতে পারে।

মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে ক্রিস্টি হুইটম্যান দাবি করেন, গ্রাউন্ড জিরো এলাকার বায়ুর মান নিয়ে তার দেওয়া সেদিনের বক্তব্যগুলো ‘সম্পূর্ণরূপে ইপিএ বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছিল।’

বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, ‘হামলার কয়েক দিনের মধ্যেই ইপিএ তাদের হাতে থাকা সমস্ত ডেটা নিয়ে একটি ওয়েবসাইট চালু করেছিল এবং তা নিয়মিত আপডেট করা হতো যাতে সবকিছু সর্বসাধারণের কাছে উন্মুক্ত থাকে। আমাদের মূল লক্ষ্যই ছিল যতটা সম্ভব স্বচ্ছতা বজায় রাখা। তখন আমাদের কাছে উপলব্ধ তথ্য, সরঞ্জাম এবং জ্ঞানের ভিত্তিতে ইপিএর প্রতিটি কর্মী তাদের সাধ্যমতো সেরা কাজটুকু করার চেষ্টা করেছিলেন।’

হুইটম্যান বলেন, ইপিএ কর্মকর্তারা বারবার গ্রাউন্ড জিরোর মূল দুর্ঘটনাস্থলের চরম পরিস্থিতি এবং নিউইয়র্ক সিটির অন্যান্য এলাকার বায়ুরমানের মধ্যকার পার্থক্য স্পষ্ট করেছিলেন এবং সেখানে কাজ করা উদ্ধারকর্মীদের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছিলেন।

তিনি আরও যোগ করেন, ইপিএ সেই দুর্ঘটনাস্থল নিয়ন্ত্রণ করত না- যা নিউইয়র্ক সিটির তত্ত্বাবধানে ছিল। ঘরের ভেতরের বায়ুর মান নিয়ন্ত্রণের কোনো আইনি এখতিয়ারও ইপিএর ছিল না।

সেই সময়ে সবচেয়ে কঠোর ও সুনির্দিষ্ট কিছু স্মারকলিপি এসেছিল ইপিএর রসায়নবিদ কেট জেনকিন্সের কাছ থেকে। পরবর্তীতে তিনি এক হুইসেলব্লোয়ার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে দাবি করেন যে, সংস্থাটি বায়ুর নিরাপত্তা নিয়ে মিথ্যা কথা বলেছিল এবং বিষাক্ত ধূলিকণার ভয়াবহতাকে খাটো করে দেখিয়েছিল। প্রকাশ্যে মুখ খোলার কারণে ইপিএ তাকে বরখাস্ত করলেও পরবর্তীতে পুনরায় তাকে চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়।

২০০১ সালের ৩ ডিসেম্বর সিটির বর্জ্য সনাক্তকরণ শাখার কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো তার এক স্মারকলিপিতে জেনকিন্স সিটির অপরিকল্পিত ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিষ্কার কার্যক্রম, গবেষণার অকার্যকর ও ভিত্তিহীন পরীক্ষা পদ্ধতি এবং বৈজ্ঞানিক প্রমাণের সম্পূর্ণ বিপরীত জনপ্রতিনিধিদের বিভ্রান্তিকর দাবির নানা অসংগতি তুলে ধরেন।

৯/১১ মেমোরিয়ালের তথ্য অনুসারে, এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডির শারীরিক ও মানসিক ক্ষত আজও দেশজুড়ে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। শহরের আকাশ-বাতাস ঢেকে ফেলা সেই বিষাক্ত ধূলিকণার সংস্পর্শে আসার ফলেই মূলত হাজার হাজার মানুষের শরীরে এসব মরণব্যাধি বাসা বেঁধেছে।

৯/১১ মেমোরিয়াল জানায়, আমেরিকার ৫০টি অঙ্গরাজ্য থেকে অন্তত ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষ বর্তমানে ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার হেলথ প্রোগ্রাম’-এ নিবন্ধিত রয়েছেন এবং এর মধ্যে ৪৯ হাজার মানুষের শরীরে ৯/১১ সংক্রান্ত ক্যানসার শনাক্ত হয়েছে।

মঙ্গলবার মেয়র মামদানি জানান, বর্তমানে যারা এই চিকিৎসাসেবার আওতায় রয়েছেন, প্রকৃতপক্ষে সহায়তা পাওয়ার যোগ্য মানুষের সংখ্যা তার চেয়েও অনেক বেশি। এদের মধ্যে দুর্ঘটনাস্থলের কাছাকাছি বসবাসকারী অনেক অধিবাসী রয়েছেন যাদের কাছে সরকারের কোনো তথ্য বা সহায়তা পৌঁছায়নি, পাশাপাশি নিউইয়র্কের বাইরে বসবাসকারী ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দারাও রয়েছেন।

২০১১ সালে মার্কিন কংগ্রেস যখন এই স্বাস্থ্য কর্মসূচিটি চালু করে, তখন এর অধীনে ক্যানসারের চিকিৎসা অন্তর্ভুক্ত ছিল না। পরবর্তীতে অধিকারকর্মীদের জোরালো আন্দোলন এবং গ্রাউন্ড জিরোতে উদ্ধারকাজে নিয়োজিত নিউইয়র্কের অগ্নিনির্বাপককর্মীদের মধ্যে ক্যানসারের উচ্চ হারের ওপর একটি গবেষণাপত্র প্রকাশের পর ২০১২ সালে এই কর্মসূচিতে ক্যানসার চিকিৎসাকে যুক্ত করা হয়।

নথিতে বলা হয়, গ্রাউন্ড জিরো সীমানার মধ্যে অবস্থিত চায়না টাউনের অধিবাসীরা এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডি মোকাবিলায় সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিলেন। তারা জানিয়েছিলেন যে, তাদের অ্যাপার্টমেন্টগুলো বিষাক্ত ধূলিকণায় ভরে গিয়েছিল, যা পরবর্তীতে তাদের শরীরে নানা জটিল ব্যাধি এবং মারাত্মক শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যার সৃষ্টি করে।

নথিতে ইপিএর চরম ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করে বলা হয়, তারা এশীয় ভাষায় পারদর্শী কোনো প্রচারকর্মী নিয়োগ করেনি। ফলে বিষাক্ত ধুলায় শ্বাসকষ্টে ভুগতে থাকা চায়না টাউনের বহু অধিবাসী এই সংস্থা কিংবা তাদের ঘরের ভেতরের ধূলিকণা পরিষ্কারের বিশেষ কর্মসূচি সম্পর্কে কিছুই জানতে পারেননি।

নথিতে উদ্ধৃত একটি গবেষণা অনুযায়ী, চায়না টাউনে চিকিৎসাধীন চীনা-আমেরিকান শিশুদের মধ্যে অ্যাজমা বা হাঁপানির তীব্রতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে দেখা গিয়েছিল।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পুরো এলাকাটি পুনর্গঠনের জন্য বৈষম্যমূলকভাবে অত্যন্ত অপ্রতুল ফেডারেল অনুদান দেওয়া হয়েছিল। কারণ নির্ধারিত আর্থিক সহায়তা এলাকার গণ্ডির বাইরে পড়ার অজুহাতে শহরের এবং রাজ্য সরকারের অনুদান কর্মসূচি থেকে চায়না টাউনের অনেক ক্ষতিগ্রস্ত অধিবাসীকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত রাখা হয়েছিল।

সংবাদ সম্মেলনে মেয়র মামদানি বলেন, ‘মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল কারণ তারা যাদের বিশ্বাস করেছিলেন, সেই নেতারা মিথ্যা বলেছিলেন এবং বিষাক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে উৎসাহিত করেছিলেন।’

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) এক সংবাদ সম্মেলনে এসব নথির বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিউইয়র্কের অগ্নিনির্বাপককর্মীদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান প্রধান ইউনিয়নসমূহ।

ইউনিফর্মড ফায়ারফাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বব ইউস্টেস সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘আমরা যদি এই তথ্যগুলো আরও আগে পেতাম, তবে আলাদা কী করতে পারতাম? আমাদের সদস্যদের ব্যাধিগুলো কি আরও আগে শনাক্ত করা যেত? তাদের চিকিৎসা কি সময়মতো শুরু হতে পারত? আমাদের পরিবারগুলোকে কি স্বাস্থ্যসেবা, ক্ষতিপূরণ এবং স্বীকৃতির জন্য বছরের পর বছর ধরে করা এই লড়াই থেকে রেহাই দেওয়া যেত না?’

ইউনিফর্মড ফায়ার অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জিম ব্রোসি বলেন, এ পর্যন্ত প্রকাশিত নথিগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে- সিটির তৎকালীন কর্তারা ফায়ারফাইটার, অন্যান্য জরুরি উদ্ধারকর্মী এবং এলাকায় বসবাসকারী ও কর্মরত সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য ও সুরক্ষার চেয়ে লোয়ার ম্যানহাটনের অর্থনৈতিক পুনরুত্থানকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছিলেন।

ব্রোসি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি চাই বিশ্ববাসী জানুক যে, কেউ একজন অত্যন্ত সচেতনভাবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তারা শুধু আমাদের কাছে তথ্য গোপন করার সিদ্ধান্তই নেননি, বরং নিজেদের পরিবারের সদস্যদের এই বিষাক্ত পরিবেশ থেকে দূরে রেখেছিলেন। অর্থনীতির চাকা সচল রাখার দোহাই দিয়ে তারা নিশ্চিতভাবেই এই অন্যায় পথটি বেছে নিয়েছিলেন।‘

সংবাদ সম্মেলনে সিটির প্রতিনিধিত্বকারী কর্পোরেশন কাউন্সিল স্টিভ ব্যাংকসকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল- প্রকাশিত এসব নথির কারণে সিটির বিরুদ্ধে নতুন করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পথ সুগম হতে পারে বলে বর্তমান নগর নেতৃত্ব উদ্বিগ্ন কি না?

উত্তরে ব্যাংকস বলেন, ‘আপনি যদি সিটি হলে বসে কেউ মামলা করবে এই ভয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হন, তবে যে পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি, সেগুলো আপনি কখনই নিতে পারবেন না।’

ব্যাংকস জানান, আদালতের সমঝোতা চুক্তির প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আগামী মাসগুলোতে সিটির পক্ষ থেকে নিয়মিত তথ্য হালনাগাদ করা হবে।

মঙ্গলবার প্রকাশিত নথির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথিগুলোর একটি ছিল তথাকথিত ‘হার্ডিং মেমো’, যা তৎকালীন ডেপুটি মেয়র রবার্ট হার্ডিংয়ের কাছে পাঠানো হয়েছিল।

আইন বিভাগের এক অনুমানের ভিত্তিতে তৈরি ওই মেমোতে বলা হয়েছিল, সেপ্টেম্বর ১১-এর হামলার কারণে প্রায় ৩৫ হাজার সম্ভাব্য বাদী তৈরি হতে পারে- যাদের মধ্যে অন্তত ১০ হাজার মানুষ ক্ষতিপূরণের দাবি জানাতে পারেন।

মেমোটিতে সিটির আইনি দায়বদ্ধতা ও আর্থিক ঝুঁকি সীমিত করার বিভিন্ন আইনি কৌশলের রূপরেখা দেওয়া হয়েছিল।

মেমোতে উল্লেখ করা হয়, ‘প্রধান উদ্বেগের বিষয় হলো, এই মামলাগুলো আদালতে গড়ালে বিচারক ও জুরিরা বাদীদের প্রতি অনুকম্পাশীল হতে পারেন (যদিও সিটির শক্তিশালী প্রতিরক্ষার যুক্তি রয়েছে) এবং ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের বিপুল পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারেন।’

এদিকে মেয়র মামদানি জানান, ৯/১১ হেলথ ওয়াচ-এর করা দুটি মামলারই সুরাহা হয়েছে নতুন এই ডিজিটাল পোর্টাল চালুর মাধ্যমে। এর ফলে ‘বছরের পর বছর ধরে চলা আইনি লড়াই এবং বায়ুর মান ও স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কিত তথ্যে নিউইয়র্কবাসীর প্রবেশাধিকারের ওপর থাকা বিধিনিষেধের অবসান ঘটল।’

ব্যাংকস জানান, পোর্টালে নথির এই প্রথম দফায় প্রকাশ কেবল শুরু মাত্র। আগামী এক বছর ধরে পর্যায়ক্রমে আরও নথি প্রকাশ করা হবে।

তিনি জানান, যত বেশি নথি উন্মুক্ত হবে, সিটির পক্ষ থেকে জনগণকে সে সম্পর্কিত সর্বশেষ তথ্য জানানো অব্যাহত থাকবে।

মামদানি বলেন, এই নথিগুলো প্রকাশ করার অর্থ হলো সঠিক কাজটি করা।

তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, নিউইয়র্কবাসীদের ক্ষতিপূরণ তহবিলের যোগ্যতা প্রমাণ করা সহজ করার পাশাপাশি এটিও গুরুত্বপূর্ণ যে, যেসব মানুষ বছরের পর বছর ধরে এত বাধার সম্মুখীন হয়েছেন, নিউইয়র্ক সিটি যেন শেষ পর্যন্ত তাদের বলে, ‘আপনারাই সঠিক ছিলেন। আন্দোলন করা আপনাদের সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। দাবি তোলা আপনাদের অধিকার ছিল এবং সিটি কর্তৃপক্ষ অবশেষে সেই সত্যকে স্বীকার করে নিচ্ছ।‘

সূত্র- সিএনএন

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular