• ঢাকা
  • সোমবার, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ; ১৬ মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
  • সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

Advertise your products here

banner image

রাশিয়ার ইউক্রেন অভিযানে যে ম্যাসেজ পেল ছোট দেশগুলি


ঢাকানিউজ২৪.কম ; প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১০ মার্চ, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ০৮:১১ এএম
rus
রাশিয়া ইউক্রেন পতাকা ফাইলছবি

সুমন দত্ত

  ছোট বেলা মামাদের মুখে একটা স্লোগান শুনতাম। সেটা ছিল সুবাধিবাদী কমিউনিস্টদের নিয়ে। লড়াই লড়াই লড়াই চাই। লড়াই লাগলে আমরা নাই। ন্যাটো ও ইউক্রেনের মধ্যে এই ঘটনা ঘটে গেল। আজ ইউক্রেন একা রাশিয়ার সঙ্গে লড়াই করছে। কেউ তাকে দিচ্ছে না কোনো সহায়তা। অথচ এতদিন আমেরিকা ও পশ্চিমা দেশগুলো ইউক্রেনকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নানা উসকানি দিয়েছে। এখন তারা সবাই ইউক্রেনকে যুদ্ধের ময়দানে রেখে দূর থেকে পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় রয়েছে। মাঝে মধ্যে মিডিয়ায় উসকানি দিচ্ছে ইউক্রেনকে অস্ত্র সহায়তা দেওয়া হবে। 

ইউক্রেন আমেরিকা ও ন্যাটোর কাছে চায় সামরিক সহায়তা। আর ন্যাটো আমেরিকা বলে নিষেধাজ্ঞা। ন্যাটো ও ইউক্রেনের মধ্যে চাওয়ায় কোনো মিল নেই। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি ন্যাটো ও আমেরিকার ভণ্ডামি বুঝতে পারেনি। তিনি বুঝতে পারেন নাই ন্যাটো ইউরোপের কোনো সংগঠন নয়। এটা আমেরিকার একটা দাস সংগঠন। আমেরিকার কথায় ন্যাটো উঠে বসে। জার্মানি ও ফ্রান্স এর মতো দেশগুলো ন্যাটোতে কাগজে কলমে শক্তিশালী।

 ন্যাটোকে চালানোর মতো ক্ষমতা এসব দেশের নাই। ব্রিটেন ও আমেরিকা  ন্যাটোকে নিয়ে খেলে। আর এই দুই দেশ জন্মলগ্ন থেকেই রাশিয়া বিরোধী। ব্রিটেন ও আমেরিকা অর্থনৈতিক ও সমারিক উভয়তেই রুশ বিরোধী কৌশল নিয়ে বিশ্বে পলিসি তৈরি করে। যেমন ইরান, উত্তর কোরিয়া, মিয়ানমার, সিরিয়া এসব দেশের সঙ্গে পশ্চিমাদের কোনো  সুসম্পর্ক নাই। অথচ এসব দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে রাশিয়ার।   

 রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পরিকল্পনা একদিনের নয়। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবার সময় থেকে ইউক্রেনের ওপর ছিল রাশিয়ার পুঞ্জিভূত চাপা ক্ষোভ। যার বিস্ফোরণ হয়েছে আজ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউক্রেন ছিল একটি অনুন্নত অঞ্চল। রাশিয়ার রাজা জারের পতনের পর বলশেভিকরা ভ্লাদিমির লেনিনের নেতৃত্ব সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠন করলে ইউক্রেনের চেহারা বদলে যায়। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে স্টালিনের সময়তেও ইউক্রেনের উন্নতি হতে থাকে। 

সোভিয়েত ইউনিয়নের পুরো উন্নয়নটা হয়েছিল ইউক্রেনে। আজ ইউক্রেনের যেসব নাম করা প্রতিষ্ঠান সবই লেনিনের সময়ে তৈরি। যে কারণে বহু রুশ বলা মানুষ ইউক্রেনে তাদের বসতি গড়ে তুলে। তেমনি ইউক্রেনের বহু মানুষ মস্কোতে থাকে। 

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেলে রাশিয়া ভেবেছিল ইউক্রেন তাদের সঙ্গে থাকবে। সেটা হলো না। তারপরও ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার সৎভাব ছিল। কারণ ইউক্রেন শাসনের কেন্দ্র বিন্দুতে রাশিয়ানরাই ছিল। রাশিয়ান বিরোধী কোনও পরিকল্পনায় অংশ নিতো না ইউক্রেন। 

২০১০-১২ সালের পর থেকে ইউক্রেনের মধ্যে নতুন ধরনের এক উন্মাদনা তৈরি হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঢোকার ভূত চাপে তাদের মাথায়। কারণ প্রতিবেশী পোল্যান্ড, রুমানিয়া, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি, লাটভিয়া, এস্তোনিয়া, বুলগেরিয়া, লিথুনিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নে ঢুকে ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটায়। ইউরোপীয় ইউনিয়নে ঢুকলে আবার ন্যাটোর সদস্য পদ পেতে ওয়ান টু ব্যাপার। দেখা গেছে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলি যারাই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ পেয়েছে তারাই আবার ন্যাটোর সদস্য হয়েছে। ইউক্রেনের রাজনীতির মধ্যেও সেটা চলছিল। 

প্রথমদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ইউক্রেন যোগদান করবে কিনা সে বিষয়ে তেমন আপত্তি প্রকাশ করেনি রাশিয়া। কিন্তু ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার চিন্তাভাবনা  কোনো ভাবেই মেনে নিতে পারছিল না রাশিয়া। কারণ ইউক্রেনের সঙ্গে বিশাল সীমান্ত রাশিয়ার। 

এর আগে পোল্যাণ্ড ও চেক রিপাবলিকে মার্কিন ক্ষেপনাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বসানো নিয়ে ওই দুই দেশের সঙ্গে শীতল সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল রাশিয়ার। অবশেষে ওই দুই দেশ এসব পরিকল্পনা থেকে সরে আসে।     

এদিকে ইউক্রেনের রাজনীতিবিদরা ভোটের জন্য জাতিগত বিভেদ তৈরি করে। ইউক্রেনের ভাষার সঙ্গে রুশ ভাষার বিভেদ। ইউক্রেন ও রাশিয়ার ভাষাগত পার্থক্য অনেকটা বাংলাদেশে ঢাকাইয়া নোয়াখাইল্লা ভাষার মত। এই ভাষাগত বিভেদ কাজে লাগিয়ে জনগণের ভোট জিতে একবার রুশ পন্থি সরকার আরেকবার ইউক্রেন পন্থি। একটা সময় এই ইউক্রেন পন্থি রাজনীতিবিদরা হয়ে যান মার্কিন ও ন্যাটো পন্থি। যার নেতৃত্বে রয়েছেন বর্তমান ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কি। ইউক্রেন পন্থি রাজনীতিবিদদের এই ভোল পাল্টানো আচরণই আজ রাশিয়ার ইউক্রেন অভিযান। কারণ রাশিয়া নিজের ঘরের দুয়ারে শত্রুদের ঘাটি গড়তে দিতে রাজী নয়। রাশিয়ার নিরাপত্তা এতে হুমকির মুখে পড়বে। 

বিশ্বের বড় দেশগুলো সব সময় নিজেদের নিরাপত্তাকে সবার আগে অগ্রাধিকার দেয়। যেমন কিছুদিন আগে বাংলাদেশ যাতে কোয়াডে যোগদান না করে সেজন্য চীন আগ বাড়িয়ে বাংলাদেশকে সতর্ক করেছিল। যোগদান করলে চীনের কোপে পড়বে বাংলাদেশ। কারণ কোয়াড হচ্ছে ভারত, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, জাপানকে নিয়ে গঠিত একটি সামরিক জোট। যা চীনকে কাউন্টার দিতে তৈরি। চীন তার নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই বাংলাদেশকে সতর্ক করেছে। 

 যেকোনো বড় দেশ তার নিরাপত্তাকে সবার আগে অগ্রাধিকার দেয়। ছোট দেশগুলোকে এ বিষয়টি মাথায় রেখে চলতে হয়। কাল যদি নেপাল চীনের সঙ্গে সামরিক জোট করে পরের দিন নেপাল দখল করে নিবে ভারত কিংবা নেপালের শাসক বদল হয়ে যাবে। 

তেমনি বাংলাদেশ যদি প্রকৃত ভারত বিরোধী কিছু করতে যায় ভারত কয়েক ঘণ্টায় বাংলাদেশ দখল করে নিবে। অথবা বাংলাদেশে যে সরকার থাকবে তার পরিবর্তন হয়ে যাবে। বড় শক্তিশালী দেশগুলো এমন আচরণই করবে ছোট দেশগুলির সঙ্গে। এতে বিচার আচার করতে আসবে না জাতিসংঘ। তারা কিছু কিতাবি কথা আউরাবে এই যা। কয়েকটা দেশ নিষেধাজ্ঞা দিবে। তাই ছোট দেগুলোকে বুঝে শুনেই চলতে হয়। 

ইউক্রেন আক্রমণে রাশিয়ার অন্যতম অজুহাত দেশটির ডনবাস অঞ্চলের ডনেস্ক ও নুনেস্ক রাশিয়ানদের নির্বিচারে গণহত্যা ও নির্যাতন। দীর্ঘদিন থেকে সেখানে এসব চলছিল। কিয়েভের শাসক গোষ্ঠী এসব দেখেও না দেখার ভান করছিল। আজ ওই অঞ্চল দুটি স্বাধীন। 

পাকিস্তান ও বাংলাদেশে আমরা দেখি সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার। দীর্ঘ দিন ধরেই এই অত্যাচার চলছে। আর এটা নিয়ে রাজনীতি হচ্ছে প্রতিবেশী ভারতে। কে বলতে পারে ভারত কোনো দিন একে পুঁজি করে পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশে আক্রমণ করে বসবে না। বর্তমান ভারত শাসন করছে অখন্ড ভারতের স্বপ্ন দেখা শক্তি। আগে যারা ভারতে ক্ষমতায় ছিল, তারা ভারতের ভূগোল বদলানোর স্বপ্ন দেখতো না। এখন যারা ক্ষমতায়, তারা কিন্তু দেখে। যেমন বহু বাংলাদেশি ও ভারতীয় বাঙালি অখন্ড বাংলার স্বপ্ন দেখে। দুই বিপরীত স্বপ্ন যুদ্ধে রুপ না নিলেই ভালো। যেমন ইউক্রেনে একাংশ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোতে ভর্তি হবার স্বপ্ন, আরেক অংশ উন্নত রাশিয়ার সঙ্গে থাকার স্বপ্ন দেখে।  

পাকিস্তানে বেলুচিস্তানের অবস্থা ইউক্রেনের ওই ডনেস্ক ও লুনেস্ক এর মতো। বাংলাদেশে তেমনটা এখনো পৌঁছায়নি। তবে এদেশে জঙ্গিরা ওয়াজ মহফিলে যেসব বয়ান দিচ্ছে তাতে মনে হয় এখানেও এমনটা হতে পারে। এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী, চরমোনাই পীরেরা এখনই সরকার ফেলে দিয়ে ইসলামি সরকার তৈরির জিকির শুরু করেছে। সেই ইসলামি সরকার গজবাই হিন্দ বাস্তবায়ন করবে।( মানে ভারত আক্রমণ করে জয় করার স্বপ্ন)  তারা ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে শুরু করেছে বাংলাদেশে কোনো হিন্দুদের জায়গা হবে না। হিন্দুদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা যাবে না। হিন্দু নারীদের শাখা সিঁদুর পরতে দেওয়া হবে না। হিন্দু পুরুষদের ধূতি পরতে দেওয়া হবে না। এসব হুঙ্কার দিচ্ছে। সত্যি সত্যি যেদিন এসব হুংকার বাস্তবায়ন হবে তখন এদেশের অস্তিত্ব টিকবে তো?

বড়দের কাছে শুনেছি ১৯৭১ সালের পূর্বে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যতবার যুদ্ধ লেগেছে ততবার  ঢাকা শহরে হিন্দুদের নির্বিচারে হত্যা করত বিহারি মুসলিমরা। আজ সেই বিহারিদের জায়গা হয়েছে জেনেভা ক্যাম্পে। এদেশে ভারতের একটা সেনা অভিযান বিহারিদের জায়গা পরিবর্তন করে দেয়। তেমনি আজ সেই বিহারিদের প্রেতাত্মা ভর করেছে চরমোনাই পীর ও আব্বাসীদের ঘাড়ে। 

এদেশের সরকার যখন এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হবে তখন আরেকটা অভিযান এদেশে হতে পারে। তখন হয়ত এদেশের মানচিত্র বদলে যেতে পারে। তাই সাধু সাবধান। ইউক্রেন থেকে আমরা যেন এই শিক্ষাটা পাই।   

লেখক: সাংবাদিক, তারিখ ১০-৩-২০২২ সময় সকাল ৮ টা ৩০

ঢাকানিউজ২৪.কম / এসডি

খোলা-কলাম বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

banner image
banner image