• ঢাকা
  • শনিবার, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ; ০৪ ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ
  • সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

Advertise your products here

banner image

সূর্য দীঘল বাড়ি


ঢাকানিউজ২৪.কম ; প্রকাশিত: শনিবার, ২০ নভেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১১:৫১ এএম
সব মানুষ এখনও মানুষ হয়ে উঠেনি
একটি দূর্লভ দৃশ্য

রায়হান হাবিব দুলাল: পড়াশোনা শেষে করে চাকরি বাকরি খুঁজতেছিলাম হন্য হয়ে। প্রতিদিন এক পত্রিকা থেকে অন্য পত্রিকায় চাকরির খোঁজ খবর নেওয়া আর কিছু ছাত্র-ছাত্রী পড়ানো ছাড়া তেমন কোন কাজ থাকত না। কিন্তু মাঝখানে বাধ সাধল করোনা। মহামারী সমস্ত কিছু ওলট-পালট করে দেয়। ভীষণ এক অস্থির সময় পার হচ্ছিল। এক রকম বাধ্যগত ভাবেই শহর ছেড়ে গ্রামে যেতে হয়েছিল। গ্রামে অবসর সময় কাটছিল না। তাই ভেবেছিলাম করোনাকালীন এ সময়টাতে বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় ও বিখ্যাত উপন্যাস, ছোটগল্পট পড়ে ফেলব। যেই ভাবা সেই কাজ। এ সময়টাতে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ টার মত বই পড়া হল। বাংলা সাহিত্যের মধ্যে যে কত কিছুর সন্ধান পাওয়া যায় তা আর বলে শেষ করা যায় না।.

বাংলা সাহিত্যের যে সকল উপন্যাস এবং ছোটগল্প পড়েছি তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল আবু ইসহাকের ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ একটি অসাধারন কালজয়ী উপন্যাস। পড়াশেষে উপন্যাস  অবলম্বনে নির্মিত মুভিটাও দেখে ফেললাম। নির্মিত এ কালজয়ী মুভিটি আন্তর্জাতিকভাবে নয়টি পুরস্কার লাভ করে। এপার ওপার দুই বাংলাতেই এ মুভিটি নির্মাণ করা হয়েছে। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র জয়গুন। জয়গুন ও তার সন্তানদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম এ উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু। জয়গুণ শহরে ভাতের লড়াইয়ে টিকতে পারে না। অবশেষে গ্রামে ফিরতে হয় তাকে। ফিরে এসে নিজের সন্তানদের সাথে বসবাস শুরু করে সূর্য দীঘল বাড়ীতে। সূর্য দীঘল এ বাড়ি সম্পর্কে গ্রামের মানুষদের মনে বিভিন্ন রকমের ভ্রান্ত ধারনা ছিল। এ কারনে বাড়িটিকে সবাই অভিশপ্ত বাড়ী হিসেবেই জানত। বসবাসের স্থান নিশ্চিত হলেও অভাবের কারনে তাকে বাড়িতে বাড়িতে কাজ করতে হত৷ ট্রেনে করে ময়মনসিংহ থেকে কমদামে চাল কিনে নারায়ণগঞ্জে এনে বিক্রি করত।.

সামান্য কিছু খরচ করত জীবন বাঁচানোর জন্য।কোনমত বেঁচে থাকাটাই যেন তাদের স্বার্থকতা।  জীবন জীবিকার জন্য  তার এই অদম্য সংগ্রামকে ভাল চোখে দেখেনি তৎকালীন ধর্মান্ধ মুসল্লিরা। বাঁচার জন্য তাকে ঘরের বাইরে যেতে হত। মেয়েরা যখন তখন ঘরের বাইরে যাবে, কাজ করবে এটাতে তৎকালীন ধর্মান্ধ মুসল্লীরা খুশি ছিলনা। এ জন্য জয়গুনের অসাক্ষাতে ধর্মান্ধ মুসল্লী ও গ্রামবাসীরা সমালোচনা করত, ধিক্কার জানাত। প্রথম পাড়া হাসের ডিম জয়গুন হুজুরকে দিতে যায় কিন্তু হুজুর ডিম না রেখে চোখেমুখে ঘৃনার তীব্রতা নিয়ে তাকে ফিরিয়ে দেন। ধর্মান্ধ এ হুজুর আল্লার কাছে শুকরিয়া জানান যে আল্লাহ হারাম থেকে তাদের হেফাজত করেন। অর্থাৎ জয়গুনের দেওয়া হাসের ডিমকে সে হারাম মনে করেন এবং তা গ্রহন করাকে পাপ ভাবেন।জয়গুণের ছেলে মায়ের সাথে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে চাইলেও সাহস পায়না। হুজুরের ভাবখানা এমন যে, না খেয়ে জয়গুনরা মারা যাবে কিন্তু নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার অধিকারটুকু পর্যন্ত এরা পাবেনা।.

জয়গুণরা বারংবার এ সমাজে উপেক্ষিত ও লাঞ্চিত। দারিদ্র্যতার কষাঘাতে নিমজ্জিত। এক শ্রেনীর হৃদয়হীন স্বার্থান্বেষী মানুষ এ সকল মানুষকে মানুষ হিসেবে গন্য করতে নারাজ। জয়গুণের বিয়ে হয়েছিল দু’বার। স্বামী মারা যাবার পর জয়গুণকে আরেকটি বিয়ে করতে হয়েছিল। কিন্তু সেখানেও সুখ কপালে জোটেনি। দুর্ভিক্ষের সময় তার স্বামী তাকে তাড়িয়ে দেয় কোলের ছেলে সন্তান রেখে। অথচ মেয়েটিকে রাখেনি। যেহেতু পুত্র সে বংশের প্রদীপ ও ভবিষ্যতের খুটি। অপর পক্ষে কন্যা হল নিছক মাত্র। তার কাছে কোন কিছু ফেরত পাওয়ার কোন আশা করা যায় না।.

দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে মেয়েটি মারা যায়। দেশ যখন স্বাধীন হল ১৯৪৭ সালে, তখন জয়গুণের চোখে মনে আশার আলো জেগেছিল এই ভেবে যে এবার চালের দর সস্তা হবে, তারা পেট পুরে খেতে পারবে। দেশের জাতীয় পতাকা তাকে স্বপ্ন দেখায়। সবুজ নিশান জীবনের নিশান, মনে জাগে বাঁচবার আশা। পরিবারে হাল ধরতে তার কচি বড় ছেলেটিকেও মুঠে বইতে হত। তার কচি ঘাড়টা তাই মাঝেমাঝে ব্যথা কাতর হয়ে পড়তো।.

অল্প বয়সে মেয়ে বিয়ে দেওয়ার এক ভয়ানক অভ্যাস আমাদের সংস্কৃতিতে চলমান। জয়গুণের মেয়ের তাই বিয়ের পরিণতি হয় ভয়াবহ। আমাদের সমাজে তাই প্রয়োজন বাল্য বিবাহের বিরুদ্ধে কঠোর থেকে কঠোরতর বিপ্লব। জয়গুণের ছেলে হাসুকে তার স্বামী আটকে রাখে কিন্তু মায়ের ভালবাসা থেকে আটকে রাখার সাধ্য কি জাগতিক নিয়মে পারা যায়৷ সন্তান হারানোর ভয়ে তাই করিম বক্স হাসুকে আটকে বাড়িতে রাখার চেষ্টা করেন।.

কখনও কাছ ছাড়া হতে দেয়না। ভূতের ভয় দেখিয়ে আটকে রাখার ফন্দিতে হাসু ভয় পেয়ে মৃত্যুর দুয়ারে পৌছায়। মায়ের সেবা আবার তাকে সেখান থেকে ফিরিয়ে আনে। তাতে হুশ ফিরে আসে করিম বক্সের। জয়গুণকে আবার সে ফিরে পেতে চায়, ঘরে তোলার প্রস্তাব দেয়, কিন্তু জয়গুণ তা প্রত্যাখ্যান করে পিতৃতন্ত্রের মুখে কালিমা ছুঁড়ে দেয়।.

উপন্যাসের অন্যতম একটি চরিত্র গেদু প্রধান। এ রকম গেদু প্রধানরা এখনও আমাদের সমাজে বিদ্যমান। জয়গুণকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করার জন্য উঠেপড়ে লেগে যায় গেদু প্রধান। তাই সে তথাকথিত ভয়ের আশ্রয় নিয়ে ঢিল মারতে থাকে বাড়িতে। জয়গুণের প্রাক্তন স্বামী দেখে ফেলায় তাকে গলা টিপে হত্যা করে গেদু। আর তাই ভূতের কারসাজি মনে করে বাড়ি ছাড়তে হয় জয়গুণকে।.

এভাবেই লেখক কাহিনী এগিয়ে নিতে থাকেন । যেখানে জয়গুণের সংগ্রাম, অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার অধিকার না থাকা, মাতৃ বাৎসল্য, অবশেষে সূর্য দীঘল বাড়ি থেকে পরিকল্পিতভাবে তাদের উচ্ছেদ এর মধ্য দিয়ে কাহিনী শেষ হয়।.

বইটি পড়ে মনে হয়, সব মানুষ এখনও মানুষ হয়ে উঠেনি।. .

ঢাকানিউজ২৪.কম / রায়হান হাবিব দুলাল/কেএন

সাহিত্য বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

banner image
banner image