• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ৭ মাঘ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ; ২০ জানুয়ারী, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
  • সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

Advertise your products here

banner image

জলাশয় পুনঃখনন কার্যক্রমে কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব


ঢাকানিউজ২৪.কম ; প্রকাশিত: বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ০৭:২৫ পিএম
জলাশয় পুনঃখনন কার্যক্রমে কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ অর্থনৈতিক ও সামাজিক  প্রভাব

প্রকৌঃ মোঃ আলীমুজ্জামান চৌধুরী তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌঃ ও প্রকল্প পরিচালক

বাংলাদেশে পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য উৎপাদন এবং গ্রামীন পর্যায়ে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বর্তমান সরকারের মুল নির্দেশনা হলো “দেশের প্রতি ইঞ্চি জমি পতিত না রেখে উৎপাদনশীল কাজে লাগাতে হবে”। সেপ্রেক্ষিতে মৎস্য অধিদপ্তরাধীন চলমান “জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি শীর্ষক” প্রকল্পটি অক্টোবর,২০১৫ হতে জুন,২০২২ মেয়াদে বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্প মেয়াদে সারাদেশের ৬১ টি জেলার ৩৪৯ টি উপজেলায় প্রায় ২,৬০০.০ হেক্টর আয়তনের পতিত/অব্যবহৃত ভরাট হয়ে যাওয়া বিভিন্ন শ্রেণীর জলাশয় পুনঃখননের মাধ্যমে মৎস্যচাষ উপযোগী সংস্কার করে স্থানীয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠিকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর মাছ চাষের আওতায় আনা। এ প্রকল্পের মুল উদ্দেশ্য দুটি (১) বছরে মোট ১০,২৩৪.০০ মেট্রিক টন অতিরিক্ত মাছ উৎপাদন (প্রায় ৪.০ মেঃটন/হেঃ/বছর) এবং (২) মোট ১৮,২০০ জন গ্রামীন মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি(৭-১০ জন/হেঃ)। 


এছাড়াও অব্যবহত জলজ সম্পদের সুষ্ঠ ব্যবহার নিশ্চিতকরন, সরকারী খাশ জলাশয়ে প্রান্তিক মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণ, ভূ‚-পৃষ্ঠস্থ পানি ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষিতে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণসহ অনেক লক্ষ্য পুরনের জন্য প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। উন্নয়নকৃত জলাশয়ের পাড়গুলোতে শাকসব্জি, গবাদি পশুর খাবার হিসাবে নেপিয়ার ঘাস ও ফলজ বৃক্ষ রোপনের মাধ্যমে বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।

সংগৃহিত তথ্য অনুযায়ী জুন/২০২১ পর্যন্ত প্রায় ২,৪০০.০ হেক্টর জলাশয় পুন:খনন কাজ সম্পন্ন হয়েছে, যা মোট লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৯০% এবং সংস্কারকৃত উক্ত জলাশয় হতে বর্তমানে বাৎসরিক প্রায় ৯,৬০০.০ মেট্রিক টন অতিরিক্ত মাছ উৎপাদনসহ (৪.০ মেঃটন/হেক্টর/বছর) এবং প্রায় ১৬,৮০০ জন প্রান্তিক তথা গ্রামীন মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে (৭ জন/হেক্টর)। মাত্র ১০০ টাকা/কেজি হিসাবে বাজার মুল্য বিবেচনা করলে উৎপাদিত এ অতিরিক্ত মাছের বাজার মুল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা।

এছাড়াও পরোক্ষভাবে আরো দ্বিগুনেরও বেশি পরিমাণ মানুষ কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়ে আর্থিকভাবে উপকৃত হচ্ছে। ইতিমধ্যেই চলমান জলাশয় সংস্কার প্রকল্পটি করোনার প্রভাব মোকাবেলায় অভিষ্ট প্রধান লক্ষ্য পুরণে দেশে অতিরিক্ত মৎস্য উৎপাদন এবং গ্রামীন পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক প্রভাব ফেলেছে।


উল্লেখ করা প্রয়োজন বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার গুরুত্ব অনুধাবন কওে দেশের করোনা মহামারী মোকাবেলার অংশ হিসাবে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ নির্দেশনায় এবং মৎস্য অধিদপ্তরের নিবিড় তত্ত্বাবধানে জলাশয় সংস্কার প্রকল্পের অর্থায়নে গত ২০২০-২০২১ অর্থবছরে প্রায় ১,১০০.০ হেক্টর জলাশয় পুনঃখনন সম্পন্ন করে গঠিত সুফলভোগী প্রান্তিক জনগোষ্ঠির মাধ্যমে মৎস্য চাষের আওতায় আনার কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।


দেশের ভয়াবহ করোনা মহামারীকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে এ ব্যাপক জলাশয় পুনঃখনন কার্যক্রম বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন সংশ্লিষ্ট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা, সিনিয়র উপজেলা/উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা, বিভাগীয় সহকারী প্রকৌশরী, জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলিগণ। নিবিড় মনিটরিং কাজে নিয়োজিত আছেন ৮ বিভাগের সুযোগ্য উপপরিচালক মহোদয়গন। এছাড়াও কেন্দ্রিয়ভাবে মৎস্য অধিদপ্তর এবং প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ের বিশেষ টীম চলমান পুনঃখনন কার্যক্রম পরিদর্শনে নিয়োজিত ছিলেন।

সর্বপরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নির্দেশিত প্রতিটি পুনঃখনন কাজের স্বাক্ষী সংরক্ষণ, অনুমোদিত চুড়ান্ত পরিমাপ কমিটি কর্তৃক সম্পাদিত মাটির কাজের হিসাব নিরুপন এবং গঠিত সুফলভোগী গ্রুপের নিকট পুনঃখননকৃত জলায়শটি মাছ চাষের উদ্দেশ্যে হস্তান্তর কার্যক্রম থাকায় জলাশয় পুনঃখনন কাজ শতভাগ স্বার্থকভাবে সম্পন্ন হয়েছে।


আগষ্ট/২০২১ পর্যন্ত প্রকল্পের লক্ষমাত্রার বিপরিতে বাস্তব ও আর্থিক অগ্রগতির চিত্রঃ-
প্রকল্পের কার্যক্রম ও লক্ষ্যসমূহঃ-

* মেয়াদকাল                 :- অক্টোবর,২০১৫ হতে জুন,২০২২                                           
* জলাশয় পুনঃখনন         :- ২৫৯৭.৪৩ হেক্টর
* মেয়াদান্তে মৎস্য উৎপাদন :- ১০,২৩৩ মেঃটন
* গ্রামীন কর্মসংস্থান সৃষ্টি    :- ১৮,২০০ জন
* দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ   :- ১৫,০৩৫ জন
* মৎস্য প্রদর্শনী খামার      :- ৭৮২ টি সংস্কারকৃত জলাশয়ে
* পাইপ কালভার্ট নির্মান    :- ৫০০ টি
* মাছ ধরার জাল বিতরণ   :- ৮০ টি
* পাম্প মেশিন বিতরণ      :- ৪০ টি        প্রকল্পের বাস্তবায়ন কার্যক্রমের অগ্রগতিঃ-

* জলাশয় পুনঃখনন সম্পন্ন  :- প্রায় ২,৪০০ হেক্টর                                           
* অতিঃ মাছ উৎপাদন হবে  :- প্রায় ৯,৬০০ মেঃটন/বছর
* উৎপাদিত মাছের মুল্য     :- প্রায় ১০০.০ কোটি টাকা
* কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে       :- প্রায় ১৬,৮০০ জন
* পাইপ কালভার্ট নির্মান    :- ৪৩৭ টি
* প্রশিক্ষণ প্রদান             :- ১৪,৫০০ জন
* প্রদর্শনী খামার স্থাপন     :- ৫১১ টি
 * প্রকল্পের অগ্রগতি        :- প্রায় ৮৫.০ % 


উল্লেখ করা প্রয়োজন প্রকল্পভুক্ত প্রায় সকল পুনঃখনন উপযোগী জলাশয়ের মালিকানা ভুমি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মহোদয়গণ এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো), সংগত কারনেই পুনঃখননের জন্য তাদের অনাপত্তি পত্রের প্রয়োজন হয়। মৎস্য অধিদপ্তরের এ ব্যাপক পুনঃখনন কার্যক্রমে করোনা মোকাবেলার অংশিদার হিসেবে জেলা/উপজেলা প্রশাসন এবং বাপাউবো এর সহায়তা ছিল অত্যন্ত আন্তরিক এবং গঠনমুলক।
    


সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টায় সংস্কারকৃত জলাশয়গুলোর উৎপাদনশীলতা প্রায় ৮ গুন বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে প্রতিটি জলাশয়ের ইজারা মুল্য কয়েক গুন বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে সরকারের রাজস্ব আয় পুর্বের তুলনায় অনেক বেড়েছে, জনসাধারনের চলাচলের রাস্তা তৈরী হয়েছে, পরিবেশের উন্নয়ন হয়েছে, প্রভাবশালীদের মাধ্যমে বেহাত হওয়া সরকারী সম্পদ পুনঃরুদ্ধার হয়েছে, সম্পদের সুষ্ঠ ব্যবহার নিশ্চিত হয়েছে, সর্বপরি গ্রামীন জনগোষ্ঠির অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তাদের কর্মসংস্থানসহ আর্থ-সামাজিক অবস্থার ব্যাপক উন্নয়ণ ঘটেছে।
    


লক্ষ্যনীয় বিষয়, সাম্প্রতিক করোনা মহামারী পাদুর্ভাবে শহরকেন্দ্রিক ব্যাপক সংখ্যক মানুষ কর্মহীন হয়ে নিজ গ্রামে স্থানান্তর হয়েছে। সেপ্রেক্ষিতে ঐসকল বেকার স্থানান্তরিত মানুষের জন্য জলাশয় পুনঃখনন কার্যক্রম তাৎক্ষনিকভাবে অস্থায়ী ভিত্তিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে দেশে গ্রামীন অর্থনীতি সচল থাকার জন্য সরকারের গৃহিত অন্যান্য পদক্ষেপের সহিত মৎস্য অধিদপ্তরের জলাশয় সংস্কার প্রকল্পের পুনঃখনন কার্যক্রম ব্যাপক ভুমিকা রেখেছে।

প্রকল্পটির আরো কয়েকটি সফল দিক হলো গঠিত সুফলভোগী গ্রæপের সদস্যদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য আধুনিক মৎমস্য চাষ বিষয়ক উপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রদান এবং উদ্ভুদ্ধকরণ কর্মসুচীর আওতায় সংস্কারকৃত জলাশয়ে প্রদর্শনী মৎস্য খামার স্থাপন। জলাশয়ের নির্মিত পাড়ে শাকসব্জি, ফলজ বৃক্ষ ইত্যাদি রোপনের মাধ্যমে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। উল্লেখ্য, সংগঠিত সুফলভোগীদেও মৎস্য চাষের আধুনিক কলাকৌশলের উপর প্রশিক্ষণ প্রদান ও প্রদর্শনী মৎস্য খামার স্থাপনের মাধ্যমে ফলাফল প্রদর্শন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাকে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে (৫.০ মেঃটন/হেঃ/বছর এর বেশী হয়েছে)। 
    


প্রকল্পের মধ্যবর্তী মুল্যায়ন প্রতিবেদনে গৃহিত কার্যক্রমের উপর অনেক ইতিবাচক বিষয় তুলে ধরা হয়েছে এবং সারাদেশব্যাপী বৃহত্তর পরিসরে চাহিদার প্রেক্ষিতে অতিরিক্ত মৎস্য উৎপাদন ও গ্রামীন পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ভরাট জলাশয় পুনঃখননের মাধ্যমে মৎস্য চাষের আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়েছে।
    

সম্প্রতি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আইএমইডি কর্তৃক নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষা প্রতিবেদনে সংস্কারকৃত জলাশয়ে মাছের উৎপাদন ৪.০ হতে ৬.০ মেঃটন/হেক্টর/বছর এবং গ্রামীন পর্যায়ে ১৫,০০০-২০,০০০ জনমানুষের সরাসরি গ্রামীন কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ সমপরিমান মানুষের পরোক্ষ কর্মসংস্থানের ফলে তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন হবে বলে মতামত ব্যক্ত করা হয়েছে।


প্রকল্প মেয়াদের অবশিষ্ট সময়ে (জুন/২০২২) বাকী পুনঃখনন কাজসহ অন্যান্য কাজ সম্পন্ন করার মাধ্যমে শতভাগ লক্ষ্যমাত্র অর্জন করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।   
 

ঢাকানিউজ২৪.কম /

কৃষি বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

banner image
banner image