• ঢাকা
  • বুধবার, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ; ১০ আগষ্ট, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
  • সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

Advertise your products here

banner image

বাংলার অর্থনীতিই হচ্ছে বাংলার রাজনীতি


ঢাকানিউজ২৪.কম ; প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৯ জুলাই, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ০২:৪৩ পিএম
আসল কারণ হচ্ছে দারিদ্র্য
বাংলার রাজনীতি

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

একটি প্রবন্ধে পড়েছিলাম, শার্লক হোমসকে তাঁর সেই বিখ্যাত ও অত্যন্ত অনুগত এবং কিছুটা বোকা বন্ধু ডা. ওয়াটসন জিজ্ঞেস করছেন- 'এখন তোমার হাতে কী কাজ?' জবাবে শার্লক হোমস বলেছেন- 'না, কোনো কাজ নেই। দেখছ না, সে জন্য কোকেনের ইনজেকশন নিচ্ছি।' খুবই নাড়া দেয় এ কথাটা আমাকে, যখনই ভাবি।

মানুষকে বলা হয়েছে চিন্তাশীল প্রাণী। গ্রিক দার্শনিকরাই বলেছেন প্রথমে। কথাটা অবশ্যই সত্য; আরও বেশি সত্য বোধ হয় এই কথাটা, মানুষ একটি কর্মপ্রিয় প্রাণী। যখন কাজ পায় না, মানুষ তখন অকাজ করে। যেমন শার্লক হোমসের মতো জগদ্বিখ্যাত ডিটেকটিভও করেন, কোকেনের সেবা করেন; কর্মহীন অবস্থায় তিনি আর অতি বুদ্ধিমান মানুষটি থাকেন না। অতি সামান্য মাদকাসক্ততে পরিণত হয়ে যান; রাস্তাঘাটের যুবকদের মতো।

হোমস আরও বলেছেন ওই সংলাপে, 'কাজ না থাকলে বেঁচে থাকার কী থাকে! ক্ষমতা থেকে লাভ কী; ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্র যদি না পাওয়া যায়।' খুবই সত্য কথা। মনে কি পড়ে রবীন্দ্রনাথের কবিতায় কচের প্রতি দেবযানীর সেই বিখ্যাত অভিশাপ- 'পারিবে না করিতে প্রয়োগ'। এ বড়ই নিষ্ঠুর পরিস্থিতি। ক্ষমতা আছে জানি, টেরও পাই, কিন্তু প্রয়োগ করতে পারি না। এর নাম বেকার থাকা। বেগার খাটা তবু সহ্য হয়, কিন্তু বেকার থাকা? একদিন, দু'দিন, ১০ দিন, ২০ দিন চলে। কিন্তু যদি হয় অন্তহীন ওই কর্মহীন থাকা, তবে? না, তখন মানুষ আর মানুষ থাকে না। তার কর্মপ্রিয়তা এবং সৃষ্টিশীলতা ভেতর থেকে ঠেলাঠেলি করে একটা প্রলয়কাণ্ড বাধিয়ে ছাড়ে। হয়তো সে কোকেন, হেরোইন এসব ধরে; ঝিমোয়, নয়তো মাস্তানি করে। কর্মহীনতা তার মনুষ্যত্বকেই মাটি করে দিতে চায়; একেবারে।

বেকারত্ব মানুষকে আত্মমর্যাদাহীন করে তোলে। তার সৃষ্টিশীলতা পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে এবং সেই স্তূপের বোঝা বহন করে করে সে ক্লান্ত হয়। কেবলই ক্লান্ত হয়। আত্মবিশ্বাস যায় হারিয়ে। পরনির্ভরশীলতা হয়ে পড়ে মজ্জাগত। আর ওই যে দুই বড় বিপদ- মাস্তানি ও মাদকাসক্তি; তারা তো আছেই।

এসব কথা থাক। মূল কথায় ফেরত যাই। না, আমাদের দেশে বড় বড় রাজনৈতিক দল যে দুর্বৃত্তদের আশকারা দেয়; সেটা যে আমি দেখছি না, তা নয়। খুবই দেখছি। কিন্তু চাওয়ামাত্রই তারা যে মাস্তান পেয়ে যায় এবং রাজধানী থেকে ইউনিয়ন পরিষদ, পাড়া-মহল্লা পর্যন্ত সর্বত্র তাদের কাজে লাগাতে পারে; এর কারণ কী। সেটা নিয়েই একটু চিন্তিত ছিলাম, এই যা। পাকিস্তান আমলে এবং বাংলাদেশের প্রথমদিকেও দেখেছি সরকারি দল (তাদের হাতেই যখন টাকা ছিল) বস্তি থেকে লোক ভাড়া করে এনে মিটিং-মিছিল করত। এখন আর বস্তিতে যেতে হয় না। দারিদ্র্য ও বেকারত্ব এত বেড়েছে যে এখন মাস্তান মাশাল্লাহ যেখানে-সেখানে পাওয়া যায়।

রাজনৈতিক দল তো বিলেত-আমেরিকাতেও আছে। কই, সেখানে তো তারা সন্ত্রাসী যুবকদের এমনভাবে কাজে লাগাতে পারে না! অথবা ধরা যাক, আমাদের বড় দুই দলের নেতারা জাপান চলে গেলেন (এশিয়ার দেশ বলে)। দুই দলের একটি গঠন করল সরকার। অন্যটি রইল বিরোধী হয়ে। আইন তো তাদের হাতেই, তাই সেদিক থেকে অসুবিধা থাকবে না, টাকাও থাকবে হাতে (এখন যেমন রয়েছে), তবু কি তারা মাস্তান ভাড়া করতে পারবে রাজনীতি করার জন্য? কল্পনা করা যায়? না, পারবে না। পারবে না এই সহজ কারণে যে, কোনো জাপানি যুবকই রাজি হবে না ওইভাবে খুন-জখম হয়ে শেষ হতে। সেখানে এখানকার মতো দারিদ্র্য নেই; এত বেকারও নেই। সেখানে ভাড়া খাটা মাস্তান পাওয়া বড়ই কঠিন। সে জন্যই বলার চেষ্টা করেছিলাম, আসল কারণ হচ্ছে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব। অন্য কারণ যে নেই তা নয়, তবে তারা প্রধান নয়।

কাজের ব্যাপারকে আমাদের সংস্কৃতিতে তেমন গুরুত্ব দিইনি। 'কাজের লোক' বলতে ভৃত্যদের বোঝানো হয়েছে। কাজ তারাই করবে; অন্যেরা করবে ভোগ ও উপভোগ। 'আমাদের মেয়ে কিন্তু কাজ জানে না'- এটাকে কোনো লজ্জার দাবি নয়; গৌরবের দাবি বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা এক সময় হতো, বিয়ের কথাবার্তার ক্ষেত্রে। কাজ জানে না অর্থ কাজ জানার প্রয়োজন পড়েনি। কাজকর্ম যা করার দাস-দাসীরাই করেছে। ভাবটা ছিল এই রকম। তখন মেয়েদের জন্য সবচেয়ে বড় কাজ ছিল বিয়ে, তার পর তথাকথিত ঘরকন্না করা। অত্যন্ত উচ্চমূল্য দেওয়া হতো তাদের মাতৃত্বকে। এখনও যে এসব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে গেছে, তা মোটেই নয়। এখনও মেয়েদের আমরা কাজের মতো কাজ দিতে পারিনি।

মেয়েদের জন্য কাজ যে কত প্রয়োজনীয়; গার্মেন্ট শ্রমিকদের দিকে তাকালে বোঝা যায়। যে পরিশ্রম তাদের করতে হয়, যে কোনো বিচারেই তা অমানবিক। আলোকিত শহরে অন্ধকার চা বাগান প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে যেন শ্রমিকদের জন্য। তবু গার্মেন্টের যে কোনো নারী শ্রমিককে জিজ্ঞেস করুন, বলবে, অতি সামান্য বেতনে এই অমানবিক শ্রম; তবু ভালো গৃহের অভ্যন্তরে দাসত্বের তুলনায়। কেননা, এ কাজ তাকে চলাফেরায় কিছুটা হলেও স্বাধীনতা দিয়েছে। সামান্য হলেও কিছু আয় করে নিজের ও অপরের কাছে মর্যাদা বৃদ্ধির সুযোগ সে পেয়েছে। অপরের সঙ্গে মেলামেশার একটা ক্ষেত্রও সে লাভ করেছে।

আসলে কাজ খুবই দরকার। কাজ যারা পেয়েছে, তারাও অনেকে পুরোপুরি পায়নি। অর্থাৎ এমন কাজ পায়নি, যা তাদের পূর্ণ সময় ও মনোযোগ দাবি করতে পারে। এদিকে লাখ লাখ মানুষ দেশে বেকার, যাদের কাজ দেওয়া যাচ্ছে না এবং এই বেকারের সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। তাদের জন্য নতুন কোনো কাজ তৈরি হচ্ছে না। গোটা সমস্যাই অর্থনৈতিক। আজ থেকে অনেক বছর আগে একে ফজলুল হক বলেছিলেন, বাংলার অর্থনীতিই হচ্ছে বাংলার রাজনীতি। বড়ই সত্য কথা।

অর্থনীতিই রাজনীতিতে প্রতিফলিত হয় এবং তাকে এদিকে ঘোরায়, ওদিকে ঘোরায়; দুমড়ে দেয়, মুচড়ে দেয়। অর্থনীতিতে এখন বড়ই মন্দা ভাব। শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে না। না ওঠার কারণ পুঁজি পাচার হয়ে যাচ্ছে বাইরে। আরও একটি কারণ, দেশীয় পণ্য বাজার পাচ্ছে না। বৈধ পথে কিছুটা, অবৈধ পথে অনেক অধিক পরিমাণে বিদেশি পণ্য এসে দেশি পণ্যের বাজার তছনছ করে দিচ্ছে। তদুপরি মানুষের নেই ক্রয়ক্ষমতা। মূল সমস্যাটা অর্থনৈতিক বটে। কিন্তু এর সঙ্গে রাজনীতিও জড়িত; ওতপ্রোতভাবে। রাজনীতিকে শুধু অর্থনীতির প্রতিফলন ভাবলে ভুল করা হবে। কেননা, রাজনীতিও যে অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে না, তা নয়। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ও নীতি অর্থনীতির ক্ষেত্রে খুবই জরুরি বটে।

রাষ্ট্রীয়ভাবে এখন আমরা মুনাফার লাইনে চলছি। বিশ্বব্যাংক পরামর্শ দিয়েছে- লোক ছাঁটাই করো, তাহলে তোমাদের উন্নতি হবে। কার উন্নতি? কীসের উন্নতি? উন্নতি যা হচ্ছে তা তো দেখতে পাচ্ছি। উন্নতির ধাক্কায় যে যেভাবে পারে দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে। কর্ম সৃষ্টি না করে উল্টো বেকার সৃষ্টির চেয়ে বড় আত্মঘাতী পদক্ষেপ আবিস্কার করা আমাদের পক্ষেও কঠিন হবে বৈকি। সরকারের একটা বড় কাজ হচ্ছে দেশের মানুষের জন্য কর্মসংস্থান। সেটা করতে না পারলে সরকারকে ব্যর্থ না বলার কোনো কারণ থাকে না। সাফল্য ও ব্যর্থতা বিচারের এই নিরিখটাকে উচ্চে তুলে ধরা চাই। বলা চাই- কাজ দিতে হবে; বেকার রাখা চলবে না।

দেশটিকে স্বাধীন করা একটা বড় কাজ ছিল; কঠিন কাজও বটে। সেই তুলনায় সমাজ ও রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক করা এবং সবার জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা খুবই কঠিন এবং অত্যন্ত জরুরি। ওই কাজে হাত না দিলে আমরা এগোতে পারব না; পারছিও না এগোতে।

লেথক:  ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকানিউজ২৪.কম /

খোলা-কলাম বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

banner image
banner image