• ঢাকা
  • শুক্রবার, ৬ কার্তিক ১৪২৮ বঙ্গাব্দ; ২২ অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ
  • সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

Advertise your products here

banner image

জেনোসাইড রিটার্নস ইন নারায়ণগঞ্জ অর্ডারলী


ঢাকানিউজ২৪.কম ; প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ০৭ অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ০৮:৩৬ পিএম
৩৪ জন নিহত হয়েছিল তাদের মধ্যে
নারায়ণগঞ্জের মসজিদে এসি বিস্ফোরণ

রায়হান হাবিব দুলাল.

গত বছর ২০২০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর, নারায়ণগঞ্জের একটি মসজিদে  এসি বিস্ফোরণে যে ৩৪ জন নিহত হয়েছিল তাদের মধ্যে সিফাত নামের একজন তরুণ ছিল। সে আমার ছাত্র এবং এ কারনে তাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম। সিফাত মরে গেছে নাকি তাকে মেরে ফেলা হয়েছে, সে প্রশ্ন বাতাসে ঘূর্ণিপাক খাক বা খেতে থাকুক তাতে আমাদের হয়ত মাথা ব্যথা থাকবে না বা থাকার কথা নয়।.

অন্যকে নিয়ে আমরা ভাবব সে সময় কোথায়, সময় নষ্ট করবার। সিফাত পুড়েছে তাতে কি? আপনি বা আমি তো পুড়িনি! কয়েক দিন পরে যখন আপনি বা আমি পুড়ব তখন অন্যের কি? কারন তারা তো আর পুড়েনি।  আমরা অনেকটা আত্নকেন্দ্রিকভাবেই বর্তমান শতাব্দীতে বসবাস করছি। সিফাতকে খুব কাছে থেকে দেখেছি আমি। ইংরেজির  ক্লাসে তাকে নিয়মিত পেতাম। তার তরণ মুখের ছবি আমার মানস পটে ভাসে। ক্লাসে সে কিভাবে বসত,কিভাবে প্রশ্ন করত সব মনে পড়ে। সিফাত পুড়ে যাওয়ার পরেও বাঁচতে চেয়েছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। মৃত্যুর সাথে লড়াই করে টিকে উঠতে পারেনি। সিফাতের মুখটা খুব করে যখন মনে পরে তখন শরীর-মন-মগজে কেমন জানি একটা শিরশিরে অনুভুতি কাজ করে। সমস্ত শরীরটা ভার হয়ে আসে। হঠাৎ নজিয়া অনুভব হয়। নজিয়া অনুভবটা পোড়া গন্ধের কারনে নয়,সিফাতকে যে বা যারা মেরে ফেলল সেটা মনে করে। এরপরে অনেকটা সময় কেটে গেছে। সিফাতও আমাদের স্মৃতি থেকে কালক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে। মাঝে একবার ওর পরিবারের সাথে কথা হয়েছিল। তরুণ সদস্যকে হারিয়ে তারা কোন রকমভাবে বেঁচে আছে। সিফাত সে স্মৃতিতে যাওয়া আর আসার মধ্যেই থাকবে।  হয়ত একটা সময় উর্ণাভজাল কেটে যাবে।.

নারায়ণগঞ্জের এসি বিস্ফোরণের পরে পুরো বাংলাদেশের মানুষের মনে হয়ত দাগ কেটেছিল। প্রশাসন থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নীতি নির্ধারকেরা নড়েচড়ে বসেছিল।
উক্ত বিস্ফোরণের ঘটনায় মসজিদ পরিচালনা কমিটি, তিতাস গ্যাস ও ডিপিডিসির অবহেলাকে দায়ী করে অজ্ঞাত আসামীদের বিরুদ্ধে অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে মামলা করেছিলেন ফতুল্লা মডেল থানার উপপরিদর্শক হুমায়ুন কবির। পরবর্তীতে কি হয়েছিল সে খবর আমরা কেউ রাখিনি। সাধারন মানুষের মনে হয়ত ধারনা ছিল এ রকম ঘটনার আর পুনরাবৃত্তি ঘটবে না।.

কিন্তু মানুষতো একটা জীবন চক্রের মধ্যে বাস করে আর এ কারনে তাকে নানা রকম ঘটনা চক্রের মধ্যে দিয়েও যেতে হয়। এটাকে পরিহার করার কোনো উপায় থাকেনা।  ইংরেজি সাহিত্যের  একটি গল্পের লাইন এ রকম ছিল-" None can tell sir, none can tell, in near future what will happen".আসলে আমরা কেউ জানি না যে সন্নিকটে কি অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।.

সিফাতের এ ঘটনার পরে চলতি বছরের ৪ এপ্রিল, নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যায়
জাহাজের (কার্গো) ধাক্কায় যাত্রীবাহী লঞ্চডুবিতে আবারে ৩৪ জনের প্রাণহানি ঘটল। সিফাতের ঘটনাটি ছিল নারায়ণগঞ্জের মাটিতে। আর এবার শীতলক্ষ্যা নদী মানে পানিতে। তার মানে একবার আমরা আগুনে পুড়ছি আবার পরক্ষণেই ভাসছি পানিতে।
আগুন ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল হয়ত। একারনে দায়িত্ব চাপে জলের উপর। কবি হেলাল হাফিজের কবিতার লাইনটি মনে পরে- 'জলে আগুন জ্বলে'।  তথ্য মতে, কয়লাঘাট এলাকায় কার্গো জাহাজ এসকেএল-৩ বেপরোয়াভাবে পেছন থেকে ধাক্কা দিলে লঞ্চটি  ডুবে যায়। কেউ কেউ সাঁতরে তীরে উঠতে পারলেও নিখোঁজ থাকেন অনেকে। পরে ৩৪ জনের সলিল সমাধি হয়। জল আর স্থল সমান তালে পোড়াতে পিছপা হচ্ছে না। আমাদের দেখার অনেকেই আছে আবার ক্ষনিকের ব্যবধানে ভুলেও যাচ্ছে অনেকে। অবশ্য এ শতাব্দীতে মানুষের শোকের আয়ু বড়জোর এক বছর।.

  গত ক'দিন আগেই ৮ জুলাই, রুপগঞ্জের সেজান জুস কারখানায় ঘটে গেল হৃদয় বিদারক ঘটনা। রাবণের চিতায় ৫২ জনের লাশ পুড়ে ছারখার হল। জানা গেল কিছুদিন আগেও নাকি সেখানে ছোট খাটো অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছিল। তবুও তারা সতর্ক হয়নি এবং তারা সতর্ক হওয়ার প্রয়োজনীতা বোধ করেনি। প্রাথমিক দূর্ঘটনার পরেও ভবনে কেমিক্যাল এবং তৈরি পণ্য একসঙ্গে ছিল।  এ  কারণে আগুন ভয়াবহ আকার নিয়েছিল। মানুষ কতটা অসচেতন, দায়িত্ব-কর্তব্যহীন হলে এমনটা করা যায় তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। দেশের সর্বোচ্চ লেভেলের একটি গণমাধ্যম তাদের সাথে যোগাযোগ করলে, তারা খুব সহজেই ক্ষতি পুরনের আশ্বাস ব্যক্ত করে। কী সহজেই বলে ফেলল কিন্তু গলাটা কাঁপল না! জীবন তাদের কাছে কতটা ঠুনকো, ভাবা যায়? দিন এনে দিনে খাওয়া মানুষগুলো কারখানার ভিতরে পুড়ে মরে,নৌকা ডুবিতে মরে,যখন তাদের অধিকার ও দাবি আদায়ের জন্য রাস্তায় নামে তখন বুলেটের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত  হয়ে যায়। রক্তের ফিনকি্তে ভিজে যায় মাটি, রঞ্জিত  হয় লাল সবুজের বাংলাদেশ।.


এতকিছুর পরেও প্রতিদিনের  রুটিনে আমাদের কোনো ব্যাঘাত ঘটেনি। ঘটনার পরদিনও আমরা ক্লাসে গিয়েছি, পরীক্ষা দিয়েছি, বন্ধুর সাথে আড্ডায় মেতেছি, বাসে চড়েছি, চাকরি করতে অফিসে গিয়েছি, দিনশেষে ফিরেছি, টিভি দেখেছি, দেশ গোল্লায় গেল বলে গালাগালি করেছি। তারপর ক্লান্ত হয়ে বেশ এক ঘুম ঘুমিয়েছি। ঘুমাতে ঘুমাতে ক্লান্ত হয়ে আবারও ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছি।.

আমি এগুলোকে মোটেই দূর্ঘটনা বলব না বরং পরিকল্পিত হত্যা ও খুন বলব। খুনের পরে খুন, শত শত  নিহতের ঘটনা ঘটেছে। আর, প্রতিবারই এ ধরণের হত্যাকান্ডকে কেন্দ্র করে গঠন করা হয়েছে তদন্ত কমিটি, দেওয়া হয়েছে ক্ষতিপূরণের আশ্বাস। কিন্তু, আজ পর্যন্ত কোন তদন্ত রিপোর্ট যেমন জনগণের সামনে আসেনি তেমনি অব্যবস্থাপনার জন্য দায়ী ব্যক্তির যথাপোযুক্ত শাস্তিও হয়নি।.

সাধারণ মানুষ থেকে -পেশাজীবী-বুদ্ধিজীবী-রাজনীতিক সবার এই অনিয়ন্ত্রিত প্রবণতা এবং অপরাধ ঠেকানোর নাম করে অপরাধে প্রশ্রয় দেওয়ার অস্বস্তিকর মানসিকতাই হয়তো নারায়ণগঞ্জের এই মৃত্যুগুলো অনিবার্য করে তুলেছিল। আর নারায়ণগঞ্জ  থেকে এই ‘অনিবার্যতা’ পুরো দেশ এবং সেখান থেকে আপনার আমার ঘরে পৌঁছাতেই-বা কতক্ষণ!এ কথা ভুলে গেলে চলবেনা যে- নগর পুড়লে দেবালয় রক্ষা হয় না।.

রায়হান হাবিব দুলাল
facebook.com/mrayhan.habib. .

ঢাকানিউজ২৪.কম /

খোলা-কলাম বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

banner image
banner image