• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ২৭ শ্রাবণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ; ১১ আগষ্ট, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
  • সরকারি নিবন্ধন নং ৬৮

Advertise your products here

banner image

মহীয়সী বঙ্গমাতার চেতনা, অদম্য বাংলাদেশের প্রেরণা


ঢাকানিউজ২৪.কম ; প্রকাশিত: শনিবার, ০৬ আগষ্ট, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ০২:১০ পিএম
মহীয়সী বঙ্গমাতার চেতনা, অদম্য বাংলাদেশের প্রেরণা
বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা

মুহা শিপলু জামান 

আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির সাথে জড়িয়ে আছে অনেক মানুষের অনেক দিনের সংগ্রাম আর ত্যাগের ইতিহাস। দুইশত বছর ব্রিটিশ শাসনের পর চব্বিশ বছরের পাকিস্তানি শোষণ, বঞ্চনা আর নির্যাতনের বিরুদ্ধে যারা আন্দোলন - সংগ্রাম করেছেন, বাংলার ইতিহাসে সেসকল মহৎ ব্যক্তিত্বের গর্বগাঁথা চিরদিন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আর সেই তালিকায় সর্বপ্রথম উচ্চারিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যিনি বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ে, তাঁদের ভাগ্য পরিবর্তনে সারাজীবন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন, সয়েছেন নিদারুণ কষ্ট আর যন্ত্রণা, বছরের পর বছর পরিবার থেকে দূরে অন্ধকার কারাবাস বরণ করেছেন।

এই মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের - খোকা থেকে মুজিব কিংবা বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির পিতা হয়ে উঠার পেছেনে বঙ্গবন্ধুর বাব-মার পাশাপাশি যার অনুপ্রেরণা আর সহযোগিতা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আর কার্যকর ছিলো, তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব। ১৯৩০ সালের ০৮ আগস্ট মধুমতি নদীর তীরে অবস্থিত গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপারায় শেখ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। এক ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। শৈশবে বাবা-মাকে হারানোর পর তিনি বেড়ে উঠেন বঙ্গবন্ধুর পিতা-মাতার স্নেহের ছায়ায়।

বঙ্গমাতার জন্ম না হলে হয়তো শেখ মুজিবের বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠা হতোনা, আমরা পেতাম না জাতির পিতা, স্বাধীন রাষ্ট্র, নিজস্ব পতাকা, নিজ ভুখন্ড ও মানচিত্র। তাই ০৮ আগস্ট বাঙালি জাতির জন্য এক অনন্য দিন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আজীবনের আন্দোলন, সংগ্রাম ও ত্যাগ-তিতীক্ষার অকুন্ঠ সমর্থক ও প্রেরণাদায়ী মহিয়সী নারী, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শ্রদ্ধেয় মাতা, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবের জন্মদিন উপলক্ষ্যে তাঁর প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। এবছর সারাদেশে যথাযথ মর্যাদায় বঙ্গমাতার ৯২তম জন্মবার্ষিকী পালিত হচ্ছে। দিবসটি উপলক্ষ্যে এ বছরের প্রতিপাদ্য হলো “মহীয়সী বঙ্গমাতার চেতনা, অদম্য বাংলাদেশের প্রেরণা” যা অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত ও তাৎপর্যপূর্ণ হয়েছে। 

সৃষ্টির আদি থেকেই নর-নারীর সম্মিলিত প্রয়াস মানবসভ্যতার বিকাশ ও অগ্রসরে ভূমিকা রেখেছে। সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি সর্বক্ষেত্রেই নারীগণ অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করেছন। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর নারী কবিতায় বলেছেন,

‘কোন কালে একা হয়নি ক’ জয়ী পুরুষের তরবারি
প্রেরণা দিয়াছে শক্তি দিয়াছে বিজয় লক্ষ্মী নারী’

স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশ ও স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনে অসামান্য অবদানের জন্য যে নারীর ত্যাগ, অবদান ও অনুপ্রেরণায় ছিলেন উদ্দীপ্ত, উজ্জীবিত ও লক্ষ্য অর্জনে দৃঢ় সংকল্প, তিনি হলেন বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব, যিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর সকল অনুপ্রেরণার উৎস। তিনি সারাজীবন বঙ্গবন্ধুর সাথে ছায়ার মতো অবস্থান করেছেন, অন্তরালে থেকে বঙ্গবন্ধুর সকল কাজে সমর্থন ও সাহস যুগিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের নিভৃত সহচর হিসেবে বিদ্যমান থেকে বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ প্রদান ও সহযোগিতা করেছেন। 

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রাজনীতির মহাকবি বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে স্বাধীনতার জন্য উম্মুখ বাংলাদেশের লাখো জনতাকে তাঁর জাদুকরী বজ্রকন্ঠে শুনিয়েছিলেন অমর কবিতা,   
            “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, 
            এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।“ 

মূলত এই ভাষণের মাধ্যমেই তিনি এক অর্থে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা এবং তা অর্জনের দিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ পূর্বলিখিত বা সম্পাদিত কোন বক্তব্য ছিলো না, এই ভাষণ ছিলো বাংলা ও বাঙালিদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা আর অকৃত্রিম দেশপ্রেমের স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ। বঙ্গবন্ধু সেদিন তাঁর স্বরচিত জাদুকরী কবিতাটি বিরামহীনভাবে আবৃত্তি করেন আর মুক্তিকামী বাঙালি তা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শ্রবণ ও হ্রদয়ে ধারণ করে এবং এই ভাষণ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে অমিত বিক্রমে যুদ্ধ জয় করে কাঙ্খিত স্বাধীনতা অর্জন করে। কালজয়ী এই ভাষণ বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও ইতিহাসের সাথে সারাজীবন মিশে থাকবে।

অর্ধশত বছর পার হলেও, এখনো এই ভাষণের প্রতিটা শব্দ বাঙালি হৃদয় ছুয়ে যায়, মনকে শিহরিত করে, করে আন্দোলিত।  ভাষণের পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় আগের দিনই বক্তব্য দেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুকে একটা লিখিত স্ক্রিপ্ট দেওয়া হয়েছিলো কিন্তু অসীম রাজনৈতিক প্রজ্ঞাসম্পন্ন ও দূরদর্শী নেতা বঙ্গবন্ধু সেটা আমলে নেননি, কিন্তু তিনি শুনেছিলেন বঙ্গমাতার কথা। সেদিন বঙ্গমাতা বলেছিলেন, “তাইই বলো যা তোমার মন থেকে আসে”,  বঙ্গবন্ধুও তাই করেছিলেন; অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের অনুপ্রেরণাও ছিলেন বেগম মুজিব।  এছাড়া বঙ্গবন্ধু তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থের শুরুতেই বলেছেন,” আমার সহধর্মিণী একদিন জেলগেটে বসে বলল, ‘বসেই তো আছ, লেখ তোমার জীবনের কাহিনী’।“ অর্থাৎ মহান এই নেতার জীবন- কর্ম লেখার অনুপ্রেরণার উৎসও -  বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব। 

এই গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু আরও উল্লেখ করেছেন তাঁর টাকার প্রয়োজন হলে, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব নিজের জমানো টাকা থেকে দিতেন, কোনদিন আপত্তি করেন নাই এবং নিজের জন্য তিনি মোটেই খরচ করতেন না (পৃষ্ঠা -২৫)। গ্রন্থের আরেক জায়গায় বঙ্গবন্ধু বলেছেন, “রেনু খুব কষ্ট করত, কিন্তু কিছুই বলত না। নিজে কষ্ট করে আমার জন্য টাকা পয়সা জোগাড় করে রাখত যাতে আমার কষ্ট না হয়” (পৃষ্ঠা -১২৬)। এখানে তাঁর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর আত্মত্যাগের প্রমান পাওয়া যায়। তিনি ছিলেন জাতির পিতার সুযোগ্য সহধর্মিণী, বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা এবং সকল অনপ্রেরণার উৎস। 

সংগ্রামী জীবনে বঙ্গবন্ধু জীবনের অধিকাংশ সময় জেলে কাটিয়েছেন, আর এসময় সাহসী বঙ্গমাতা পরিবার ও সন্তানদের দেখাশোনার পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাকর্মীদেরও আগলে রেখেছিলেন প্রজ্ঞা ও দায়িত্বশীলতার সাথে। জাতির পিতার স্ত্রী হয়েও তিনি গ্রহণ করেননি কোন রাষ্ট্রীয় সুবিধা। ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি ছিলেন উদার, পরোপকারী এবং সহজ-সরল, সাধারন জীবন-যাপনে অভ্যস্ত। আর এজন্যই কোন রাজনৈতিক পদধারী না হয়েও তিনি বাংলাদেশে নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতিক হয়ে থাকবেন সারা জীবন। তাঁর সহনশীলতা এবং ধৈর্য বর্তমান নারীদের জন্য শিক্ষণীয় এবং অনুসরনীয়।    

বঙ্গমাতা ছিলেন একজন আদর্শ নারী যিনি পরিবারে স্ত্রী-মাতার ভূমিকায় কোমলতা আর দেশের প্রয়োজনে যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণে কঠোরতার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন। বেগম মুজিব একদিকে যেমন শক্ত হাতে সংসার ও সন্তানদের সামাল দিতেন, তেমনি নিজের ব্যক্তিগত চাহিদাকে অতিক্রম করে স্বামীর সংগ্রামের সহযোদ্ধা হিসেবে নীরবে ছায়াসঙ্গীর মতো যোগাতেন সাহস ও উদ্দীপনা। তিনি ছিলেন মুক্ত চিন্তার অধিকারী, বিশ্বাসে অটল ও দৃঢ় প্রত্যয়ী একজন নারী। বঙ্গবন্ধুর দর্শন ও আদর্শের সঙ্গে সবসময় ছিলেন একাত্ম। মুক্তিযুদ্ধে প্রেরণাদাত্রী এই মহীয়সী নারী বঙ্গমাতার আদর্শ দেশের নতুন প্রজন্ম বিশেষ করে নারীদের কাছে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। কিন্তু অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনে অভ্যস্ত আর প্রচারবিমুখ এই মহিয়সী নারীর জীবনব্যাপী ত্যাগ ও অবদান থেকে গেছে লোক চক্ষুর আড়ালে, তাই আজকের এই দিনে আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি আত্মত্যাগে ভরপুর তাঁর জীবন ও কর্মকে। 

১৯৭৫ সালে ১৫ই আগস্ট কালরাতে ধানমণ্ডির ৩২ নং বাড়িতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও  পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে ঘাতকেরা এই মহিয়সী নারীকেও নির্মমভাবে হত্যা করে। আমি তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই এবং তাঁর পরিবারের সকল শহিদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। মৃত্যুর সময়ও তিনি বঙ্গবন্ধুর সাথেই চলে গেছেন না ফেরার দেশে, এমন জীবনসঙ্গিনী শুধু বঙ্গবন্ধুর মতো ব্যক্তিত্বের ভাগ্যেই জোটে। আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর জীবন ও কর্মের মাঝে যে আদর্শ তিনি রেখে গেছেন তা নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া আমাদের কর্তব্য। তিনি না থাকলেও রত্নগর্ভা বঙ্গমাতা রেখে গেছেন একজন দেশরত্ন - শেখ হাসিনা, যিনি তাঁর মায়ের আদর্শ, চেতনা ও প্রেরণা এবং অদম্য সাহস ধারণ করেই বাংলার মাটি ও জনগণকে ভালোবেসে নিজের সারাটি জীবন দেশের উন্নয়নে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর হাত ধরেই, তাঁর দূরদর্শী ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বেবাংলাদেশ আজ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উন্নীত হয়েছে, শেখ হাসিনার অদম্য চেষ্টায় নিজেদের অর্থায়নে আমরা তৈরি করেছি স্বপ্নের পদ্মা সেতু, তাঁর নেতৃত্বেই দেশ এগিয়ে চলেছে দূর্বার গতিতে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত রূপকল্প-২০৪১ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ উন্নত জাতিরাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে - ইনশাল্লাহ।    

বঙ্গমাতার আদর্শ আর মননে গড়ে উঠুক এদেশের নতুন প্রজন্মের নারীরা- বঙ্গমাতার জন্মদিনে এই আমাদের প্রত্যাশা। আসুন আমরা বঙ্গমাতার জীবনকর্ম থেকে ত্যাগ, দেশপ্রেম, সাহস, বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার শিক্ষা পরিবার ও সমাজে সুন্দরভাবে তুলে ধরি, গড়ে তুলি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা।     

লেখক: পরিচালক গনযোগাযোগ অধিদপ্তর 

ঢাকানিউজ২৪.কম / কেএন

খোলা-কলাম বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

banner image
banner image